ভীতির সেই ভাতারমারিতে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন
এটিএম সামসুজ্জোহা, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম
ভাতারমারি রেলক্রসিং
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় সন্ধ্যা নামলেই নীরব হয়ে যেত ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের ভাতারমারি রেলক্রসিং এলাকা। দিনের আলোতে পথচারীদের চলাচল থাকলেও বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে কমে যেত মানুষের আনাগোনা। ডাকাত-দস্যুদের ভয় ছিল এলাকাবাসীর নিত্যসঙ্গী। পথচারীদের জিম্মি করে সর্বস্ব লুটের পাশাপাশি এই এলাকায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অনেকে।
সেই ভাতারমারি এলাকাতেই এখন তৈরি হচ্ছে প্রস্তাবিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের আতঙ্কের জায়গাটিতে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয় মানুষ।
তাদের আশা, বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে এলাকায় মানুষের চলাচল বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত হবে এবং নিরাপত্তার পরিবেশও আরও জোরদার হবে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে প্রস্তাবিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাতারমারি রেলক্রসিং এলাকা কয়েক দশক ধরে ডাকাতদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এ সড়কে চলাচল করতে ভয় পেতেন সাধারণ মানুষ। ডাকাতির পাশাপাশি ছিনতাই ও হামলার ঘটনাও ঘটত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেলক্রসিং এলাকায় পুলিশ বক্স স্থাপন করা হলেও মাঝে-মধ্যেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
মহেষালী গ্রামের ৭০ বছরের মজিবর রহমান বলেন, এই রাস্তায় এক সময় ডাকাত-দস্যুদের ভয় ছিল। বেলা গড়িয়ে গেলে সড়কটি প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে যেত। প্রাণের ভয়ে মানুষ এদিকে আসত না। কয়েক যুগ ধরে পথচারীদের জিম্মি করে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ডাকাতের কবলে পড়ে কয়েকজনের প্রাণও গেছে। অনেকে আহত হয়ে পঙ্গু হয়েছেন।
মজিবর রহমানের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর সড়কটি অনেকটা জনশূন্য হয়ে পড়ত। স্থানীয়দের মধ্যে এমন ভয় তৈরি হয়েছিল যে প্রয়োজন ছাড়া কেউ ওই পথে চলাচল করতে চাইতেন না।
ভাতারমারি রেলক্রসিং এলাকায় প্রথম দিকে চায়ের দোকান দেন ৪৫ বছর বয়সি মর্জিনা। তিনি বলেন, সন্ধ্যা হলেই আমিও দোকান গুটিয়ে চলে যেতাম। ডাকাতের ভয় ছিল। দোকানের মালামাল নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরতাম। এখন এখানে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। আমার খুব শান্তি লাগছে। মানুষজন আসবে, চলাচল বাড়বে। এখন নির্ভয়ে দোকান করতে পারব।
শিবগঞ্জ পূর্ব পারবুগী এলাকার বাদাম বিক্রেতা দিলশাদ আলী বলেন, আগে এখানে ডাকাতি ও ছিনতাই হতো। এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে মানুষ ভয় পেত। সন্ধ্যার পর তো অনেকে এদিকে আসতেই চাইত না।
একই এলাকার নূরী বেগম বলেন, আগে ডাকাতির ভয়ে আমরা এখানে আসতে পারতাম না। সন্ধ্যা হলেই মানুষ ভয় পেত। রাত হলে মারামারি, খুনখারাবির ঘটনাও ঘটেছে। এ জায়গাটিকে মানুষ খুব ভয় করত। এখন বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। আমাদের এলাকার মানুষ আনন্দিত।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে শুধু শিক্ষার সুযোগই তৈরি হবে না, ভাতারমারি ও আশপাশের এলাকার চেহারাও বদলে যাবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলাচল বাড়লে দীর্ঘদিনের নির্জনতা কাটবে। একই সঙ্গে দোকানপাট, পরিবহণ ও অন্যান্য ছোট ব্যবসার সুযোগও বাড়বে বলে তাদের প্রত্যাশা।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোদাদাদ হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে যদি মনে হয় সেখানে বিশেষ কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন, তাহলে অবশ্যই আমরা তা করব।
জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের ভাতারমারি এলাকায় প্রস্তাবিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই রয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের পরিত্যক্ত বিমানবন্দর ও শিবগঞ্জ রেলস্টেশন।
