আগে হামলা, এবার হত্যা: সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানকে কেন টার্গেট?
Advertisement
কামাল হোসাইন, নেত্রকোনা
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানকে একটি চায়ের দোকানের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, দুই যুবক খুব কাছ থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে পরপর অন্তত পাঁচটি গুলি ছুড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি একটি অত্যন্ত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানের ওপর হামলার ঘটনা এবারই প্রথম নয়; এর আগেও তিনি প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছিলেন। গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে তাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। সেই সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাকেও অস্ত্র উঁচিয়ে তাড়া করা হয়।
এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে এবার গুলি করে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। আগের হামলার সঙ্গে বৃহস্পতিবারের হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে অতীতে হামলার শিকার হওয়ার পরও সুরক্ষার অভাব এবং প্রকাশ্য স্থানে তাকে গুলি করার ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
যে কারণে তাকে টার্গেট করা হয়েছিল
লুৎফুজ্জামান আইপিটিভি ‘চ্যানেল রূপসী বাংলার’ নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে তিনি নিয়মিত স্থানীয় নানা অপরাধ, চোরাচালান, দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য এবং অনুসন্ধানী ভিডিও প্রকাশ করতেন।
হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই ঘণ্টা আগেও ওই পেজে একটি পোস্ট দেন তিনি। সেখানে স্থানীয় এক মাদককারবারিকে নিয়ে তিনি তথ্য তুলে ধরেছিলেন বলে জানা গেছে।
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান কলমাকান্দার পোগলা ইউনিয়নের শুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। তবে তিনি পরিবার নিয়ে দুর্গাপুর বিরিশিরি এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। তিনি সীমান্ত এলাকার মাদক ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের আগে তার কোনো প্রতিবেদন বা ভিডিও নিয়ে কারো সঙ্গে গভীর বিরোধ তৈরি হয়েছিল কিনা কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্র তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল কিনা—এসব বিষয় এখন তদন্তের দাবি রাখে। তবে পুলিশ এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট চক্র বা ব্যক্তির নাম জানায়নি।
ঘটনাস্থলে পুলিশের একাধিক ইউনিট
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে ছুটে যান পুলিশ ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাত।
পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিকভাবে এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক বিশেষ ইউনিট মাঠে নেমেছে। ঘটনাস্থল থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জের পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ঘাতকদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা
প্রকাশ্য স্থানে একজন গণমাধ্যমকর্মীকে এভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এক বছর আগে হামলার শিকার হওয়ার পরও কেন কোনো কার্যকরী প্রতিরোধ বা বিচার নিশ্চিত হয়নি, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় আপসহীন ছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতের এ বর্বরোচিত হামলায় নিভে গেল একটি তাজা প্রাণ।
লুৎফুজ্জামানের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের এবং আসামিদের গ্রেফতারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
