Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী রুমা এখন বরিশালের বৃদ্ধাশ্রমে

Advertisement

Icon

মনিকা চৌধুরী, বরিশাল ব্যুরো

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৪ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী রুমা এখন বরিশালের বৃদ্ধাশ্রমে

রুমা

Advertisement

একসময় তার হাতে ছিল বই, বর্ণাঢ্য চাকরি আর সংসারের ব্যস্ততা। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিষয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কর্মজীবনে ছিলেন ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সিনিয়র কর্মকর্তা। স্বামী ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ঢাকার মগবাজারে ছিল সাজানো সংসার আর নিজের চেনা ঠিকানা।

অথচ জীবনের নির্মম বাস্তবতায় আজ সেই রুমা দিন কাটাচ্ছেন বরিশালের কাউনিয়ার একটি বৃদ্ধাশ্রমে। চোখের সামনে চেনা-অচেনা মানুষ, চারপাশে ৭০ জনের মতো প্রবীণ সঙ্গী। তবু মাঝে মাঝে তার চোখ আটকে যায় শূন্য আকাশে—এক অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন বহুক্ষণ। যেন চোখের সামনে বৃদ্ধাশ্রমের দেয়াল নেই, তিনি ফিরে গেছেন অতীতে ফেলে আসা জীবনের সেই সোনালি দিনগুলোতে।

নতুন সঙ্গীদের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কারও সঙ্গে কথা বলেন, কারও পাশে গিয়ে বসেন, মুখে আলতো হাসি ফোটানোর চেষ্টাও করেন; কিন্তু সেই হাসির আড়ালেও স্পষ্ট ধরা পড়ে তার গভীর একাকিত্ব। আপনজনদের প্রসঙ্গ উঠলেই কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে, কখনোবা দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।

একাকিত্বের কথা বলতে গিয়ে রুমা আক্ষেপ করে বলেন, পয়সা কই পাব? বয়স তো হয়ে গেছে। এখন কে আর আমার খবর রাখে?

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার বাবার নাম সিরাজুল করিম ও মা জেবুন্নেছা বেগম। তাদের দাদাবাড়ি ছিল ভারতের মেদিনীপুরে। দেশভাগের পর পরিবারসহ তারা খুলনায় চলে আসেন। পরবর্তীতে ঢাকার মগবাজারে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রুমার নানা ছিলেন পটুয়াখালীর বিশিষ্ট আইনজীবী, তার মা-ও আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

পড়াশোনায় অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন রুমা। ১৯৭৫ সালে এসএসসি পাশ করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মার্কেটিং বিভাগ থেকে ১৯৮২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৮৫ সালে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশে (আইসিবি) সিনিয়র অফিসার হিসেবে বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু করেন।

পরবর্তী জীবনে তিনি এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন। স্বামীর মেশিনারি পার্টসের ব্যবসা ছিল। স্বামীর আগের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে থাকলেও রুমার নিজের কোনো সন্তান ছিল না। বিয়ের প্রায় ২০ বছর পর স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে তার সাজানো জীবন তছনছ হয়ে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে দেবরদের আশ্রয়ে ছিলেন; কিন্তু সেখান থেকেও একদিন তাকে বাসে তুলে দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়।

এরপর প্রায় তিন বছর কাটিয়েছেন এক খালাতো বোনের আশ্রয়ে। কিন্তু সেখানেও শেষপর্যন্ত ঠাঁই মেলেনি। মামার বাড়ি বাসায় গিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও একপর্যায়ে সেখান থেকেও তাকে চলে যেতে হয়। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে অবশেষে কাউনিয়ার এই বৃদ্ধাশ্রমই হয়ে ওঠে তার জীবনের শেষ আশ্রয়স্থল।

রুমার তিন ভাইয়ের মধ্যে একজন কবির আহমেদ নাট্যাঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত। অন্য দুই ভাইয়ের একজন অস্ট্রেলিয়ায় এবং অপরজন কুষ্টিয়ায় বসবাস করেন; কিন্তু ব্যস্ততার এই পৃথিবীতে এখন আর কেউই নিয়মিত তার খোঁজ নেন না। স্বামী নেই, সন্তান নেই—জীবনের প্রান্তবেলায় এসে রক্তের সম্পর্কের প্রিয়জনদের ভিড়টাই যেন তার কাছে সবচেয়ে দূরের মরীচিকা হয়ে উঠেছে।

বৃদ্ধাশ্রমে কেটে গেছে প্রায় এক মাস। নতুন পরিবেশ আর সহযাত্রীদের সঙ্গে দিন কাটলেও হঠাৎ নীরব হয়ে যান তিনি। তখন চোখে-মুখে ফুটে ওঠে হাহাকার।

কাউনিয়ার ওই বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রুমা মা অত্যন্ত শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত কর্মজীবী ছিলেন। জীবনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন; কিন্তু শেষ বয়সে এসে তিনি একেবারেই স্বজনহীন ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। প্রিয়জনরা সবাই তাকে ত্যাগ করার পর আমরা তাকে এখানে নিয়ে এসে জীবনের শেষ বেলাটুকু কাটানোর ঠিকানা দিয়েছি।

কাউনিয়ার এই বৃদ্ধাশ্রমে বর্তমানে প্রায় ৭০ জন প্রবীণের বসবাস। কারও সন্তান থেকেও নেই, আবার কেউ স্বজনদের নির্মম আচরণে বাস্তুহারা হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা হলেও শেষ বয়সের নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা যেন একই সুতোয় গাঁথা।

রুমা হয়তো আর কখনো ফিরতে পারবেন না মগবাজারের সেই চেনা আঙিনায়, আর ফিরে আসবে না স্বামী কিংবা কর্মজীবনের মুখর দিনগুলো। এখন তার সামনে কেবলই নতুন কিছু মুখ আর এক টুকরো আশ্রয়। তবু একাকিত্বের মাঝে অপলক তাকিয়ে থেকে হয়তো মনের অজান্তেই তিনি প্রতীক্ষা করেন—কেউ একজন এসে পরম মমতায় ডাক দিয়ে বলবে- চলো, তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাই।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

দাম্পত্য কলহে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, স্বামী-দেবর আটক

দাম্পত্য কলহে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, স্বামী-দেবর আটক

‘সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে দুর্গোৎসব এখন সার্বজনীন আনন্দের দিন’

‘সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে দুর্গোৎসব এখন সার্বজনীন আনন্দের দিন’

মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে সংঘর্ষ, কোস্টগার্ডের ১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি

মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে সংঘর্ষ, কোস্টগার্ডের ১১ রাউন্ড ফাঁকা গুলি

চিঠির খাম থেকে পার্সেল, বদলে যাওয়া ডাকপিয়নের গল্প

চিঠির খাম থেকে পার্সেল, বদলে যাওয়া ডাকপিয়নের গল্প

থানা থেকে পালালেন আটক পুলিশ কর্মকর্তা

থানা থেকে পালালেন আটক পুলিশ কর্মকর্তা

ঋণের বোঝা সইতে পারলেন না পুলিন

ঋণের বোঝা সইতে পারলেন না পুলিন

আরও পড়ুন

প্রার্থীর সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তার গোপন বৈঠক, শোকজ

প্রার্থীর সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তার গোপন বৈঠক, শোকজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী রুমা এখন বরিশালের বৃদ্ধাশ্রমে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী রুমা এখন বরিশালের বৃদ্ধাশ্রমে

এক টিকিটে ১০-১২ যাত্রী, যুবকের কারাদণ্ড

এক টিকিটে ১০-১২ যাত্রী, যুবকের কারাদণ্ড

কিশোরী ধর্ষণের দায়ে যুবকের মৃত্যুদণ্ড

কিশোরী ধর্ষণের দায়ে যুবকের মৃত্যুদণ্ড

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম