সংলাপ চললেও অবরুদ্ধ সাজেক, পাঁচ দাবির একটিতে আটকা সমঝোতা
Advertisement
সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম
সংলাপ চললেও অবরুদ্ধ সাজেক, পাঁচ দাবির একটিতে আটকা সমঝোতা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে সংকট নিরসনে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংলাপ চললেও কাটছে না অচলাবস্থা।
পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতার কথা জানানো হলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি নিয়ে মতবিরোধে প্রত্যাহার হয়নি অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ।
এতে সাজেকের পর্যটন, পরিবহণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। স্থায়ী সমাধান নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
জানা যায়, ষষ্ঠ দিনের মতো মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল থেকে সাজেক পর্যটন সড়কের মাচালঙ ১৪ কিলো, ২নং কালভার্ট, গঙ্গারাম লাদুমনিবাজার, বাঘাইহাট হাজাছড়া, ১০ নম্বর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধ পালিত হয়েছে। এতে জরুরি সেবা গাড়ি ছাড়া কোনো যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি বলে জানান স্থানীয়রা।
সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, স্থানীয় দুটি সংগঠনের ডাকা অবরোধের ফলে যানবাহন চলাচল না করলেও বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলও জোরদার রয়েছে।
এদিকে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সাজেকের উজোবাজারে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সরকারি প্রতিনিধি দল ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বৈঠক হয়। এতে নেতৃত্ব দেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান। এ সময় দুই জেলার প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া এবং সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে সরকারপক্ষ সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি। এ দাবিতে প্রশাসন কিছুটা সময় চাইলেও আন্দোলনকারীরা পাঁচ দিনের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ মতপার্থক্যেই বৈঠকটি চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।
আলোচনার বিষয়ে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, পাঁচ দফার প্রায় চারটিতে সমঝোতা হয়েছে। বাকি বিষয়টিও আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশা করছেন তারা। সোমবার সময়ের কারণে আলোচনা শেষ করা যায়নি। আলোচনা এখনো চলমান আছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ওয়াদুদ ভূঁইয়ার ভাষ্যমতে, সরকার পাহাড়ে সব সশস্ত্র গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এতে একটা দল বাদ রেখে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কোনো বৈষম্য থাকবে না। অপরাধী সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগেও তিনি বলেছিলেন, সাজেক আগে একটি আঞ্চলিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে অন্য একটি সংগঠনের প্রবেশের পর বিরোধ বেড়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পক্ষ অন্য সংগঠনকে এলাকা থেকে সরানোর দাবি জানাচ্ছে। প্রশাসনের বিবেচনায় বিষয়টি শুধু অবরোধের নয়, বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উপস্থিতি ও নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তবে আন্দোলনকারীদের নেতা বাবুধন চাকমা জানিয়েছেন, সব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। সরকারি প্রতিনিধি দল সশস্ত্র সন্তু গ্রুপকে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে না পারায় ওইদিন সমঝোতা হয়নি, তাই অবরোধ অব্যাহত থাকবে। এছাড়া ওই আলোচনার পর এ পর্যন্ত সরকারি দলের পক্ষে তাদের সঙ্গে আর কোনো রকম যোগাযোগ করা হয়নি।
এর আগে সংকট নিরসনে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে হেডম্যান ও কারবারিদের নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করলেও আন্দোলনকারীরা সেই সভায় যোগ দেননি। ফলে মধ্যস্থতার উদ্যোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এদিকে অবরোধে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ও পর্যটকদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হোটেল-রিসোর্ট মালিক, পরিবহণ শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল সাময়িক আশ্বাস নয়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দাবিগুলোর বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা জরুরি। তা না হলে সংলাপ চললেও সাজেকের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসভাপতি রিন্টু চাকমা বলেন, সাজেক পর্যটন সড়কে টানা অবরোধের ফলে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সাজেক পর্যটকশূন্য। এতে রিসোর্ট-কটেজ এবং অন্যান্য খাতে প্রায় ২০-২৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। টানা অবরোধের কারণে সাজেকে সবক্ষেত্রে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সংকট মারাত্মক আকারে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের উদ্বেগ
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সাজেকে সশস্ত্র হামলার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আবারও সশস্ত্র গ্রুপটিকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারী সংগঠনের নেতারা।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, তারা বিশেষ সূত্রে খবর পেয়েছেন যে, জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা সাজেকের গঙ্গারাম এলাকায় হামলার পরিকল্পনা করছে। এ জন্য তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সাজেকের জনগণকে সশস্ত্র সন্ত্রাস ও নিরাপত্তা হুমকি থেকে রক্ষা করতে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে তারা মন্তব্য করেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জেএসএস কেন্দ্রীয় সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাদের দলে সাজেকসহ কোথাও সশস্ত্র গোষ্ঠী নেই। জেএসএস সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী।
