পদ্মার পানি বাড়ছেই, কুষ্টিয়ায় পানিবন্দি ৫০ হাজার মানুষ
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুষ্টিয়ায় পদ্মা নদীর পানি বাড়তে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। জেলার দৌলতপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
ডুবে গেছে রাস্তাঘাট, পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। বসতবাড়ির পানি প্রবেশ করায় গবাদিপশু, গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে বন্যাকবলিত শিক্ষার্থীদর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্থানীয়ভাবে তাদের বিদ্যালয়ে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১২ দশমিক ৮৮ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হলেও শুক্রবার দুপুর ৩টায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ০২ মিটারে। অর্থাৎ মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ওই পয়েন্টে পানির উচ্চতা বেড়েছে ১৪ সেন্টিমিটার। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। শুক্রবার বিকালের হিসাব অনুযায়ী সেখানে পদ্মার পানি বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুতই পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে দৌলতপুর উপজেলার ভাগজত পয়েন্টেও পদ্মার পানি দ্রুত বাড়ছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় এ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৯০ মিটার। সেখানে বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৫২ মিটার।
পাউবো সূত্র বলছে, ভাগজত পয়েন্টে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। ফলে এ পয়েন্টেও বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে নদীর পানি। পানি বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মানুষ।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, দুই ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও যোগাযোগের পথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অনেক এলাকার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও কোমর বা হাঁটু পানি পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। নৌকা হয়ে উঠেছে দুর্গত মানুষের চলাচলের অন্যতম ভরসা। বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে। পানিতে তলিয়ে গেছে রোপা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল।
উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি আরও বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুধু বন্যা নয়, পানি বৃদ্ধির সঙ্গে কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙনও শুরু হয়েছে।
চিলমারী ইউনিয়নের উদয়নগরসহ কয়েকটি এলাকায় পদ্মার ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে নদী তীরবর্তী মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বন্যার পানিতে একদিকে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট প্লাবিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভাঙনের আশঙ্কায় অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের চিন্তায় রয়েছেন। বসতবাড়ির আশপাশে পানি উঠে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকট নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। পানি আরও বাড়লে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও গো-খাদ্যের সংকট তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
চিলমারী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য শেখ নুরুজ্জামান বলেন, প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং বন্যা দীর্ঘায়িত হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গো-খাদ্যের সংকট তীব্র হবে। বন্যাকবলিত অসহায় মানুষের জন্য দ্রুত সরকারি ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছানো প্রয়োজন।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হঠাৎ পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় ইউনিয়নের সব গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা না দেওয়া হলেও বন্যাকবলিত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আপাতত ক্লাশে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে, যাতে বন্যায় গৃহহীন মানুষ সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বন্যার পানি কমতে শুরু করবে বলে তারা ধারণা করছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, বন্যাকবলিত এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
