ভোটের মাঠে ইতিহাস, রাজপথেও ব্যতিক্রমী খাদ্যমন্ত্রী রিতা
মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভোটের ব্যালটে রেকর্ড গড়ে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন আফরোজা খানম রিতা। নির্বাচনি সাফল্যের ধারাবাহিকতায় প্রথম দফায় বিমানমন্ত্রী, পরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।
একদিকে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও খাদ্যভান্ডার সুরক্ষার গুরুদায়িত্ব, অন্যদিকে রাজপথের রাজনীতিতেও নিজের সক্রিয় উপস্থিতির জানান দিচ্ছেন ব্যতিক্রমী ভঙ্গিতে। মন্ত্রিত্বের প্রটোকল কিংবা গাড়িবহরের আনুষ্ঠানিকতা নয়, দলীয় পতাকা হাতে মানিকগঞ্জের হাজারো নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে বিরামহীন পায়ে হেঁটেছেন রাজধানীর রাজপথে। অতিক্রম করেছেন প্রায় সাত কিলোমিটার পথ।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের কর্মসূচিতে তার এই পদযাত্রা যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেও রাজপথের রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট। ক্ষমতার বলয়ে থেকেও নেতাকর্মীদের কাতারে হাঁটার এই দৃশ্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও রাজপথের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেননি খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে থেকে শুরু হওয়া দলীয় কর্মসূচিতে মানিকগঞ্জ থেকে আসা কয়েক হাজার নেতাকর্মীর নেতৃত্ব দেন তিনি। হাতে ছিল দলীয় পতাকা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও মোড় অতিক্রম করে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ হেঁটে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সমাবেশস্থলে পৌঁছান। দীর্ঘ পথচলায় তার সঙ্গে ছিলেন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। মিছিলের সামনের সারিতে থেকে তার এই নেতৃত্ব উপস্থিত অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল কিংবা পদ-পদবি পরিবর্তনের সঙ্গে নেতাদের চলাফেরার ধরণ বদলে যাওয়ার নজির কম নয়। কিন্তু রিতার সাম্প্রতিক পদযাত্রায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। মন্ত্রীর দায়িত্বে থেকেও তিনি নিজেকে আলাদা করে রাখেননি দলীয় কর্মীদের কাছ থেকে। বরং দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে তাদের সঙ্গে একই কাতারে হেঁটেছেন। রাজপথের কর্মসূচিতে তার এই অংশগ্রহণকে অনেকেই রাজনৈতিক কর্মীসত্তার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
এর আগে বিরোধী দলে থাকাকালেও সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজধানীর রাজপথে সক্রিয় ছিলেন রিতা। দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে বিভিন্ন মোড় প্রদক্ষিণ করে সমাবেশস্থলে পৌঁছেছেন। তখন তিনি ছিলেন আন্দোলনরত দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। আর এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী। সময় ও অবস্থান বদলালেও রাজপথের কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণের ধরনে বড় পরিবর্তন আসেনি। এই ধারাবাহিকতাই তাকে অন্যদের তুলনায় আলাদা করে আলোচনায় এনেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-৩ (সদর-সাটুরিয়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন আফরোজা খানম রিতা। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোটসমর্থিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদ নূর পান ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট। ভোটের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ১০৩। ১৫১টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৫০টিতে সর্বোচ্চ ভোট পান তিনি। নির্বাচনে সাত নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট ও ব্যবধানে জয়ী হওয়ার কৃতিত্বও তার। সরাসরি নির্বাচনে নারী রাজনীতিকদের জয়ী হওয়ার ব্যবধানের হিসাবেও তার অবস্থান তৃতীয় বলে আলোচনায় এসেছে। স্বাধীনতার পর এই আসনে প্রথম নারী সংসদ সদস্যও তিনি।
বাবা সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর হাত ধরে রাজনীতিতে আসা রিতার রাজনৈতিক পথচলায় একাধিক বাঁক রয়েছে। পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে নিজস্ব সাংগঠনিক অবস্থান তৈরি, মানিকগঞ্জে বিএনপির নেতৃত্ব এবং জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ, প্রতিটি ধাপেই নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন তিনি। জেলার সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে দলীয় আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাকে সামনের সারিতে দেখা যায়।
‘মন্ত্রিত্ব আমার দায়িত্ব, আর রাজপথ আমার রাজনৈতিক শিকড়। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্কের পরিবর্তন হবে না’—এমন কথা জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা রোববার সকালে যুগান্তরকে জানান, রাজনীতি আমার কাছে শুধু ক্ষমতা কিংবা পদ-পদবির বিষয় নয়। রাজনীতি মানে মানুষের পাশে থাকা, দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে পথচলা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথই আমাদের সাহস ও প্রেরণার জায়গা ছিল। আজ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকলেও সেই রাজপথ, দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হয়নি। মানিকগঞ্জের নেতাকর্মীরা সব সময় আমার শক্তি ও অনুপ্রেরণা। তাদের সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে পারা আমার জন্য আনন্দের ও গর্বের।
তিনি বলেন, মন্ত্রিত্ব একটি বড় দায়িত্ব। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে আমি সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করতে চাই। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাই আমার রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
