ফুটপাতে সন্তান প্রসব
দুই মিনিটের পথ, তবু হাসপাতালে পৌঁছতে পারলেন না রাজিয়া
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন, সাভার
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৪ পিএম
দুই মিনিটের পথ, তবু হাসপাতালে পৌঁছতে পারলেন না রাজিয়া
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হাসপাতাল তখন চোখের সামনেই। দূরত্ব মাত্র দুই মিনিটের; কিন্তু সেই দুই মিনিটের পথই পেরুনো হলো না রাজিয়ার। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সার্ভিস লেনজুড়ে অবৈধ ফুটপাত, দোকান, অবৈধ পার্কিং আর উল্টোপথে ছুটে চলা যানবাহনের বিশৃঙ্খলায় আটকে গেল একটি রিকশা।
সময়ের সঙ্গে লড়াইয়ে হার মানলেন অন্তঃসত্ত্বা রাজিয়া খাতুন (৩২)। প্রচণ্ড প্রসব ব্যথায় সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতেই জন্ম নিল তার সন্তান। হাসপাতালের অপারেশন টেবিলে নয়, রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনায় দখল হয়ে যাওয়া একটি সড়কের উপরই পৃথিবীর আলো দেখল নবজাতকটি।
রোববার সন্ধ্যার এ ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি সাভারের দীর্ঘদিনের সড়ক-নৈরাজ্য, দখলদারিত্ব ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার নির্মম প্রতীক হয়ে উঠেছে।
রাজিয়ার স্বামী পোশাককর্মী মো. আমির হামজা জানান, সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য সময় এখনও প্রায় দুই মাস বাকি ছিল। তাই এমন পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। দুপুরে কর্মস্থলে থাকাকালে স্ত্রীর অসুস্থতার খবর পেলেও তাৎক্ষণিক ছুটি মেলেনি। বিকালে ছুটি নিয়ে বাসায় ফিরে প্রথমে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যান। সেখান থেকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে রিকশাযোগে সুপার মেডিকেল হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন তারা।
কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছার আগেই থেমে যায় জীবন বাঁচানোর সেই দৌড়। সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এসে রিকশাটি আটকে পড়ে অসহনীয় যানজটে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সার্ভিস লেনের দুই পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ ফুটপাত ও কয়েক হাজার দোকান। কোথাও অবৈধ পার্কিং, কোথাও উল্টোপথে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য। ফলে জরুরি রোগী বহনকারী যানও এগোতে পারে না।
আমির হামজা বলেন, হাসপাতাল সামনে দেখছিলাম কিন্তু যেতে পারছিলাম না। শেষপর্যন্ত স্ত্রীকে কাঁধে করে নেওয়ার চেষ্টা করি কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই রাস্তাতেই সন্তান জন্ম দেয়। তারপরই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। আশপাশে এত মানুষ ছিল কিন্তু কাউকে পাশে পাইনি।
পরে তিনি দৌড়ে হাসপাতালে গিয়ে সাহায্য চাইলে হাসপাতালের কর্মীরা স্ট্রেচার নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। সড়ক থেকেই মা ও নবজাতককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপক মো. আসিফ হামজা জানান, হাসপাতালে আনার সময়ও রাজিয়ার প্লাসেন্টা বিচ্ছিন্ন হয়নি। জরুরি চিকিৎসার মাধ্যমে সেটি অপসারণ করা হয়। বর্তমানে মা স্থিতিশীল থাকলেও সময়ের আগেই জন্ম নেওয়ায় নবজাতককে এনআইসিইউতে রাখা হয়েছে।
হাসপাতালের আরেক ব্যবস্থাপক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, মহাসড়কের ডেডিকেটেড লেন পৃথক করার পর পর্যাপ্ত ইউটার্ন না থাকায় স্থানীয় মানুষের চলাচল জটিল হয়ে উঠেছে। তার ওপর সার্ভিস লেনের দুই পাশ অবৈধ ফুটপাত ও দোকানে দখল, অবৈধ পার্কিং এবং উল্টোপথে যান চলাচল পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করেছে। ফলে দুই মিনিটের পথ পাড়ি দিতেও অনেক সময় ঘণ্টা লেগে যায়। রাজিয়ার ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই সবচেয়ে বেদনাদায়ক উদাহরণ।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, অবৈধ দখল ও নিয়ন্ত্রণহীন যান চলাচল মিলিয়ে সাভারের সড়ক এখন স্থানীয়দের কাছে প্রতিদিনের দুর্ভোগের নাম। বিশেষ করে জরুরি রোগী পরিবহণ হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তার আরেক নাম।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগ কাজ করছে এবং অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাস্তায় সন্তান প্রসবের ঘটনাটি জানার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও সতর্ক হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
