এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল সিনেমা বাজার ভিয়েতনাম
Advertisement
‘রেড রেইন’ সিনেমার একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভিয়েতনামের সিনেমার গল্পটা গত কয়েক বছরে বদলে গেছে। একসময় হলিউড, কোরিয়া, চীন কিংবা থাইল্যান্ডের সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা স্থানীয় সিনেমা এখন নিজের দেশেই বক্স অফিসের বড় চালিকাশক্তি। ২০২৫ সালে দেশটির প্রেক্ষাগৃহের মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.৬ ট্রিলিয়ন ভিয়েতনামিজ ডং-যা দেশটির সিনেমা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিক্রি হয়েছে ৭ কোটির বেশি টিকিট। ২০২৪ সালের তুলনায় আয় বেড়েছে ২৪ শতাংশ এবং টিকিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ। ২০১৯ সালের প্রাক্-কোভিড সময়ের তুলনায় বক্স অফিস আয়ও ৩৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ, ভিয়েতনামের সিনেমা শুধু মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠেনি; বরং নতুন এক প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে ঢুকেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫-টানা তিন বছরই দেশটির বক্স অফিস প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের ওপরে ছিল। প্রায় ১০ কোটি মানুষের দেশটির জন্য এই বাজার এখন এশিয়ার সিনেমা শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।
* বিদেশি প্রজেক্টের ভিড়ে স্থানীয় সিনেমার উত্থান
ভিয়েতনামের সিনেমার বাজারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে স্থানীয় সিনেমার সাফল্যে। ২০২৫ সালে দেশটির বক্স অফিসের ৬২ শতাংশ বাজার দখল করে স্থানীয় সিনেমা। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে স্থানীয় সিনেমার অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রায় ৫০টি স্থানীয় সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। এসব সিনেমার গড় আয় ছিল প্রায় ৬৯ বিলিয়ন ডং-২০১৯ সালের মাত্র ১৮ বিলিয়ন ডংয়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ। তবে সাফল্যের এই চিত্র শিল্পজুড়ে সমান নয়। স্থানীয় সিনেমার প্রায় ৭০ শতাংশ ৫০ বিলিয়ন ডংয়ের নিচে আয় করেছে। অর্থাৎ কয়েকটি বড় হিট সিনেমাই মোট বাজারের বড় অংশ টেনে তুলেছে। এ বৈপরীত্যই ভিয়েতনামের সিনেমা শিল্পের বর্তমান চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক-দর্শক বাড়ছে, বিনিয়োগ বাড়ছে, কিন্তু ঝুঁকিও কমেনি।
* ‘রেড রেইন’-এর সাফল্যে বক্স অফিস চাঙ্গা
২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘মুয়া দো’ (রেড রেইন)। ১৯৭২ সালের কুয়াং ত্রি প্রাচীন দুর্গ রক্ষার ৮১ দিনের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত এ যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডং আয় করে। স্থানীয় সিনেমার বক্স অফিসে এটি নতুন মাইলফলক তৈরি করে। এর সঙ্গে ছিল ‘দ্য ফোর রাস্কেলস’-প্রায় ৩৩২ বিলিয়ন ডং আয় করা কমেডি সিনেমা।
এর ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে-ভিয়েতনামের দর্শক শুধু কমেডি, রোমান্স বা হররেই আটকে নেই। জাতীয় ইতিহাস, যুদ্ধ ও দেশীয় পরিচয়ের গল্পও বড় পর্দায় ব্যাপক দর্শক টানতে পারে।
২০২৫ সালের ঘরানাভিত্তিক হিসাবেও সেই প্রবণতা দেখা যায়। ঐতিহাসিক সিনেমা মোট বক্স অফিসের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দখল করে। এরপর ছিল ড্রামা ২২ শতাংশ, কমেডি ১৮ শতাংশ এবং হরর ১৫ শতাংশ।
* তরুণ দর্শক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ‘ওয়ার্ড অব মাউথ’
ভিয়েতনামের বাজারের আরেকটি বড় শক্তি এর জনসংখ্যাগত কাঠামো। প্রায় ১০ কোটি মানুষের দেশে তরুণ দর্শকের সংখ্যা বড়। ফলে সিনেমার বিপণন এখন শুধু পোস্টার, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন কিংবা ট্রেলারনির্ভর নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রচারমাধ্যম।
সিজিভি ভিয়েতনাম-এর ২০২৫ সালের দর্শক জরিপে দেখা গেছে, অন্য দর্শকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা টিকিট কেনার সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে। তারকা অভিনেতার জনপ্রিয়তাও গুরুত্বপূর্ণ-একই জরিপে ৬২.৮ শতাংশ দর্শক জানিয়েছে, তারকার উপস্থিতি তাদের সিনেমা দেখার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। তবে তারকা থাকলেই সিনেমা সফল-এমন নিশ্চয়তা নেই। ২০২৫ সালে ভিয়েতনামে প্রচারণায় আসা কয়েকজন আন্তর্জাতিক তারকার সিনেমার আয়েও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। অর্থাৎ স্থানীয় দর্শক তারকা দেখছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্প, নির্মাণমান ও স্থানীয় রুচির সঙ্গে সংযোগই বক্স অফিসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
* প্রেক্ষাগৃহ বাড়ছে, বাড়ছে প্রতিযোগিতাও
বক্স অফিসের উত্থানের সঙ্গে ভিয়েতনামে মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতিও বিস্তৃত হয়েছে। সিজিভি, লটে সিনেমা, গ্যালাক্সি সিনেমা ও বেটা সিনেমাসসহ একাধিক চেইন বড় শহরের পাশাপাশি নতুন বাজারেও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বেটা সিনেমাসের এরই ২০২৫ সালের হিসাবে দেশজুড়ে ২১টি শাখা ছিল; অন্যদিকে বিভিন্ন চেইনের সমন্বয়ে সারা দেশে শতশত পর্দা চালু রয়েছে।
তবে বাজারের আরেকটি বাস্তবতা হলো-প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার হার এখনো সম্ভাবনার তুলনায় কম। ২০২৫ সালে একজন ভিয়েতনামি নাগরিক গড়ে বছরে ০.৭ বার সিনেমা হলে গেছেন। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ০.৬। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু সিঙ্গাপুরের ১.৩ কিংবা মালয়েশিয়ার ১.০ বার বার্ষিক গড়ের তুলনায় ভিয়েতনামের সামনে এখনো বড় দর্শকভিত্তি তৈরির সুযোগ রয়েছে।
* ২০২৬ : প্রবৃদ্ধির পর নতুন প্রশ্ন
২০২৬ সাল অর্থাৎ চলতি বছরও দেশটিতে স্থানীয় সিনেমার দাপট অব্যাহত। বছরের প্রথমার্ধে ৩০টির বেশি ভিয়েতনামি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে-আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে আটটি সিনেমা ১০০ বিলিয়ন ডংয়ের বেশি আয় করেছে। স্থানীয় সিনেমার বাজার অংশও বছরের প্রথম দিকের হিসাবে ৭০ শতাংশের ওপরে উঠেছে।
তবে এখানেই নতুন প্রশ্ন-এ সাফল্য কি দীর্ঘমেয়াদি শিল্প কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এখনো আয়ের বড় অংশ কয়েকটি সফল সিনেমার হাতে কেন্দ্রীভূত। মাঝারি ও ছোট বাজেটের অনেক সিনেমার জন্য বক্স অফিস ঝুঁকি রয়ে গেছে। ২০২৬ সালে মাঝারি মানের একটি সিনেমার বাজেট প্রায় ১০০ থকে ১৩০ বিলিয়ন ডং পর্যন্ত উঠেছে-যা নির্মাতাদের উচ্চমানের কনটেন্টে বিনিয়োগের আত্মবিশ্বাস যেমন দেখায়, তেমনি ব্যর্থ হলে বড় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি করে।
সরকারও স্থানীয় সিনেমার জন্য কাঠামোগত সহায়তা দিয়েছে। বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থায় চলতি বছর থেকে প্রেক্ষাগৃহে ভিয়েতনামি সিনেমার প্রদর্শনীর ন্যূনতম অংশ ২০ শতাংশ রাখার বিধান কার্যকর হয়েছে; ২০২৩-২০২৫ সময়ে এ ন্যূনতম হার ছিল ১৫ শতাংশ।
* হাতছানি দিয়ে ডাকছে আন্তর্জাতিক বাজার
ভিয়েতনামের সিনেমা এখন শুধু নিজের দর্শক নিয়েই ভাবছে না। স্থানীয় শিল্পের উত্থানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তারকাদের প্রচারণা সফরও বাড়ছে। কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সিনেমা নির্মাতা ও তারকারা ভিয়েতনামের দর্শকদের কাছে সরাসরি পৌঁছাতে চাইছেন। কারণ ৭ কোটির বেশি টিকিট বিক্রির এ বাজার এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়ার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম টিকিট-বিক্রয় বাজার।
তবে ভিয়েতনামের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ শুধু আরও বেশি সিনেমা বানানো নয়। বরং সফল কয়েকটি সিনেমার বাইরে একটি শক্তিশালী, বৈচিত্র্যময় ও টেকসই ফিল্ম-ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে ২০২৬ সালের শেষ দিকে হ্যানয়ে প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে একটি প্রকৃত ফিল্ম মার্কেট আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে-যেখানে কপিরাইট বাণিজ্য, যৌথ প্রযোজনা ও বিনিয়োগ নিয়ে সরাসরি কাজ করার সুযোগ থাকবে।
ভিয়েতনামের সিনেমার গল্প তাই এখন আর শুধু ‘বক্স অফিস বেড়েছে’-এখানেই থেমে নেই। স্থানীয় গল্প, তরুণ দর্শক, শক্তিশালী মাল্টিপ্লেক্স অবকাঠামো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর প্রচারণা এবং ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ-সব মিলিয়ে দেশটির সিনেমা শিল্প দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানচিত্রে দ্রুত নিজের জায়গা শক্ত করছে। পরবর্তী অধ্যায় হবে এ বাণিজ্যিক সাফল্য কতটা স্থায়ী শিল্পশক্তিতে পরিণত হয়, তার পরীক্ষা।

