সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে ফেনীতে এলপিজি বিক্রি
Advertisement
ফেনী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৫ এএম
ফেনীতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফেনীতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির সিলিন্ডার। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে কোনো কোনো ব্যবসায়ী বাড়তি দাম নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সর্বশেষ দাম নির্ধারণ অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। তবে ফেনীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে কিছু ব্যবসায়ী ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন। বাজার তদারকিতে ঘাটতির সুযোগ নিয়ে তারা অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। এতে একদিকে বাড়ছে সংসারের ব্যয়, অন্যদিকে সিলিন্ডার না পেয়ে অনেককে একাধিক দোকানে ঘুরতে হচ্ছে।
ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, হঠাৎ এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি অল্প বেতনে চাকরি করি। পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকি। ভেতরের বাজার থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছি। এভাবে চললে আমাদের বাঁচার উপায় নেই। এগুলো কি কেউ দেখবে না?
শহরের একাডেমি সড়কের বাসিন্দা কানিজ ফাতেমা বলেন, তার সংসার স্বামীর অল্প আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বাসায় লাকড়ির চুলা ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে বাধ্য হয়েই এলপিজি কিনতে হয়। তার ভাষায়, ‘এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ালে আমরা কীভাবে সংসার চালাব?’
ট্রাংক রোডের চা-শিঙাড়ার দোকানি মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনলেও শিঙাড়ার দাম বাড়াতে পারছেন না। কারণ দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যাবে।
তিনি বলেন, ‘সিলিন্ডারের দাম বাড়ছে, কিন্তু শিঙাড়া আগের দামেই ১০ টাকায় বিক্রি করছি। শিঙাড়া ১৫ টাকা করলে কেউ খাবে না। আমাদের কষ্টের কথা শোনার কেউ নেই।’
ছাগলনাইয়ার নাছিরা দিঘী রাস্তার মাথার ব্যবসায়ী তারেকুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার তিনি ১২ কেজির সিলিন্ডার পাইকারি ১ হাজার ৯০০ টাকা দরে কিনেছেন। ফলে বাধ্য হয়ে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দামে দিলে তারাও কম দামে বিক্রি করতে পারতেন বলে দাবি করেন তিনি।
জমাদ্দার বাজারের খুচরা বিক্রেতা আবুল কাসেম বলেন, গত দুই মাস ধরে বসুন্ধরা গ্যাসের সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। অন্য একটি কোম্পানির সিলিন্ডারও স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে দাবি তার।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবির সঙ্গে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে ডিলার পর্যায়ে। ফেনীর বসুন্ধরা গ্যাসের ডিলার মেসার্স রাসেল এন্টারপ্রাইজের ক্যাশিয়ার শাহাদাত হোসেন তারেক বলেন, বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজির দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও কোম্পানি থেকে তাদের প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। ফলে তারা প্রায় ৫০ টাকা লাভে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
তিনি বলেন, ‘গ্রামগঞ্জে খুচরা দোকানদাররা যে যার মতো দামে বিক্রি করছেন। তারা প্রতি বোতলে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন। আবার বাড়তি দাম দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দুটি কোম্পানির গ্যাস গত দুই মাস ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। একধরনের হাহাকার তৈরি হয়েছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ফেনী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, এলপিজি বিক্রিতে অতিরিক্ত দাম নেওয়া বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রতিদিন বাজার মনিটরিং করা প্রয়োজন। বর্তমানে মানুষ এমনিতেই অর্থকষ্টে রয়েছে। অতিরিক্ত ১০ টাকা দেওয়ার সামর্থ্যও অনেকের নেই।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ফেনীর সহকারী পরিচালক মো. আছাদুল ইসলাম বলেন, এলপিজির দাম নিয়ে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। কেউ যাতে বেশি দামে বিক্রি করে ভোক্তাদের অসুবিধায় ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি রয়েছে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভোক্তাদেরও সচেতন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার বিষয়ে কোনো ভোক্তা অভিযোগ করলে প্রতিটি ঘটনা শুনানি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ফেনীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম যুগান্তরকে বলেন, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকা দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে অভিযান চলছে। তবে ফেনীর ১৮ জন সাপ্লায়ার জানিয়েছেন, তারাই নির্ধারিত দামে এলপিজি কিনতে পারছেন না। কোথাও ১ হাজার ৯০০ টাকা বা তারও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে।


