Logo
Logo
×

Advertisement

ডাক্তার আছেন

এনাল ফিশার হলেই কি অস্ত্রোপচার? জানুন লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

Icon

ডা. মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দীন খান

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

এনাল ফিশার হলেই কি অস্ত্রোপচার? জানুন লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

ফাইল ছবি

Advertisement

মলত্যাগের সময় তীব্র ব্যথা, মলের সঙ্গে সামান্য টাটকা রক্ত কিংবা মলত্যাগের পরও দীর্ঘক্ষণ জ্বালাপোড়া—এমন সমস্যায় অনেকেই ভোগেন। কিন্তু লজ্জা, সংকোচ কিংবা অপারেশনের ভয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। কেউ কেউ আবার চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খান কিংবা বিভিন্ন লোকজ ও কবিরাজি চিকিৎসার আশ্রয় নেন। অথচ এসব উপসর্গের একটি সাধারণ কারণ হতে পারে এনাল ফিশার।

আশার কথা হলো, এনাল ফিশারের অধিকাংশ প্রাথমিক ও জটিলতাহীন ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো হওয়া সম্ভব। তাই আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা।

এনাল ফিশার কী?

আমাদের পায়ুপথের মুখে একটি সংবেদনশীল ত্বক থাকে। এই ত্বকে সরু ফাটল বা ক্ষত তৈরি হলে তাকে এনাল ফিশার বলে। সাধারণত শক্ত মল, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার কারণে এ সমস্যা হয়। দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া বা বারবার পাতলা পায়খানার কারণেও ফিশার হতে পারে। নারী-পুরুষ উভয়েরই এবং যেকোনো বয়সে এনাল ফিশার দেখা দিতে পারে।

কী কী লক্ষণ দেখা যায়?

এনাল ফিশারের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—

মলত্যাগের সময় কেটে যাওয়ার মতো তীব্র ব্যথা।

মলত্যাগের পর কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত জ্বালাপোড়া বা ব্যথা থাকা।

টিস্যু পেপার বা মলের গায়ে অল্প পরিমাণ উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা।

পায়ুপথে খিঁচুনি বা টান অনুভব করা।

দীর্ঘদিনের ফিশারের ক্ষেত্রে পায়ুপথের কাছে ছোট মাংসল গুটি তৈরি হওয়া।

তবে মনে রাখতে হবে, পায়ুপথে রক্তপাত মানেই এনাল ফিশার নয়। পাইলস, অন্ত্রের প্রদাহ, সংক্রমণ এবং কখনো কখনো ক্যানসারের কারণেও এমন হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়।

ফিশার হওয়ার পর ব্যথার কারণে অনেকেই মলত্যাগ আটকে রাখেন। এতে মল আরও শক্ত হয় এবং ক্ষত আবার ছিঁড়ে যায়।

অন্যদিকে, ব্যথার কারণে পায়ুপথের পেশিতে খিঁচুনি তৈরি হতে পারে, যা ওই স্থানে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে ক্ষত শুকাতে বাধা দেয়। এভাবে ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ক্ষত তৈরি হওয়ার একটি চক্র চলতে থাকে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ফিশার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

চিকিৎসা কি অপারেশন ছাড়াই সম্ভব?

হ্যাঁ। এনাল ফিশারের চিকিৎসায় প্রথম পছন্দ সাধারণত অপারেশনবিহীন চিকিৎসা। বিশেষ করে নতুন বা তীব্র ফিশারের ক্ষেত্রে নিয়মিত মল নরম রাখা, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী উপকৃত হন।

১. খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন

এটাই চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আঁশযুক্ত খাবার খান। শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, লাল চাল, আটার রুটি ও অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খান।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন। তবে কিডনি বা হৃদ্রোগের কারণে পানি সীমিত রাখার নির্দেশ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করুন।

২. মলত্যাগে চাপ দেবেন না

দীর্ঘক্ষণ কমোডে বসে থাকা এবং অতিরিক্ত জোরে চাপ দেওয়া পরিহার করুন। মলত্যাগের বেগ আটকে রাখবেন না। বেগ হলে যথাসময়ে মলত্যাগ করুন। নিয়মিত হাঁটাচলা করুন। শারীরিক সক্রিয়তা কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।

৩. গরম পানিতে বসা

কুসুম গরম পানিতে ১০–১৫ মিনিট বসে থাকা, বিশেষ করে মলত্যাগের পর, ব্যথা ও পেশির খিঁচুনি কমাতে সাহায্য করতে পারে। দিনে দুই থেকে তিনবার এটি করা যায়। পানি যেন অতিরিক্ত গরম না হয়।

৪. মল নরম করার ওষুধ

কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ইসবগুলের ভুসি, পলিইথিলিন গ্লাইকল (পিইজি) অথবা অন্য উপযুক্ত মল নরম করার ওষুধ দিতে পারেন। এসব ওষুধ মলত্যাগ সহজ করে এবং ক্ষত পুনরায় ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়। তবে কোন ওষুধ কত দিন ব্যবহার করতে হবে, তা রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।

৫. ব্যথা কমানোর ওষুধ ও মলম

প্রয়োজনে চিকিৎসক স্বল্পমেয়াদে উপযুক্ত ব্যথানাশক বা স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের ওষুধ দিতে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী ফিশারের ক্ষেত্রে পায়ুপথের পেশি শিথিল করতে কিছু অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করতে দেন চিকিৎসক। এসব ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করা উচিত। নিজের ইচ্ছায় স্টেরয়েডযুক্ত মলম, অ্যান্টিবায়োটিক বা অজানা উপাদানের মিশ্র ক্রিম দীর্ঘদিন ব্যবহার করা ঠিক নয়।

৬. ওষুধেও ভালো না হলে কী করবেন?

পর্যাপ্ত সময় ধরে সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার পরও ফিশার না শুকালে চিকিৎসক রোগীর অবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করবেন। প্রয়োজনে বোটুলিনাম টক্সিন ইনজেকশনের মতো অপারেশনবিহীন বা কম আক্রমণাত্মক চিকিৎসার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। সব রোগীর জন্য এটি প্রয়োজন হয় না।

তাহলে কখন অপারেশন প্রয়োজন?

এখানেই রোগীদের সবচেয়ে বেশি ভয় ও ভুল ধারণা রয়েছে। এনাল ফিশার হলেই অপারেশন করতে হয়—এ ধারণা সঠিক নয়। অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমেই অপারেশনের প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ এবং অন্যান্য চিকিৎসার পরও ক্ষত না শুকালে অস্ত্রোপচার বিবেচনা করা হয়।

সাধারণত নিচের পরিস্থিতিতে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে—

ফিশার দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে এবং যথাযথ চিকিৎসায় ভালো হচ্ছে না।

বারবার ফিশার হচ্ছে এবং তীব্র ব্যথা অব্যাহত রয়েছে।

পায়ুপথের পেশির অতিরিক্ত খিঁচুনির কারণে ক্ষত শুকাতে বাধা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরীক্ষা করে অপারেশনকে সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

কী ধরনের অপারেশন করা হয়?

দীর্ঘস্থায়ী ফিশারের ক্ষেত্রে নির্বাচিত রোগীদের জন্য ল্যাটারাল ইন্টারনাল স্ফিংকটেরোটমি একটি কার্যকর অস্ত্রোপচার। এতে পায়ুপথের অভ্যন্তরীণ পেশির একটি ছোট অংশ কেটে অতিরিক্ত টান কমানো হয়, যাতে ক্ষত শুকাতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ফিশার অপসারণ বা ফিশারেক্টমি এবং প্রয়োজনে অন্য পদ্ধতির চিকিৎসাও করা হয়।

তবে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পায়ুপথের পেশির কার্যকারিতা, আগে থেকে মল ধরে রাখতে সমস্যা আছে কি না, পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচার এবং অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি। স্ফিংকটেরোটমির পর কিছু রোগীর গ্যাস বা মল ধরে রাখার ক্ষমতায় সমস্যা হতে পারে। তাই সবার জন্য একই অপারেশন উপযুক্ত নয়।

অর্থাৎ, অপারেশন হলো নির্বাচিত রোগীর জন্য কার্যকর চিকিৎসা—প্রথম পদক্ষেপ নয়। আবার সত্যিই প্রয়োজন হলে শুধু ভয়ের কারণে অপারেশন অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে রাখাও ঠিক নয়।

এনাল ফিশার হলে কাকে দেখাবেন?

এনাল ফিশারের উপসর্গ দেখা দিলে একজন জেনারেল সার্জন, বিশেষত কোলোরেক্টাল সার্জন বা প্রোক্টোলজি বিষয়ে অভিজ্ঞ সার্জনের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, রোগের স্থায়িত্ব এবং প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করবেন। সব রোগীর একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। ব্যথা অত্যধিক হলে পরীক্ষা কীভাবে করা হবে, সেটিও চিকিৎসক রোগীর আরাম ও নিরাপত্তা বিবেচনা করে ঠিক করবেন।

বিশেষ করে ফিশার দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা ক্ষত পায়ুপথের পাশের দিকে বা একাধিক স্থানে থাকলে অন্য রোগের সম্ভাবনাও যাচাই করা জরুরি।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

পায়ুপথে রক্তপাত বেশি হলে, মাথা ঘুরলে বা দুর্বল লাগলে, জ্বরসহ পায়ুপথে ফুলে যাওয়া বা পুঁজ বের হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। এসব লক্ষণ অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।

এ ছাড়া অকারণে ওজন কমা, রক্তস্বল্পতা, মলত্যাগের অভ্যাসে নতুন পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ থাকলে শুধু ফিশার ভেবে অবহেলা করবেন না।

প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

ভুল ধারণা: ফিশার হলে অপারেশন ছাড়া ভালো হওয়া যায় না।

সঠিক তথ্য: অধিকাংশ নতুন ফিশারের ক্ষেত্রে প্রথমে অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসা করা হয়।

ভুল ধারণা: ব্যথা কমে গেলেই চিকিৎসা বন্ধ করা যায়।

সঠিক তথ্য: ব্যথা কমলেও ক্ষত পুরোপুরি না শুকালে সমস্যা আবার ফিরে আসতে পারে। চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।

ভুল ধারণা: ঘরোয়া বা কবিরাজি ওষুধেই স্থায়ী সমাধান হবে।

সঠিক তথ্য: কিছু সাধারণ অভ্যাস উপকারী হলেও অজানা উপাদানের মলম বা ওষুধ ক্ষতি করতে পারে এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ে দেরি করাতে পারে।

ভুল ধারণা: পায়ুপথের সমস্যা লজ্জার বিষয়।

সঠিক তথ্য: এটি একটি সাধারণ চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। লজ্জা বা সংকোচের কারণে চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

শেষ কথা

এনাল ফিশার কষ্টদায়ক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর চিকিৎসা সম্ভব। নিয়মিত মল নরম রাখা, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, প্রয়োজনমতো ওষুধ ব্যবহার এবং সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া—এসবই সুস্থ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

মনে রাখবেন, এনাল ফিশার মানেই অপারেশন নয়। প্রথমে সঠিক রোগ নির্ণয়, এরপর অপারেশনবিহীন চিকিৎসা; আর প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে অস্ত্রোপচার।

ব্যথা বা রক্তপাতকে লুকিয়ে রাখবেন না। ভয় নয়, সচেতনতাই হোক সুস্থতার প্রথম পদক্ষেপ।

লেখক

ডা. মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দীন খান

সহকারী অধ্যাপক, সার্জারি বিভাগ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ

চেম্বার: আলোক হাসপাতাল, মিরপুর-৬

হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

বারবার ইউরিন ইনফেকশন, যেসব কারণে নারীদের ঝুঁকি বাড়ে

বারবার ইউরিন ইনফেকশন, যেসব কারণে নারীদের ঝুঁকি বাড়ে

শরীরের বাড়তি ওজন কমিয়ে দিতে পারে স্মৃতিশক্তি, বলছে গবেষণা

শরীরের বাড়তি ওজন কমিয়ে দিতে পারে স্মৃতিশক্তি, বলছে গবেষণা

ওজন কমাতে সকালের নাস্তায় দই, চিয়া সিডস ও ওটস কতটা কার্যকর?

ওজন কমাতে সকালের নাস্তায় দই, চিয়া সিডস ও ওটস কতটা কার্যকর?

ধূমপান না করলেও নারীদের হতে পারে ফুসফুসের ক্যানসার, নেপথ্যে কী?

ধূমপান না করলেও নারীদের হতে পারে ফুসফুসের ক্যানসার, নেপথ্যে কী?

হজমের সমস্যায় ভুগছেন? এই ৫ লক্ষণ অবহেলা করবেন না

হজমের সমস্যায় ভুগছেন? এই ৫ লক্ষণ অবহেলা করবেন না

মিষ্টি পাকা পেঁপে চেনার উপায়

মিষ্টি পাকা পেঁপে চেনার উপায়

আরও পড়ুন

এনাল ফিশার হলেই কি অস্ত্রোপচার? জানুন লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

এনাল ফিশার হলেই কি অস্ত্রোপচার? জানুন লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

ওজন কমাতে সকালের নাস্তায় দই, চিয়া সিডস ও ওটস কতটা কার্যকর?

ওজন কমাতে সকালের নাস্তায় দই, চিয়া সিডস ও ওটস কতটা কার্যকর?

হার্টের ভালভ সুস্থ রাখতে যে অভ্যাসগুলো মেনে চলা জরুরি

হার্টের ভালভ সুস্থ রাখতে যে অভ্যাসগুলো মেনে চলা জরুরি

হার্ট অ্যাটাক হলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন

হার্ট অ্যাটাক হলে প্রথম ৫ মিনিটে যা করবেন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম