চট্টগ্রাম জামায়াতে বিভক্তি, আমির নির্বাচনে রুকন সম্মেলনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। ১৮ অক্টোবর নগরীর জিইসি কনভেনশন হলে রুকন (সদস্য) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে চট্টগ্রাম মহানগর আমিরের ভোটগ্রহণও সম্পন্ন হয়।
সম্মেলনে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সাবেক আমির ও এমপি শাহজাহান চৌধুরীকে ভোট না দিতে কৌশলে রুকনদের প্রতি আহ্বান জানান চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ শাহজাহান। এতে চট্টগ্রাম জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। আমির নির্বাচন নিয়ে মহানগর নেতাদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে স্পষ্ট বিভক্তির চিত্র ফুটে উঠেছে। চট্টগ্রাম-১৫ আসনের এমপি শাহজাহান চৌধুরী বর্তমানে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জামায়াতের নেতারা জানান, গত ১৮ অক্টোবর জিইসি কনভেনশন হলে রুকন সম্মেলন ও আমির নির্বাচন সম্পন্ন হয়।
সম্মেলনে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমির নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেন্দ্রে দায়িত্বরত কোনো জনশক্তিকে আমির পদে ভোট দেওয়া যাবে না।’
এছাড়াও রুকন সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন- চট্টগ্রাম অঞ্চল টিম সদস্য মুহাম্মদ জাফর সাদেক, মহানগর আমির নজরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি অধ্যক্ষ নুরুল আমিন।
জামায়াতের একাধিক রুকন যুগান্তরকে জানান, কেন্দ্রের জনশক্তি বলতে মহানগর জামায়াতের সাবেক আমির ও এমপি শাহজাহান চৌধুরীকে বোঝানো হয়েছে। কেননা চট্টগ্রাম মহানগরীতে শাহজাহান চৌধুরীর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তার গ্রহণযোগ্যতাও অন্যদের চেয়ে আলাদা। শাহজাহান চৌধুরী চট্টগ্রাম মহানগরীর জামায়াতের আমির থাকা অবস্থায় দলটি গতিশীল ছিল। তাকে আমিরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর সেই গতি অনেকটাই মন্থর হয়ে গেছে। সেই রমরমা অবস্থা আর নেই।
শাহজাহান চৌধুরী নগর জামায়াতের আমির থাকাকালীন দেওয়ানবাজারের মহানগর অফিসে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সবসময় জমজমাট থাকত। সরব থাকত। সেই সরব উপস্থিতি এখন নেই।
আলমগীর হোসেন নামে এক দায়িত্বশীল যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে জামায়াতে ইসলামীতে স্থানীয় পর্যায়ে স্পষ্ট বিভক্তি দেখা দিয়েছে। একপক্ষে রয়েছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মাওলানা মোহাম্মদ শাহজাহান, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী, নগর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এসএম লুৎফুর রহমান, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ফয়সাল মোহাম্মদ ইউনুস। তাদের বলয়ের বাইরে গেলেই ভিন্ন চোখে দেখা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জামায়াতের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান যুগান্তরকে বলেন, ‘একটি শাখার আমির নির্বাচনের ভোটার হচ্ছেন তারা, যারা রুকন। সংশ্লিষ্ট শাখায় কোনো রুকন যদি সংশ্লিষ্ট ভোটার তালিকার বাইরে কাউকে ভোট দেন, কেন্দ্রের বা অন্য কোনো শাখার কাউকে ভোট দেন, তবে সঙ্গতকারণে ওই ভোটটি বাতিল হয়ে যাবে। তাই আমার ইনস্ট্রাকশনে (নির্দেশনায়) ছিল ভোটার তালিকার বাইরে আমাকেও কোনো ভোট দেবেন না। অন্য কাউকেও ভোট দেবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমির নির্বাচনের স্বাধীনতা রুকনদের ওপর। আরেকটা কথা যেটা বলা হচ্ছে— যে তিনি (শাহজাহান চৌধুরী) দীর্ঘ সময় আমির ছিলেন, তার কারণে নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। রুকনদের অধিকার আছে ওই আমিরকে বাদ দিয়ে সেখানে আরও পোটেনশিয়াল নেতৃত্ব থাকলে তাকে ভোট দেওয়ার।’
২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর শাহজাহান চৌধুরী চট্টগ্রাম মহানগরীর আমির হিসেবে শপথ নেন। গত বছরের ১৪ জুন ‘জরুরি দায়িত্বশীল বৈঠকে’ শাহজাহান চৌধুরীকে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমিরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয় নজরুল ইসলামকে। একই বছরের ৫ নভেম্বর সদস্যদের (রুকন) প্রত্যক্ষ ভোটে ২০২৫-২৬ সালের জন্য আমির নির্বাচিত হন নজরুল ইসলাম। ওই দিন নগর জামায়াতের অফিসে (বিআইএ মিলনায়তনে) তাকে আমির হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করান কেন্দ্রীয় জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা মোহাম্মদ শাহজাহান।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে জামায়াতের ৩ হাজার রুকন রয়েছেন। গত ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রুকন সম্মেলনে এদের অধিকাংশই উপস্থিত ছিলেন এবং তারা আমির নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। শাহজাহান চৌধুরীর নাম আমিরের প্যানেল বা প্রার্থী তালিকায় না থাকায় অনেক রুকন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন। ২০২৪-২৫ সেশনে রুকনদের ১ হাজার ৪০০ ভোট পেয়ে আমির নির্বাচিত হয়েছিলেন শাহজাহান চৌধুরী।
সর্বশেষ গত ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রুকন সম্মেলনে আমির নির্বাচনের ভোটের ফলাফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। ডিসেম্বরে ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রভাব বিস্তার এবং প্যানেলে নাম না রাখায় এবারও (২০২৬-২৭) মেয়াদের জন্য বর্তমান আমির নজরুল ইসলাম পুনরায় আমির নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে ‘বিতর্কিত’ হয়ে পড়েছিলেন শাহজাহান চৌধুরী। সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে জামায়াত থেকে নির্বাচন করে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এমপি হলেও নগর জামায়াতের আমিরের পদ থেকে তাকে বাইরে রাখা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
