দেশজুড়ে কদর বাড়ছে জুড়ীর বাতাবি লেবুর, বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা
আজিজুল ইসলাম, কুলাউড়া (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
দেশজুড়ে কদর বাড়ছে জুড়ীর বাতাবি লেবুর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার টিলাবেষ্টিত জনপদে উৎপাদিত বাতাবি লেবু, যা স্থানীয় ভাষায় জাম্বুরা নামে পরিচিত। এটি এখন আর শুধু স্থানীয় ফলের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এর সুনাম ও স্বাদ। ফলে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে জাম্বুরার।
ইতোমধ্যে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে শুরু করে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত সরবরাহ হচ্ছে জুড়ীর জাম্বুরা। স্থানীয় কৃষি ও ব্যবসা খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এবার বিদেশের বাজারেও এ ফল পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
জুড়ী উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি টিলা, বসতবাড়ির আঙিনা ও কৃষিজমিতে দীর্ঘদিন ধরে এ ফলের চাষ হচ্ছে। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মাতু জামির’ বা ‘জাম্বুরা’ নামে অধিক পরিচিত। স্বাদে টক, মিষ্টি ও সামান্য তিতা জুড়ীর জাম্বুরার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি জাম্বুরার গাছ লাগিয়ে বাড়তি অর্থ উপার্জন করছেন। আবার কিছু পরিবারের জন্য এ ফল বিক্রিই হয়ে উঠেছে আয়ের অন্যতম উৎস।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, জুড়ীর হায়াছড়া, শুকনাছড়া, জামকান্দি, দুর্গাপুর, গোবিন্দপুর, বিনোদপুর, লালছড়া, রূপাছড়া, লাঠিটিলা, ডোমাবাড়ী, কুচাইরতল, কচুরগুল ও পুটিছড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় জাম্বুরা উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬৬ হেক্টর জমিতে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার জাম্বুরাগাছ। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন।
কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে সাধারণত ১০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত জাম্বুরা ধরে। অনুকূল পরিবেশ ও ভালো পরিচর্যা পেলে কোনো কোনো গাছে ফলের সংখ্যা এক হাজারেও পৌঁছায়। তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ এবং বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ফলটি এখন লাভজনক কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাধারণত আশ্বিন থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত গাছে জাম্বুরা পাওয়া যায়। তবে আশ্বিন থেকে কার্তিকের মাঝামাঝি সময়কে ফল পরিপক্ব হওয়ার প্রধান সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন কৃষকরা।
জুড়ী উপজেলার লাঠিটিলা সড়কের কালামাটি ত্রিমুখী পয়েন্ট এখন জাম্বুরা কেনাবেচার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মৌসুমে বিভিন্ন এলাকার বাগান থেকে সংগ্রহ করা ফল ছোট পিকআপভ্যানে করে এখানে নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। পরে আকার ও মান অনুযায়ী আলাদা করে বস্তায় ভরা হয়। সেখান থেকে বড় ট্রাকে করে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে। বিশেষ করে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাঁচাবাজারে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জাম্বুরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী কালা মিয়া ও হেলাল উদ্দিন জানান, তারা মৌসুম শুরুর আগেই বিভিন্ন বাগানের মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করেন। এরপর নির্ধারিত সময়ে শ্রমিক দিয়ে গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করে বাজারজাত করেন। বাছাই ও বস্তাবন্দি করার পর ট্রাকে করে ঢাকায় পাঠানো হয় এই ফল। যাত্রাবাড়ী বাজারে আড়তদাররা বস্তা হিসেবে পাইকারি বিক্রি করেন। ফলের আকার ও মান অনুযায়ী প্রতি বস্তার দাম পড়ে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা।
তাদের ভাষ্য, আগে জুড়ীর জাম্বুরার প্রধান বাজার ছিল সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা। এখন দেশের বড় শহরগুলোতে ক্রেতা তৈরি হওয়ায় ব্যবসার পরিধি বেড়েছে। প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ট্রাক জাম্বুরা দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হচ্ছে।
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর ফল ব্যবসায়ী মারুফ আহমদ বলেন, জুড়ীর জাম্বুরা তাদের বাজারে বেশ জনপ্রিয়। ক্রেতারা এই ফলের স্বাদ পছন্দ করেন। ফলে বাজারে আসার পর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না, দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইনভিত্তিক ফল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়াম ফ্রুটসের স্বত্বাধিকারী আবু সাঈদ আল সাগর জানান, গত দুই বছর ধরে তারা জুড়ী থেকে জাম্বুরা সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন। ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়ায় ভবিষ্যতে এ ফল বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। তার মতে, সঠিকভাবে বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে জুড়ীর জাম্বুরা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
স্থানীয় জাত সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগের উদ্যোগ জুড়ীর জাম্বুরার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা এবং উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ‘জুড়ী বাতাবিলেবু-১’ ও ‘জুড়ী বাতাবিলেবু-২’ নামে দুটি জাত শনাক্ত ও উদ্ভাবন করা হয়। জাত দুটির ফল আকারে বড় এবং স্বাদে সুস্বাদু। এর মধ্যে একটির শাঁস গাঢ় লাল, অন্যটির শাঁস আংশিক সাদা।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, শুকনাছড়া গ্রামের প্রবীণ কমলাচাষি প্রয়াত ইব্রাহিম আলীর বাড়িতে এসব জাতের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে আরও ১৬টি সম্ভাবনাময় জাম্বুরার জাত শনাক্ত করেছে কৃষি অফিস। এসব জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই-বাছাই করে চারা উৎপাদন এবং নতুন বাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষকদের মধ্যে বাতাবিলেবু-১, বাতাবিলেবু-২ ও বারি বাতাবিলেবু-৫-এর চারা বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাগান ব্যবস্থাপনা, গাছের পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান বলেন, জুড়ীতে জাম্বুরা প্রাকৃতিকভাবেই ভালো জন্মে। এখানকার জাম্বুরার জাতগুলো অত্যন্ত ভালো। সারা দেশে বাতাবিলেবুর চাহিদা থাকলেও বাজারে সব সময় মানসম্মত জাতের ফল পাওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, চাহিদা বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে উন্নত জাতের চারা বিতরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া আরও ১৬টি জাতের বৈশিষ্ট্য যাচাই করে চারা উৎপাদন ও নতুন বাগান সম্প্রসারণের প্রস্তুতি চলছে। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। জুড়ীর এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারলে এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হবে উল্লেখ করে তিনি কৃষকদের জাম্বুরা চাষ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
