Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

জাতীয় নির্বাচন: এগিয়ে আসছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মাহেন্দ্রক্ষণ

Advertisement

Icon

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১০ পিএম

জাতীয় নির্বাচন: এগিয়ে আসছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মাহেন্দ্রক্ষণ

জাতীয় নির্বাচন লোগো

Advertisement

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ দ্রুত এগিয়ে আসছে। বহুল প্রতীক্ষিত ১২ ফেব্রুয়ারি আসতে আর মাত্র ৩২ দিন বাকি। ভোটাররা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে সেই মুহূর্তটির জন্য। যেখানে তারা ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’- এই চেতনা নিয়ে  লাইনে দাঁড়াবেন এবং হাতে তুলে নিবেন ব্যালট পেপার ও সিল। জানুয়ারির শেষ দশকে প্রতীক বরাদ্দের পর শুরু হয়ে যাবে  প্রচারণার কাজ। দীর্ঘকাল পর ভোটাররা ফিরে পাবেন সেই চিরচেনা ভোটের আমেজ। পোস্টারিং মাইকিং সভা সমাবেশ ও মিছিল মিটিংয়ে সরব হয়ে উঠবে পুরো দেশ।

প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র নির্ধারণের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি। স্বাধীনতার পর থেকে বহু চড়াই-উতরাই, সামরিক শাসন, একদলীয় কর্তৃত্ব, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলন, সহিংসতা ও বর্জনের মধ্য দিয়ে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা আজ এক গভীর সংকটে উপনীত। এ প্রেক্ষাপটে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু আরেকটি নির্বাচনই নয় বরং এটি বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চূড়ান্ত সুযোগ বলে আমি মনে করি।

গত প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ। ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল প্রধান বিরোধী জোটের বর্জনের মধ্য দিয়ে। যেখানে ১৫৩টি আসনে প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যরা। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও ভোটের আগের রাতেই ফল নির্ধারণ, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং বিরোধী প্রার্থীদের দমন-পীড়নের অভিযোগে সেই নির্বাচনও জনগণের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়।

এরপর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও অনিয়ম, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, ভোটার উপস্থিতির করুণ চিত্র এবং ‘ডামি প্রার্থী’ সংস্কৃতি প্রমাণ করেছে যে নির্বাচন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। ফলে মানুষের ভোটাধিকার বা সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।

আমি মনে করি, গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের নাম নয় বরং এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের রাজনীতি করার অধিকার, স্বাধীন বিচার বিভাগ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার সমন্বিত রূপ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে এসব উপাদান একে একে দুর্বল হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশে বাধা, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, আইনের অপব্যবহার, স্বাধীন গণমাধ্যমের সংকোচন এবং নাগরিক পরিসরের সঙ্কোচন-সব মিলিয়ে একটি নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ আজ কার্যত অনুপস্থিত।

এই পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থার অবশিষ্ট অংশটুকুও ভেঙে পড়বে। এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। কিন্তু বাস্তবে ইসি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে। তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকতেই পারে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সুতরাং ত্রয়োদশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ রাখা।

কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার রোধ। ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা। ফল ঘোষণায় স্বচ্ছতা ও দ্রুততা বজায় রাখা। নির্বাচন কমিশন যদি এবারো শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়। তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।

এখানে বলে রাখা ভালো, কোনো রাজনৈতিক দল নয় এবার ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। 

সুতরাং গণতন্ত্র কেবল সরকারের দায়িত্ব নয় বরং রাজনৈতিক দলগুলোরও সমান দায় রয়েছে বলে আমি মনে করি। রাজনৈতিক গুলোকে বুঝতে হবে যে একতরফা বা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতারোহণ বা ক্ষমতায় থাকা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও দল উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। কারণ এতে করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অতএব তাদেরকে জনগণের আস্থা অর্জনের মতো বাস্তব ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে। নির্বাচনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সহিংসতা পরিবারে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা অপরিহার্য। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে,  সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন থাকলে ভোটার উপস্থিতি বাড়ে এবং সহিংসতা কমে।

তবে এই বাহিনীগুলোর ভূমিকা হতে হবে সম্পূর্ণ সাংবিধানিক ও নিরপেক্ষ। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিলে তা রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বাহিনীগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা রক্ষা করাও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

বাংলাদেশ আজ আর বিচ্ছিন্ন কোনো রাষ্ট্র নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতি, শ্রমবাজার, রপ্তানি ও কূটনীতির সঙ্গে দেশটি গভীরভাবে যুক্ত। ফলে একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন শুধু অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এর আন্তর্জাতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্ব ইতোমধ্যে নির্বাচন, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নিষেধাজ্ঞা, ভিসা নীতি কিংবা বাণিজ্যিক চাপ—সবই বাস্তব ঝুঁকি। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই কেবল পারে এই ঝুঁকি কমাতে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই উপেক্ষিত একটি শক্তি হলো সাধারণ জনগণ। ভোটারদের নির্লিপ্ততা ও অনাস্থা গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ‘ভোট দিয়ে লাভ নেই’- এই মানসিকতা ভাঙতে না পারলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।

ত্রয়োদশ নির্বাচন হতে পারে সেই মোড় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। যখন জনগণ আবার ভোটকেন্দ্রে ফিরবে তাদের হারানো অধিকার ও সম্মান ফিরে পাবার প্রশ্নে। তরুণ ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণও এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন রাষ্ট্রকে একটি নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র বা electoral autocracy-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদি এবারও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হয়, তবে—রাজনৈতিক সংকট স্থায়ী রূপ নেবে। সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা বাড়বে। অর্থনীতি ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গণতন্ত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এই কারণেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে আমি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছি।

শেষ কথা:

বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে দুটি পথ—একটি হলো ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ; অন্যটি হলো কিছু ঝুঁকি নিয়ে হলেও একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসা।

রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সর্বোপরি জনগণ-সবার সম্মিলিত সদিচ্ছাই কেবল পারে এই নির্বাচনকে সফল করতে। ব্যর্থ হলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না। সুতরাং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধুমাত্র ক্ষমতার হিসাব নয় বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচরিত্র নির্ধারণের চূড়ান্ত পরীক্ষা বলে আমি মনে করি।

লেখক: সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

সংরক্ষিত নারী আসনটিতে কীভাবে হবে উপনির্বাচন

মিষ্টির পদত্যাগ সংরক্ষিত নারী আসনটিতে কীভাবে হবে উপনির্বাচন

বিএনপির দুই নেতাসহ ৬ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন বিএনপির দুই নেতাসহ ৬ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা

মির্জা ফয়সাল নাকি শামারুহ, কে হচ্ছেন ফখরুলের আসনের কাণ্ডারী?

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন মির্জা ফয়সাল নাকি শামারুহ, কে হচ্ছেন ফখরুলের আসনের কাণ্ডারী?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো মির্জা আব্বাস

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো মির্জা আব্বাস

আইপিইউ প্রতিনিধির কাছে আ.লীগের অভিযোগ, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

আইপিইউ প্রতিনিধির কাছে আ.লীগের অভিযোগ, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

সংসদে প্রথম ওয়াকআউট কবে ও কেন হয়েছিল?

সংসদে প্রথম ওয়াকআউট কবে ও কেন হয়েছিল?

আরও পড়ুন

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

পুঁজির বৃত্তে বন্দি বাজার : করণীয় কী

দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে চাই সুস্থ জীবন

দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে চাই সুস্থ জীবন

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়বে দুর্ভোগ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়বে দুর্ভোগ

আত্মসমীক্ষার রাজনীতি : ব্যারিস্টার রাজ্জাকের দৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী

আত্মসমীক্ষার রাজনীতি : ব্যারিস্টার রাজ্জাকের দৃষ্টিতে জামায়াতে ইসলামী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম