মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলেন সুইটি, এখন লাশ ফেরত চান মা
Advertisement
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে প্রবাসী সুইটি আক্তার স্মৃতির বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার শিরশ্ছেদের খবর ছড়িয়ে পড়ায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে পরিবার।
পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকা অবস্থায় সুইটি তাদের জানিয়েছিলেন, দুই মাস পর মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরবেন।
সুইটির মা জহুরা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সুইটিকে জীবিত এনে দাও। সুইটিকে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেকে বলছে, আমার মেয়ের ফাঁসি হয়েছে। ফাঁসি হলে আমার সুইটির লাশ এনে দাও। আমি সরকারের কাছে আমার মেয়েকে ফেরত চাই।’
তিনি বলেন, তার মেয়ে দুইবার স্বামী ছাড়া হওয়ার পর আর বিয়ে করতে চাননি। কাজ করে জীবিকা নির্বাহের জন্যই বিদেশে গিয়েছিলেন।
মেয়ের ছবি হাতে বাড়ির এদিক-সেদিক ঘুরছেন বাবা ফজল মিয়া। তিনিও মেয়েকে ফেরত চাইছেন। ফজল মিয়া বলেন, ধারদেনা করে মেয়ে সুইটিকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। মাটি কেটে ও ভ্যান চালিয়ে সেই ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করছেন। এখনো ১০ হাজার টাকা ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে মেয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনছেন।
ফজল মিয়া জানান, কারাগারে যাওয়ার পর প্রতি মাসে একবার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন সুইটি। গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে ও সন্ধ্যায়ও মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয় তাদের। তখন সুইটি জানিয়েছিলেন, দুই মাস পর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দেশে ফিরবেন।
সুইটি আক্তার মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী চড়পাড়া গ্রামের ফজল মিয়া ও জহুরা বেগম দম্পতির পাঁচ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার ছয়-সাত মাস পর মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে সুইটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে পরিবার জানতে পেরেছে।
সুইটির বড় বোন বিউটি বেগম জানান, তারা পাঁচ বোন, কোনো ভাই নেই। সবারই বিয়ে হয়েছে। তৃতীয় বোন মুন্নী আক্তার সৌদি আরবে দুই বছর প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে সংসার করছেন।
বিউটি বেগম জানান, ২০১৭ সালে মির্জাপুর উপজেলার তরফপুর গ্রামের সেলিম নামে এক যুবকের সঙ্গে সুইটির বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছর পর পারিবারিক কলহের জেরে তাদের বিচ্ছেদ হয়। ২০১৮ সালে উপজেলার মহেড়া গ্রামের শিপন নামে আরেক যুবকের সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক মাস পর শিপন তার বাবার আর্থিক সহায়তায় সৌদি আরবে যান। সেখানে যাওয়ার পর সুইটির ভরণপোষণসহ সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে পরিবার জানতে পারে, শিপন সেখানে আরেকটি বিয়ে করেছেন। এরপর শিপনের সঙ্গেও সুইটির বিচ্ছেদ হয়।
সুইটি আক্তার স্মৃতির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে গ্রামবাসী নিয়মিত তাদের বাড়িতে আসছেন। গণমাধ্যমকর্মী ও প্রশাসনের লোকজনও বাড়িতে যাচ্ছেন। মেয়ের এমন পরিণতির খবরে শোকস্তব্ধ পরিবারটি।
গ্রামের বাসিন্দা লোকমান মিয়া বলেন, ‘সৌদি আরবে মদের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে শুনেছি। তাদের দেশের নারীরা নাচ-গান করছেন। আমাদের দেশের মানুষের জন্য সৌদি আরবে আইন এত কঠিন কেন?’
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, সৌদি আরবে একটি মসজিদের আঙিনা পরিষ্কার করা এবং হাজিদের সেবা করার কাজ করতেন তার মেয়ে। সুইটির এক বান্ধবী ফোনে তাদের জানিয়েছিলেন, এক ছেলের সঙ্গে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের আগে সুইটি ৪০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। কারাগার থেকে মাঝেমধ্যে ফোন করতেন এবং দুই মাসের মধ্যে মুক্তি পেয়ে দেশে ফেরার কথাও জানিয়েছিলেন।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলম বলেন, এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো সংবাদ পাননি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছেন।
