একই দপ্তরে স্বামী ড্রাইভার, স্ত্রী ‘বিরাট’ ঠিকাদার
Advertisement
মো. নুরুজ্জামান, মানিকগঞ্জ
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:০০ পিএম
একই দপ্তরে স্বামী ড্রাইভার, স্ত্রী ‘বিরাট’ ঠিকাদার
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের গাড়িচালক হিসেবে চাকরি করেন স্বামী আর সেই সুবাদেই স্ত্রী বনে গেছেন মস্ত বড় ঠিকাদার। হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় দেড় কোটি টাকার কাজ। তবে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সওজের গাড়িচালক মিরাজ।
সরকারি নথি অনুযায়ী, তার স্ত্রী মোসা. সুলতানা খাতুনের ‘এসএম হিম এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নামে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়ক এবং ধামরাই-কালামপুর লিংক রোডের তিনটি প্যাকেজে মোট প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকার কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরাজ নামে ওই ব্যক্তি ২০১৫ সালে মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগে অস্থায়ী গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। চাকরিতে অস্থায়ী থাকা অবস্থাতেই তিনি নিজ দপ্তরের সরকারি কাজ পাওয়ার লক্ষ্যে তথ্য লুকিয়ে স্ত্রীর নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মিরাজের বাবা আব্দুল লতিফ ছিলেন সওজ বিভাগের গাড়িচালক; তিনি অবসরে যাওয়ার পরেই অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পান মিরাজ। নিয়োগ পাওয়ার পরেই যেন তার হাতে ধরা দেয় আলাদিনের চেরাগ। গড়ে তুলেন নিজ পরিবারের নামে একাধিক সম্পদ। গত দুই বছর আগে মিরাজের মা সুফিয়া বেগমের নামে সিংগাইর উপজেলার উত্তর গুলাইডাঙ্গা এলাকার আতড়াইল মৌজায় ৬০ শতাংশ জমি কিনেন তিনি।
জমি বিক্রেতা খোরশেদ মাস্টার বলেন, গত দুই বছর আগে স্থানীয় আতড়াইল মৌজার ৬০ শতাংশ ওয়ারিশান সম্পত্তি গারিচালক মিরাজদের কাছে বিক্রি করেন তারা। সেই জমি মিরাজের মা সুফিয়া বেগমের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়।
সরকারি নথি অনুযায়ী, এসএম হিম এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মিরাজের স্ত্রী মোসা. সুলতানা খাতুন। এ প্রতিষ্ঠানের নামে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়ক এবং ধামরাই-কালামপুর লিংক রোডের তিনটি প্যাকেজের মোট ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা মূল্যের কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি অফিসে নিজ দপ্তরে চাকরিরত অবস্থায় নিজের পরিচয় গোপন করে স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে মিরাজ নিজ কর্মস্থলের অধীন সরকারি কাজ বাগিয়ে নেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করেছে এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ)-২০০৬ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী স্থায়ী বা অস্থায়ী নিজে অথবা পরিবারের সদস্যের নামে নিজ কর্মস্থলের অধীন ঠিকাদারি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না। এমন কর্মকাণ্ড শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উপসহকারী বিভাগীয় প্রকৌশলীর সদ্য বদলি হওয়া আব্দুল কাদের জিলানীর গাড়িচালক হওয়ার পরেই নিজের স্ত্রীর নামে লাইসেন্স করে প্রায় কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নেয়। অন্যদিকে বিধি লঙ্ঘন করে সেই কাজ অন্যত্র এক ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেন গাড়িচালক মিরাজ; যা নিজেই অকপটে স্বীকার করেন তিনি।
মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর গাড়িচালক মিরাজ স্ত্রীর নামে লাইসেন্স থাকার বিষয়ে স্বীকার করে বলেন, আমার স্ত্রীর নামে যখন ঠিকাদারি লাইসেন্স ছিল তখন আমি স্থায়ী চাকরি করি না এবং এটা আমার স্ত্রীর ব্যবসা। আর কাজটি আমরা করি নাই রাজিব নামের এক লোকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছি।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এমএম হানিফ বলেন, আমার গাড়িচালক মিরাজের স্ত্রী যদি ব্যবসা করে থাকে আমি সেটা জানি না। ব্যবসা হালাল যে কেউ ব্যবসা করতে পারে। তবে সরকারি আইনে নিষেধ থাকলে এখন থেকে সে আর কোনো ব্যবসা করবে না। আমি সরকারের এ আইন জানি না।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মানিকগঞ্জ জেলার পিপি দেওয়ান মো. মিজানুর রহমান বলেন, যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাকরি করা অবস্থায় নিজের প্রভাব বিস্তার করে নিজের নাম পরিচয় গোপন রেখে লাভবান হয় বা নিজের স্বার্থ হাসিল করে থাকে তাহলে সেটি অপরাধের শামিল। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অবশ্যই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
