মায়ের ঠাঁই জীর্ণ ঘরে, অধ্যক্ষ ছেলের বিলাসী জীবন
Advertisement
হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০২ এএম
বৃদ্ধ মমেনা ও অধক্ষের বাড়ি। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাবা-মায়ের জমিতে গড়ে তোলা পাকা বাড়িতে ছেলের সচ্ছল জীবনযাপন। অথচ সেই ছেলের ৮০ বছর বয়সি মায়ের ঠাঁই হয়েছে মেয়ের বাড়ির জরাজীর্ণ একটি ঘরে। ঘরের টিনের চাল ও বেড়ার অসংখ্য ফুটো দিয়ে দিনে সূর্যের আলো, রাতে চাঁদের আলো ঢোকে। বৃষ্টি নামলে ভিজে যায় বিছানা-বালিশ। চোখে ঝাপসা দেখলেও কাঁথা সেলাই করে কোনোরকমে চলছে বৃদ্ধার জীবন।
এমনই দুর্বিষহ জীবন কাটছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার উমরমজিদ ইউনিয়নের মমেনা বেগমের। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রায় ১৪ বছর আগে তাকে ও তার স্বামী আব্দুস সাত্তারকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের ছেলে মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে। তিনি উপজেলার রাজমাল্লীরহাট সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। তবে মোখলেছুরের দাবি, মাকে একাধিকবার বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তিনি ফেরেননি। তার মা মেয়েদের নামে জমি লিখে দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
মমেনা বেগমের অভিযোগ, বাবা-মায়ের জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন তার ছেলে। কিন্তু আরও জমি লিখে দিতে না চাওয়ায় বিরোধের সূত্রপাত। কন্যাসন্তান থাকায় বাবা-মা তাকে কিছু জমি দিলেও তাতে সন্তুষ্ট হননি মোখলেছুর। একপর্যায়ে তারা বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর মেয়ে খাদিজা বেগমের আশ্রয়ে শুরু হয় তাদের নতুন জীবন। চার বছর আগে সেখানেই মারা যান আব্দুস সাত্তার। স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়ের বাড়িতে থেকে কাঁথা সেলাই করেই দিন পার করছেন বৃদ্ধা মমেনা।
জমি নিয়ে বিরোধের কথা তুলে ধরে মমেনা বেগম বলেন, ‘তোমরা তিন ভাইবোনে জমি খাইবেন। বোনদের কম দিবি, তুই বেশি খাবি।’
তার ভাষ্য, জমি লিখে না দিলে ছেলে তাকে বাড়িতে থাকতে না দেওয়ার কথা বলতেন। এ ছাড়া ছেলের বিরুদ্ধে তাকে ও তার স্বামীকে মারধরের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। মমেনার অভিযোগ, ছেলের স্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলতে শুনেছেন, ‘আয় তো আয়, ওই বুড়ার হাত-ঠ্যাং ভাঙি দিয়ে পুশুমো।’
মমেনা বেগম ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও জানাজা ও দাফনে অংশ নেননি মোখলেছুর রহমান। নিজের বসতভিটায় স্বামীকে দাফন করার ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণ হয়নি বলে আক্ষেপ করেন মমেনা। এসব অভিযোগ প্রকাশ করলে ছেলে তাকে মেরে ফেলতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
মমেনার মেয়ে খাদিজা বেগমের অভিযোগ, ছোট বোনের জন্য নির্ধারিত জমিতে ঘর নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন তাদের মা। কিন্তু মোখলেছুর রহমান এতে বাধা দেন। জমি লিখে দিতে অস্বীকৃতি জানালে বাড়ি নির্মাণে ব্যয় করা ১৩ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে বলে দাবি করেন তিনি। খাদিজার দাবি, পারিবারিক বিরোধের জেরে তাদের বাবা-মাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, মোখলেছুরের মা-বাবা দীর্ঘদিন মেয়ের বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন। সেখানেই তার বাবা মারা যান। এখন বৃদ্ধা মাও একই বাড়িতে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তার অভিযোগ, মা-বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর মোখলেছুর আর তাদের খোঁজখবর রাখেননি।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ আলীর ভাষ্য, বাবার মৃত্যুর সময়ও মোখলেছুর জানাজা ও দাফনে উপস্থিত ছিলেন না। শিক্ষিত হয়েও মায়ের প্রতি এমন আচরণ দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আরেক বাসিন্দা ফারুক আহমেদ বলেন, একজন মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিজের মায়ের সঙ্গে এমন আচরণের অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত দুঃখজনক। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘মাকে একাধিকবার ফিরতে বললেও তিনি আসেননি। অনেকবার আনার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু আসেননি। তার জমিজমা তিনি মেয়েদের লিখে দিয়েছেন।’
স্থানীয় উমর মজিদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহসানুল কবির আদিল বলেন, ‘প্রতিটি সন্তানের উচিৎ সর্বস্ব দিয়ে বাবা-মায়ের সেবা করা। এটি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ১৪ বছর আগে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়টি সত্য হলে তা সমাজে অমানবিক একটি কাজ। এটা আমরা মানতে পারি না। তবে এ বিষয়ে কখনো কেউ আমার কাছে অভিযোগ করেনি। আপনার কাছে শুনলাম। কেউ অভিযোগ করলে আমি বিষয়টির সুষ্ঠু সুরাহার উদ্যোগ নিতাম।’
কুড়িগ্রামের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসান হাবিব নিলু বলেন, সমাজে পারিবারিক বন্ধন ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব পালনে অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে। বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে সরকার ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা ও শাস্তির বিধান রয়েছে।
যে বয়সে সন্তানের কাছে আশ্রয়, যত্ন ও নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, সেই বয়সে মমেনা বেগমের দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়। একদিকে জরাজীর্ণ ঘরে তার কষ্টের জীবন, অন্যদিকে বাবা-মায়ের জমিতে নির্মিত বাড়িতে ছেলের বসবাস-এই বৈপরীত্য স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে। জীবনের শেষ সময়ে একটু নিরাপত্তা, যত্ন ও সম্মান নিয়ে বাঁচতে চান এই বৃদ্ধা মা।
