মৃত্যুর মিছিল থামছে না সীতাকুণ্ড শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে গড়ে ওঠা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড বা জাহাজ ভাঙার কারখানায় মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতি বছরই কোনো না কোনো ইয়ার্ডে নানা দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা।
এক হিসেবে দেখা গেছে, ৯ বছরে বিভিন্ন ইয়ার্ডে ১৩৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সালে দুর্ঘটনায় বিভিন্ন শিপ ইয়ার্ডে নিহত হয়েছেন ১২৪ জন।
সর্বশেষ শুক্রবার ভাটিয়ারি ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ৮ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটল।
কেবল মৃত্যু নয়; প্রতি বছর নানা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন অনেক শ্রমিক। শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম না দেওয়া, গ্যাস ফ্রি করে জাহাজ না কাটার কারণে যেমন দুর্ঘটনা ঘটছে তেমনি অনেক সময় শ্রমিকদের নিজেদের গাফিলতি বা অসতর্কতার কারণেও দুর্ঘটনা লেগে আছে।
শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা লেবার রিসোর্স সাপোর্ট সেন্টার গত ৯ বছরে শিপইয়ার্ডে শ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে একটি জরিপ করেছে। তাদের জরিপ অনুযায়ী এখানে গত ৯ বছরে ১৩৭ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৬ সালে ১৮ জন, ২০১৭ সালে ১৯ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৯ সালে ২৩ জন, ২০২০ সালে ১০ জন, ২০২১ সালে ৯ জন, ২০২২ সালে ৭ জন, ২০২৩ সালে ৭ জন এবং বছর ২০২৪ সালে দুর্ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে নিহত হয়েছেন ৪ জন। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৩ জন। পঙ্গুত্ব বরণ ও আহতদের সংখ্যাও অনেক। তবে এই সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সীতাকুণ্ডের এনএস করপোরেশন নামে একটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিস্ফোরণে ১২ শ্রমিক দগ্ধ হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজন মারা যান।
জরিপকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রিন এবং সাধারণ ইয়ার্ডগুলোতে সরাসরি শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে জাহাজ কাটার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করেন মালিকরা। ওই ঠিকাদার আবার সাব-ঠিকাদার নিয়োগ দেয়। ঠিকাদাররা তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করার জন্য অনেক সময় নিয়মের তোয়াক্কা করেন না। সেফটি-সিকিউরিটি নিশ্চিত না করেই জাহাজ কাটার কাজে নামানো হয় শ্রমিকদের। দুর্ঘটনা রোধে রাত ৮টার পর জাহাজ না কাটার নির্দেশনা থাকলেও সেই নির্দেশ মানেন না অনেক ইয়ার্ড মালিক। দুর্ঘটনা ঘটলে বেশিরভাগ সময় তা গোপন করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি লাশ গুম বা সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। ক্ষতিপূরণ থেকে বাঁচতে এবং আইনি জটিলতা থেকে ইয়ার্ড মালিকরা এমন নির্দয় কাজটি করে থাকেন।
শুক্রবার যে শিপইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটি গ্রিন শিপইয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এসব ইয়ার্ড ঝুঁকি এড়াতে সাধারণ ইয়ার্ডগুলোর চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি নিয়ম-কানুন মেনে চলে। এরপরও গ্রিন শিপইয়ার্ডে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, বর্তমানে সীতাকুণ্ড সমুদ্র উপকূলে ৩৫টির মতো শিপইয়ার্ড সচল রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে গ্রিন শিপইয়ার্ড আছে মাত্র চারটি। আরও ৫-৬টি শিপইয়ার্ড গ্রিন শিপইয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এক সময় এই উপকূলে ১৫০টির বেশি শিপইয়ার্ড ছিল। বিদেশি পুরোনো জাহাজ কিনে তা ইয়ার্ডগুলোতে কেটে রড তৈরির কারখানায় বিক্রি করা হয়। নানা সংকটের কারণে ১২০টির মতো শিপইয়ার্ড ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে বা কোনো কোনো শিপইয়ার্ড চলছে খুঁড়িয়ে।
জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের নেতা ইদ্রিস আলী যুগান্তরকে বলেন, শুক্রবার গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসেবে পরিচিত ফেরদৌস স্টিল রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ৮ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগের। বিশেষায়িত শিপইয়ার্ডেও যদি নিয়ম-কানুন মেনে জাহাজ কাটা হয় তাহলে সাধারণ আর গ্রিন শিপইয়ার্ডের মধ্যে পার্থক্য কী থাকল।
তিনি বলেন, শিপইয়ার্ডে মৃত্যুর মিছিল থামাতে প্রতিটি ঘটনার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। না হয় এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আর জীবিকার তাগিদে শ্রম বেচতে আসা মানুষগুলো জীবন দিয়েই চুকাবে জীবনের দাম। এটা কখনো কাম্য হতে পারে না।
