Logo
Logo
×

Advertisement

ভারত

জ্ঞানেশের পদত্যাগ কি ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র’ গঠন প্রচেষ্টার ইতি ঘটাবে?

Advertisement

Icon

অনিল সাহা

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম

জ্ঞানেশের পদত্যাগ কি ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র’ গঠন প্রচেষ্টার ইতি ঘটাবে?

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ও ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যেভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে সুরক্ষা দিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের নাগালের বাইরে রেখেছে, তাতে জাতিকে এই নজিরবিহীন সংকট মোকাবিলায় নতুন চিন্তা ও কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে। অসাংবিধানিক সুরক্ষাবলয় জ্ঞানেশ কুমারকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেললেও বিরোধী দলগুলোর জন্য লড়াইয়ের পথ কঠিন করে তুলেছে। গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ দেখা গেছে, তাকে এই নতুন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই বিবেচনা করতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, মোদি সরকারের বিরোধীদের সঙ্গে কেন দেখা করতে চাইছেন না প্রধান নির্বাচন কমিশনার? ভারতের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে এই প্রথম বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ক্ষেত্রে প্রটোকলের দোহাই দেওয়া হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী নেতাদের নির্ধারিত প্রতিনিধি পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং বৈঠকের জন্য একাধিক শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। বিরোধী নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে তার অনীহা এই ধারণাকেই জোরালো করে যে, কমিশন মোদি-শাহের নেতৃত্বাধীন কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে।

বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সভাপতিসহ প্রায় ৩০০ সংসদ সদস্য যখন রাস্তায় নেমেছিলেন, তখন নির্বাচন কমিশন জানাতে দ্বিধা করেনি যে তারা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। অথচ নির্বাচনি গণতন্ত্রের প্রধান অংশীজনদের সঙ্গে কমিশনের সম্পর্কের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পুলিশকে ব্যবহার করার কোনো বৈধতা থাকতে পারে না। কমিশনের এই মনোভাব দেখিয়ে দেয়, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম নয়। বরং হিন্দুত্ববাদী শক্তির কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নে কমিশন সহায়তা করছে।

মুসলিম, নারী ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ইঙ্গিত দিচ্ছে, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি প্রযুক্তিনির্ভর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। ‘টেকনোফ্যাসিজম’ বা প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ বলতে এমন ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে স্বৈরশাসকেরা আড়ালে থাকেন, আর প্রযুক্তি পুরো ব্যবস্থাটি পরিচালনা করে। এর ফলে কর্তৃত্ববাদী শাসকরা আড়ালে থেকে যান এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কম্পিউটারের হাতে।

এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি সামনে আসে—এমন একটি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে কীভাবে? শুধু জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেই কি এই শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব?


রাস্তায় ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভের উত্তাপ কি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে? শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে তাদের ওপর সামান্যই প্রভাব পড়তে দেখেছি আমরা। তাদের কাজের ধরন ও পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। বিক্ষোভকারীদের ওপর পেলেট গান ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে জবাব দিতে চাননি বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুরো সংসদ অধিবেশন এড়িয়ে গেছেন। বিচার বিভাগও কার্যকর সহায়তা দিতে পারেনি। মোদি চাইলে সহজেই জ্ঞানেশ কুমারকে সরিয়ে দিতে পারেন। তাতে একজন অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে বলি দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তাই বিক্ষোভকারীদের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হলো, পুরো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

কিছু রাজনৈতিক দল যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি করতে অনিচ্ছুক, তা স্পষ্ট। তবে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ও কংগ্রেসের অবস্থানে কোনো দ্বিধা নেই। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ইতোমধ্যে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলো ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, সব নির্বাচনই অবৈধ।

বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর বক্তব্যও বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। কারণ, তিনি শাসনব্যবস্থাটিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভাষ্য, একদল মানুষ ভারতীয় গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। এই গোষ্ঠীতে তিনি রেখেছেন করপোরেট জগতের প্রতিনিধি গৌতম আদানি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা হলেও প্রভাবশালী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারকে।

হিন্দুত্ববাদী শক্তির দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে জ্ঞানেশ কুমার নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো, যাতে মুসলমানদের কোনো কণ্ঠস্বর না থাকে। হিন্দু মহাসভা ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠন সার্বজনীন ভোটাধিকারের বিরোধিতা করে এসেছে। স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছিল তারা।

এই অবস্থানের শিকড় বিনায়ক দামোদর সাভারকরের মতাদর্শে নিহিত। সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার কর্মসূচি আরএসএস কখনও পরিত্যাগ করেনি। মোদি সরকার জ্ঞানেশ কুমারের সহায়তায় সেই কর্মসূচিই কৌশলে বাস্তবায়ন করছে।

সংবিধান মেনে চলার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী মোদির দ্ব্যর্থক আচরণ তার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা দেয়। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তকে কেবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নির্বাচনি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি ছিল নির্বাচনি প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের পছন্দমতো নির্বাচনি জনরায় তৈরির একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ।


প্রতিটি নির্বাচনের ফলকে মোদি জনগণের সমর্থনের স্বীকৃতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। অথচ বৈধতার জন্য তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপরও নির্ভর করেছেন। লোকসভায় ধর্মীয় তাৎপর্যপূর্ণ রাজদণ্ড ‘সেঙ্গল’ স্থাপনের ঘটনাটি আমরা দেখেছি। এটি সংবিধানের সুস্পষ্ট চেতনার লঙ্ঘন, অথচ তিনি অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে তা করেছেন। সংবিধানপ্রণেতারা কি এমন পরিস্থিতির কথা কল্পনা করেছিলেন? ভারতের প্রধানমন্ত্রী কীভাবে একটি প্রাচীন ধর্মীয় প্রতীককে নিজের ক্ষমতার উৎস হিসেবে তুলে ধরতে পারেন, যেখানে সেই প্রতীকের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই?

মোদি সরকারের কাছে নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ, তবে বৈধতার একমাত্র উৎস নয়। সম্প্রতি ‘আশীর্বাদের আলো’ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন মন্দিরে তার আরতি ও যজ্ঞে অংশ নেওয়ার ঘটনাগুলো বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে।

আমাদের বুঝতে হবে, এসআইআর ও নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় ঢুকিয়ে দেওয়া অন্যান্য বিকৃতির শিকড় ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় প্রোথিত। ঔপনিবেশিক শাসকরা কখনোই সার্বজনীন ভোটাধিকার সমর্থন করেনি। বরং তাদের প্রতি অনুগত সীমিতসংখ্যক মানুষকে ভোটাধিকার দেওয়া হয়েছিল। সম্পত্তির মালিকানা, কর দেওয়ার সামর্থ্য ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার অধিকার নির্ধারিত হতো।

১৯১৯ সালের আইনে নারীদের ভোটাধিকার থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। গোলটেবিল বৈঠকগুলোর পর ব্রিটিশরা নারীদের ভোটাধিকার সম্প্রসারণে সম্মত হলেও তা পুরুষ অভিভাবক, সাধারণত স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ করে। বিপরীতে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু থেকেই সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি জানিয়ে এসেছে। ১৯২৮ সালের নেহরু রিপোর্ট এবং ১৯৩১ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের করাচি প্রস্তাবে লিঙ্গ, সম্পদ কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বিশেষে সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকারের দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।

সাম্প্রদায়িক সংগঠন মুসলিম লিগ ও হিন্দু মহাসভা কখনোই প্রকৃত অর্থে সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার সমর্থন করেনি। মুসলিম লিগ কথিত হিন্দু আধিপত্যের আশঙ্কা থেকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সুরক্ষা ও প্রতিনিধিত্ব দাবি করেছিল। অন্যদিকে, হিন্দু মহাসভা তথাকথিত মুসলিম তোষণের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রচার চালিয়েছে। সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিটি উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে তারা।

সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তি ও পারস্পরিক সমন্বয়ের আদর্শ গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রকৃত গণতন্ত্রের কথা কীভাবে ভাবা সম্ভব?

এসআইআর ও ঔপনিবেশিক আমলের জনগণনা ও ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যে মিল রয়েছে। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রের তালিকা পর্যালোচনা করলেই এই সাদৃশ্য স্পষ্ট হয়। উভয় প্রক্রিয়াতেই সম্পত্তি ও শিক্ষাগত যোগ্যতাকে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনার প্রবণতা রয়েছে।


প্রাথমিক পর্যায়ে আধার কার্ড গ্রহণ না করার নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত সন্দেহ তৈরি করেছে। কারণ, দরিদ্র ও গৃহহীন মানুষের কাছে সহজলভ্য নথিগুলোর মধ্যে আধার কার্ড অন্যতম। এটি বাদ দিয়ে তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির পথ কঠিন করে দেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

মহানগর ও শহরাঞ্চলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার হার বেশি হওয়ার পেছনে অভিবাসী শ্রমিকদের আবাসিক ঠিকানা বা পরিচয়সংক্রান্ত নথি সংগ্রহে অক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই ও কলকাতা উত্তরে ভোটার বাদ পড়ার হার যথাক্রমে ৩৩, ৩৫, ৩৫ ও ২৬ শতাংশ।

এসআইআর কীভাবে মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু করছে, তা ব্যাখ্যা করার খুব বেশি প্রয়োজন নেই। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভোটার তালিকা থেকে পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। মুসলিম অধ্যুষিত নির্বাচনি এলাকাগুলোর বাসিন্দারাই মূল লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন।

অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য থেকেই মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা বোঝা যায়। ভোটার তালিকা ‘বিশুদ্ধ’ করার নামে কমিশন বারবার অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দেওয়ার কথা বলেছে। এটি মূলত বিজেপি ও আরএসএসের রাজনৈতিক বয়ানেরই পুনরাবৃত্তি। অথচ বিহার ও পশ্চিমবঙ্গসহ কোথাও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অনুপ্রবেশকারীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। তারপরও এই প্রচার ভোটার তালিকা থেকে মুসলমানদের বাদ দেওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে।

অনেকেই মনে করেন, বিজেপির নির্বাচনি হিসাবের অংশ হিসেবেই ভোটার তালিকা থেকে মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা বিজেপিকে ভোট দিতে না পারেন। কিন্তু এমন বিশ্লেষণ ফ্যাসিবাদী পরিকল্পনার ব্যাপকতা ও গভীরতাকে খাটো করে দেখার শামিল। পুরো প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য একটি জনগোষ্ঠীকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা। নিজেদের দেশেই মুসলমানদের অবাঞ্ছিত করে তোলার হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের এটি একটি অংশ।

এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন, মুসলমানদের ভোটাধিকার সংকুচিত করার একমাত্র উদ্যোগ এসআইআর নয়। এই শাসনব্যবস্থা আরও কিছু আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছে। জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়ে একটি মিশন চালু করা তার অন্যতম।

জনসংখ্যাগত পরিবর্তনবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন এবং এসআইআর কার্যক্রম একই সময়ে পরিচালিত হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট এই কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। পরে ২০২৬ সালের ২৬ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটি গঠন করেন। তখন দেশের অধিকাংশ রাজ্যে এসআইআর কার্যক্রম চলছিল।

এই কমিটির কাজের উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মুসলমানদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে যৌক্তিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করাই এর লক্ষ্য কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সমালোচকদের মতে, কমিটিটি অসাংবিধানিক, কারণ এটি নাগরিকদের পছন্দমতো স্থানে বসবাস ও বসতি স্থাপনের অধিকারের পরিপন্থি। বিশেষ করে মুসলমানদের অভিবাসনকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার ঝুঁকি তৈরি করছে এই উদ্যোগ।

ফরম-৭ ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার প্রচেষ্টার দিকে তাকালেও নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দলের যোগসাজশের অভিযোগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন অভিযোগও রয়েছে, বিজেপির কর্মীদের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, আর এর ফলে মুসলিম ভোটারদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করে কি প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার মোকাবিলা করা সম্ভব? জ্ঞানেশ কুমারকে সরিয়ে দিলেই কি মুসলমান, নারী ও সমাজের বঞ্চিত জনগোষ্ঠী—তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি এবং অনগ্রসর শ্রেণির মানুষদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া বন্ধ হবে? রাজনৈতিক দলগুলোর কি নিজেদের কৌশল নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে। কারণ, সংকটটি কেবল একজন নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকা বা না-থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, সংখ্যালঘুদের নাগরিক মর্যাদা এবং ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ। ফলে বিচ্ছিন্ন কোনো পদত্যাগের দাবির পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা রক্ষা এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিস্তৃত ও কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


(দ্য ওয়্যারে লেখা ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক অনিল সাহার কলামটি ইংরেজি থেকে অনূদিত)

Advertisement

Advertisement

ঘটনাপ্রবাহ: দিল্লির বিক্ষোভ


আরও পড়ুন

সম্পর্কিত খবর

বন্ড সই করিনি, ফের আন্দোলনে নামব: অভিজিৎ দীপকে

বন্ড সই করিনি, ফের আন্দোলনে নামব: অভিজিৎ দীপকে

বিক্ষোভকারীদের বেআইনিভাবে আটক করা যাবে না: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

বিক্ষোভকারীদের বেআইনিভাবে আটক করা যাবে না: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

দিল্লির সব ব্যারিকেড সরানোর নির্দেশ, স্বাভাবিক করতে হবে ইন্টারনেট

দিল্লির সব ব্যারিকেড সরানোর নির্দেশ, স্বাভাবিক করতে হবে ইন্টারনেট

দাদির শেষকৃত্যে যেতে চাননি অভিজিৎ দীপকে, দাবি পুলিশের

দাদির শেষকৃত্যে যেতে চাননি অভিজিৎ দীপকে, দাবি পুলিশের

বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি, চেন্নাইয়ে রোড শো করছেন মোদি

বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি, চেন্নাইয়ে রোড শো করছেন মোদি

‘মোদি ভারতের জন্য লজ্জার’ মুক্তি পেয়ে অভিজিতের বার্তা

‘মোদি ভারতের জন্য লজ্জার’ মুক্তি পেয়ে অভিজিতের বার্তা

আরও পড়ুন

জ্ঞানেশের পদত্যাগ কি ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র’ গঠন প্রচেষ্টার ইতি ঘটাবে?

জ্ঞানেশের পদত্যাগ কি ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র’ গঠন প্রচেষ্টার ইতি ঘটাবে?

বন্ড সই করিনি, ফের আন্দোলনে নামব: অভিজিৎ দীপকে

বন্ড সই করিনি, ফের আন্দোলনে নামব: অভিজিৎ দীপকে

বিক্ষোভকারীদের বেআইনিভাবে আটক করা যাবে না: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

বিক্ষোভকারীদের বেআইনিভাবে আটক করা যাবে না: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

কী শর্ত দিয়ে ছাড়া হলো ধ্রুব রাঠিকে, না মানলে হবে যে পরিণতি

কী শর্ত দিয়ে ছাড়া হলো ধ্রুব রাঠিকে, না মানলে হবে যে পরিণতি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম