ভাটিয়ারীর বিএসবিএ হাসপাতাল
শ্রমিকদের জন্য নির্মিত হলেও চিকিৎসা চলে গাইনী রোগীর
এম এ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিএ) হাসপাতালে চলছে গাইনী রোগীর চিকিৎসা। রীতিমতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে ডেলিভারি করা হচ্ছে হাসপাতালটিতে। কোন ধরনের ওষুধ ছাড়া নরমাল ডেলিভারির জন্য ফি নেওয়া হচ্ছে ৫ হাজার টাকা। অথচ এই হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছিল জাহাজ ভাঙা শিল্পে কর্মরত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দ্রুত ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য।
তবে প্রতিষ্ঠার গত ১৩ বছরেও জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনা কবলিত কোনো মুমূর্ষ রোগীকে এই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়নি। মূলত শ্রমিকদের নামে নির্মাণ করা হাসপাতালটি এখন কেবল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই চলছে। সবশেষ শুক্রবার ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় বিষক্রিয়ায় ঘটনায়ও মুমূর্ষ কোনো রোগীকে হাসপাতালটিতে ভর্তি করানো হয়নি। এরপর থেকে হাসপাতালটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে পুরো সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ জন রোগী ভর্তি থাকছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিন ভাটিয়ারী রেলস্টেশন রোডে অবস্থিত বিএসবিএ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ছয় তলা ভবনটিতে বিরাজ করছে সুনসান নিরবতা। অভ্যর্থনা কক্ষে দায়িত্বরত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাসপাতালটিতে বর্তমানে ৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এদের মধ্যে ৪ জনই গাইনী রোগী। বাকি তিনজনের মধ্যে ২ জন মেডিসিন বিভাগে ও একজন অর্থোপেডিক বিভাগে রয়েছেন।
মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া যে দুই জন রোগী রয়েছেন, তারা ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানার কর্মচারী।
শুক্রবার হাসপাতালটিতে ওই প্রতিষ্ঠানের তিন জন ভর্তি হয়েছিলেন। এরমধ্যে মো. কামাল নামে একজন চিকিৎসা নিয়ে ওই দিনই বাড়ি চলে গেছেন। বাকি দুইজন হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় রয়েছেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, হাতে স্যালাইন লাগিয়ে শুয়ে শুয়ে মোবাইল ফোন দেখছেন মিলন মিয়া এবং পাশের অপর একটি বেডে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন মো. জয়নাল। এরমধ্যে মিলন মিয়া ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় ফোরম্যান এবং জয়নাল ইনচার্জ হিসেবে রয়েছেন।
ফেরদৌস স্টিলে বিষক্রিয়া ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছিল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে আহত ও নিহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে রহস্যজনক কারণে ওই প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মচারী বিএসবিএ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুপুর আড়াইটার দিকে।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ে নেতিবাচক ধারণা বা সমালোচনা দূর করতে শ্রমিকদের কল্যাণ ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে ২০১৩ সাল থেকে হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই বছর থেকে পরবর্তী দুই বছর শিপ ব্রেকিং এসোসিয়েশনের বেতনভুক্ত ডাক্তার দিয়ে হাসপাতালটি পরিচালনা করা হয়।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ১০ জুলাই বিএসবিএ হাসপাতাল পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। তৎকালীন বিএসবিএ’র সভাপতি এমএ তাহের এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের পক্ষে ডা. বি কে দাশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। এরপর একই বছরের ১০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য দিদারুল আলম।
তবে এরপর থেকে ভাটিয়ারী তথা সীতাকুণ্ড এলাকায় অবস্থিত একাধিক জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠানে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটলেও কোনো শ্রমিককে ওই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়নি। অথচ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই হাসপাতালে জাহাজ ভাঙা শ্রমিকদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, এমনটিই প্রচার করা হচ্ছে। সবশেষ ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন।
জানতে চাইলে বিএসবিএ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তাকিম যুগান্তরকে বলেন, ‘শিপ ইয়ার্ড মালিকরা ২০ শয্যার হাসপাতালটি শ্রমিক ও স্থানীয় জনগনের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছে। এখানে এখন গাইনী রোগীই বেশি হচ্ছে। পুরো সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ জন রোগী ভর্তি থাকছে। এখানে জাহাজ ভাঙা শ্রমিকদের বিনা খরচে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে এ পর্যন্ত কতজনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে তার হিসাব নেই।’
