বিদেশে বসে দেশের আদালতে ‘সশরীরে আত্মসমর্পণ’, নিলেন জামিনও
Advertisement
খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৫ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দক্ষিণ কোরিয়ায় বসেই খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার একটি মারামারি মামলায় জামিন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ফিরোজ আলম শাওনের বিরুদ্ধে। তার পরিবর্তে অন্য এক ব্যক্তিকে ‘ফিরোজ আলম শাওন’ সাজিয়ে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত ১৬ মার্চ ওই মামলায় শাওনের নামে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন এক ভুয়া ব্যক্তি। প্রায় চার মাস পর বিষয়টি আদালতের নজরে এলে তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এই জালিয়াতির তথ্য।
এ ঘটনায় মূল আসামি ফিরোজ আলম শাওন ও তার আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে শাওনের ভাই ফেরদৌস আলম সেতুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
গতকাল শনিবার (৩ অক্টোবর) রাতে সেতুকে গ্রেফতার করা হয়। রোববার আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ রাতে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি বরইতলা ঘাট এলাকায় প্রতিবেশী তরিকুল আমিনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে ফিরোজ আলম শাওন ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তরিকুল আমিন বাদী হয়ে শাওনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। পরে আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য দিঘলিয়া থানাকে নির্দেশ দেন।
মামলাটি তদন্ত করেন দিঘলিয়া থানার এসআই জামিল হোসেন। তদন্ত শেষে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি শুধু ফিরোজ আলম শাওনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। বর্তমানে খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আজমল হোসেন বলেন, মামলায় চার্জ গঠনের দিন ধার্য হওয়ার পর তারা জানতে পারেন, গত ১৬ মার্চ শাওন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন। মামলায় জামিন নেওয়ার সময়ও তিনি দেশে ছিলেন না।
বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন বাদী তরিকুল আমিন। পরে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্তে আদালতে শাওনের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে হাজির করে জামিন নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
আদালতের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআর ৬৩/২০২৫ (দিঘলিয়া) মামলার আসামি ফিরোজ আলম শাওন গত ১৬ মার্চ অ্যাডভোকেট সরদার শাহজাহান আলীর ওকালতনামার মাধ্যমে আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। মামলার অভিযোগ জামিনযোগ্য হওয়ায় আদালত তাকে ১০০ টাকা বন্ডে জামিন দেন।
কিন্তু পরে গত ২৩ এপ্রিল বাদী তরিকুল আমিন আদালতে আবেদন করে জানান, মামলার আসামি ফিরোজ আলম শাওন দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি দেশে না ফিরেই কিভাবে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বাদী।
এর পরদিন, ২৭ এপ্রিল আসামিপক্ষের আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলী আদালতে ওকালতনামা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। ওই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তার ওকালতনামা ব্যবহার করে ভিন্ন একজনকে আসামি সাজিয়ে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি তদন্ত করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত গত ২২ জুলাই খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের কাছে প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিরোজ আলম শাওন দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানকালে তার পরিবর্তে অন্য একজনকে আদালতে প্রদর্শন করে জামিন নিয়েছেন। প্রতারণার মাধ্যমে জামিন নেওয়ার ঘটনায় ওই ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, আদালতের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা অন্য কেউ জড়িত কিনা- তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এরপর গত ২ আগস্ট আদালত অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার জন্য খুলনা সদর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশের পর গত ৬ আগস্ট ফিরোজ আলম শাওনকে প্রধান আসামি এবং আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীকে দ্বিতীয় আসামি করে সদর থানায় মামলা রেকর্ড করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার এসআই মেহেদী হাসান খান বলেন, একটি সিআর মামলায় মূল আসামির পরিবর্তে ভুয়া ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়ার অভিযোগে কোর্ট পিটিশনের মাধ্যমে সদর থানায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মামলার মূল আসামি ফিরোজ আলম শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাস করছেন। দেশে অবস্থানের সময় একটি মারামারির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে তিনি আবার দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে যান। এরপর মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তার পরিবর্তে অন্য একজনকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে পাওয়া গেছে।
পুলিশের তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত একজন আসামির পরিবর্তে কে আদালতে ‘শাওন’ সেজে হাজির হয়েছিল এবং তাকে আদালতে হাজির করার পুরো প্রক্রিয়ায় আর কারা যুক্ত ছিলেন। আদালতের নথিতে ওই ব্যক্তির পরিচয় কিভাবে যাচাই করা হয়েছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

-Press-6ac2760d4ef0f.jpg)