‘কালো জাদুর’ অভিযোগে তিন নারীকে...
Advertisement
গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩২ পিএম
এসময় সাদা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নাটোরের গুরুদাসপুরে একই পরিবারের তিন নারীকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। লোকলজ্জা ও প্রতিপক্ষের প্রভাবের কারণে থানায় অভিযোগ করতেও ভয় পাচ্ছেন বলে দাবি তাদের।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকালে গুরুদাসপুর পৌরসভার চাঁচকৈড় গাড়িষাপাড়া মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এর আগে তাদের একটি বাড়িতে আটকে রেখে মারধর এবং সাদা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
ভুক্তভোগী তিন নারীর বাড়ি চাঁচকৈড় মধ্যমপাড়া এলাকায়। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা প্রবাসে থাকায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে জানান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যুবদলকর্মী জিয়াউর রহমান জিয়া তার অনুসারীদের নিয়ে সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাদের বাড়িতে যান। একপর্যায়ে তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করে টেনেহিঁচড়ে জিয়ার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
তাদের দাবি, সেখানে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে তাদের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
সন্ধ্যার আগে জিয়ার অনুসারীরা তাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরান। পরে সাদা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
তিন নারীর একজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি বা আমার মেয়ে কোনো অন্যায় করে থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
আরেক ভুক্তভোগী বলেন,আমার স্বামী বিদেশে থাকেন, মেয়েরও সাত মাস আগে বিয়ে হয়েছে। তার অভিযোগ, পরিবারের পুরুষ সদস্যরা না থাকায় তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে। প্রকাশ্যে এমন ঘটনা ঘটলেও উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত ২২ সেপ্টেম্বর যুবদলকর্মী জিয়া তাদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন। এরপর সোমবার ১৫ থেকে ২০ জনকে নিয়ে তাদের বাড়িতে যান। তখন তার নববিবাহিত মেয়ে ও বৃদ্ধ মা বাড়িতে ছিলেন। তাদের চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে বের করে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার নেপথ্যে কী
ভুক্তভোগীদের দাবি, যুবদলকর্মী জিয়ার ভাতিজির সঙ্গে তাদের পরিবারের এক তরুণের বিয়ের কথা ছিল। পরে সেই বিয়ে হয়নি। প্রায় এক বছর আগে জিয়ার ভাতিজির অন্যত্র বিয়ে হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর জিয়ার ভাতিজি অসুস্থ হয়ে পড়লে জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে ‘কালো জাদু’ করার অভিযোগ তোলেন। এই বিরোধের জেরেই হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি তাদের।
তবে ‘কালো জাদু’ করার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে যুবদল নেতা জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আমার হাত ভেঙে যাওয়ার পর থেকে আমি বিছানায় রয়েছি।
ইয়ারুল সরদার বলেন, আমার মেয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও তার সুস্থতা হয়নি। পরে কবিরাজ ও মাওলানাদের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করানোর সময় তার মেয়েকে ‘কালো জাদু’ করা হয়েছে বলে তারা জানতে পারেন।
ইয়ারুল সরদার দাবি করেন, এ বিষয়ে প্রায় দুই মাস আগে আমি থানায় অভিযোগ করি। তার ভাষ্য, ভুক্তভোগী নারীদের একজনের বিরুদ্ধে ‘কালো জাদু’ করার অভিযোগ ছিল। পরে মহল্লার লোকজন ওই নারীদের ধরে এনে জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরান।
তবে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানোর ঘটনায় তার বা তার ভাইয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাটোর আদালতের সিনিয়র আইনজীবী মুক্তার হোসেন বলেন, কারও গলায় জুতার মালা পরিয়ে জনসম্মুখে ঘোরানো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। এটি ব্যক্তির মর্যাদা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মারধর, মানহানি ও বলপ্রয়োগসহ প্রযোজ্য আইনে মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নজরে আসার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে ভুক্তভোগী পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ না করায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


