পশ্চিমারা কেন নেতানিয়াহুর পতন চায়?
Advertisement
জোনাথন কুক
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গত সপ্তাহে ভাষণ দেওয়ার সময় দখলদার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে তিনি বিশ্বমঞ্চে একঘরে হয়ে পড়েছেন। এমনকি নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও তাকে এড়িয়ে চলছেন।
যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে বিশ্বের বৃহত্তম মঞ্চে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার প্রতিবাদে ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ ৭৭টি দেশের প্রতিনিধিদের অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়া মোটেও বিস্ময়কর ছিল না।
তবে অধিবেশন কক্ষের বাইরে যা ঘটেছিল, তা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ইসরাইলে ফেরত যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৮ ঘণ্টা ছিলেন নেতানিয়াহু। এটা যে নেতানিয়াহুর নিজের সিদ্ধান্ত ছিল না, তা সহজেই অনুমেয়।
এবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি নেতানিয়াহু। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও কোনো বৈঠক করতে পারেননি।
এ ছাড়া মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসে ভাষণ দেওয়ার কোনো আমন্ত্রণ পাননি তিনি। ফলে নেতানিয়াহুর ফিলিস্তিনবিরোধী বক্তব্য শুনে সেখানে আইনপ্রণেতাদের উদযাপনের পরিচিত দৃশ্যটি এবার দেখা যায়নি।
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরাইলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘কোনো (ইসরাইলি) প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন অথচ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি, এমন ঘটনা আগে ঘটেছে বলে মনে করতে পারছি না।’
আগে যুক্তরাষ্ট্রে গেলে নেতানিয়াহু যে অভ্যর্থনা পেতেন এবার সে জায়গা দখল করেছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, দিয়েছেন লাল গালিচা সংবর্ধনা।
উপেক্ষিত সতর্কবার্তা
নেতানিয়াহুর এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ইসরাইলি কর্মকর্তা ও পশ্চিমা নেতারা তাদের নিজস্ব ও পরস্পরবিরোধী উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কাজে লাগিয়েছিল।
এক মাস পরেই ইসরাইলের জাতীয় নির্বাচন। সেখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে যাচ্ছেন তিনি। কারণ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা প্রতিরোধে তার ব্যর্থতা প্রথমবারের মতো কঠোর পর্যালোচনার মুখে পড়েছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা থেকে বড় ধরনের কিছু একটা হতে যাচ্ছে, এমন আভাস হামাসের অভিযানের আগেই নেতানিয়াহুকে দিয়েছিলেন মিসর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা। কিন্তু নেতানিয়াহু কোনো পদক্ষেপ নেননি।
সর্বোচ্চ সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে ইসরাইলের ‘প্রাইম টাইম’ অনুযায়ী জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার সময় নির্ধারণ করেছিলেন নেতানিয়াহু। বিশ্বের অন্য নেতাদের ‘কাপুরুষ’ ও ‘ভণ্ড’ আখ্যা দেওয়ার সুযোগ কাজে লাগান তিনি।
ইসরাইলি বিশ্লেষক জোনাথন ওফিরের মতে, নেতানিয়াহু জাতিসংঘের মঞ্চ ব্যবহার করে হিব্রু ভাষায় বাইবেলের একটি বাক্যাংশ কৌশলে জুড়ে দিয়েছিলেন। নিজ দেশের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে এটি ছিল এক ধরনের সংকেত, যার মাধ্যমে ইসরাইলকে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত গণহত্যা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
নেতানিয়াহু নিজ দেশের ভোটারদের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি এখনও একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কথিত ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ ও ‘ইসরাইলবিরোধী’ মনোভাবাপন্ন বিশ্বে একমাত্র তিনিই ইসরাইলকে নিরাপদে রাখতে পারবেন।
অন্যদিকে পশ্চিমা নেতারা ঠিক উল্টোটা দেখাতে চান। পশ্চিমা নেতারা ইসরাইলিদের বোঝাতে চান, তাদের নেতা ফুরিয়ে গেছেন এবং সীমা অতিক্রম করেছেন। এর মাধ্যমে তারা নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে চান।
এখন নেতানিয়াহুকে বিদায় জানানোর সময় এসেছে। তবে বিষয়টি হয়তো খুব একটা সহজ হবে না। কারণ নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার এক অনন্য নজির গড়েছেন। প্রায় দুই দশক ধরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি, যা দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড বেন গুরিয়নের মেয়াদের চেয়েও বেশি। এই দীর্ঘ সময়ে নেতানিয়াহু ইসরাইলি সমাজের একটি বড় অংশকে চরম জাতীয়তাবাদী ও গণহত্যায় উৎসাহী করে তুলেছেন।
রাজনৈতিক বোঝা
গাজায় চলমান গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ; পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ ও জাতিগত নির্মূল অভিযান; দক্ষিণ লেবাননে বোমাবর্ষণ ও জাতিগত নির্মূল অভিযান; ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখা—ইসরাইলের এসব কর্মকাণ্ডের কোনো নৈতিক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে পশ্চিমা দেশগুলোতে নেতানিয়াহুর প্রতি বিরূপ মনোভাব গড়ে ওঠেনি।
ইউরোপীয় অনুগত রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র এসব অপরাধে ইসরাইলের একনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। এসব অপকর্ম পরিচালনায় ইসরাইলকে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও কূটনৈতিক সমর্থন জুগিয়েছে।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নেতানিয়াহু রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন, এমনকি এটা ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও। জনমত জরিপে দ্রুত জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া ট্রাম্প একজন ‘বলির পাঁঠা’ খুঁজছেন। আর এ জন্য ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুই একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি।
এই বিরোধের পেছনে ব্যক্তিগত কারণও রয়েছে। সাম্প্রতিক বেশ কিছু প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ট্রাম্পকে তার জেনারেলদের পরামর্শ উপেক্ষা করতে বাধ্য করেছেন নেতানিয়াহু। এর মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে উসকানিবিহীন ও অবৈধ যুদ্ধ শুরুর জন্য ট্রাম্পকে প্ররোচিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিলেন তিনি।
নেতানিয়াহু নিশ্চিত জয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্পকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে, তিনি ইতিহাসের পাতায় এমন একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের স্থান করে নিতে পারবেন, যিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন’। এ ছাড়া ইরানকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিতে পারলে ওই অঞ্চলের তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতো।
বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসব কিছু ঘটার কথা ছিল।
ইরানের পরাজয় ও ভেনেজুয়েলার বশ্যতা স্বীকারের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বা জ্বালানি সংগ্রহের জন্য অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ত। বেইজিংয়ের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়েই কেবল তেলের সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প তাদের বশ মানাতে পারতেন।
কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটিই ঘটেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে হরমুজ প্রণালীতে তেহরানের ক্ষমতার পরিধি এবং বাব আল-মান্দেবে তাদের মিত্র হুতির ক্ষমতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। সম্মিলিতভাবে তারা বিশ্ব অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি করতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভোটব্যাংক ধসে পড়ার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে ডেমোক্র্যাটদের কাছে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রবল আশঙ্কা তৈরি হবে এবং ট্রাম্প কার্যত ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্টে রূপান্তরিত হবেন অর্থাৎ মেয়াদের শেষ দিকে তার প্রভাব সীমিত হয়ে পড়বে।
এরই মধ্যে এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের অনুগত রাষ্ট্রগুলোকে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, তেহরান বা ইয়েমেন থেকে আসা যেকোনো পালটা আঘাতের মুখে তারা অত্যন্ত অরক্ষিত। ট্রাম্প যখনই ইরানের ওপর নতুন করে কোনো বেপরোয়া হামলার নির্দেশ দেন, তখনই তাদের এই কঠোর বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন যে তার উপসাগরীয় মিত্রদের সুরক্ষা দিতে অক্ষম, তা প্রমাণিত হয়েছে।
জবাবদিহির মুখোমুখি
ইরানের বিরুদ্ধে বিপর্যয়কর যুদ্ধ উসকে দেওয়ায় কেবল নেতানিয়াহু জবাবদিহির মুখে পড়েছেন, বিষয়টি এমন নয়।
গত তিন বছর ধরে পশ্চিমা রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম মহল সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো সত্ত্বেও, ইসরাইলের হাতে গাজা ধ্বংস এবং হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশুর হত্যা ও পঙ্গু হয়ে যাওয়ার বাস্তবতা গোপন করা বা তার পক্ষে সাফাই গাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমনকি বিশ্ব রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই—জনগণের এমন অংশের মধ্যেও সত্যটি ধীরে ধীরে গেঁথে যাচ্ছে; আর এতে সহায়তা করছে মূলধারার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চলা লড়াই, যেখানে জনমত এখন চূড়ান্তভাবে ইসরাইলের বিপক্ষে চলে গেছে।
ইসরাইলি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের তৈরি গাজা বিষয়ক নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘নাজা’ গত মাসে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে রেকর্ড ২৫ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর স্বীকৃতি পেয়েছে। এতে পরিচয় গোপন রাখা ইসরাইলি সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন যে, কীভাবে তারা ওই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে গণহত্যা করেছিল। আগামী নভেম্বরে এটি বিনামূল্যে অনলাইনে দেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া সম্প্রতি উয়েফা নেশনস লিগে ইসরাইলের বিপক্ষে খেলতে বাধ্য হওয়া আয়ারল্যান্ড দল তাদের মনোভাব গোপন রাখেনি। গাজায় ইসরাইলি বর্বরতার শিকার মানুষদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা কালো আর্মব্যান্ড পরিধান করে এবং প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়। আইরিশ অধিনায়ক ম্যাচ থেকে পাওয়া নিজের পারিশ্রমিক গাজাবাসীকে দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিখ্যাত সংগীতশিল্পী এড শিরান অপ্রত্যাশিতভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছেন; কারণ গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে মন্তব্য করায় তিনি তার সহশিল্পী ম্যাকলমোরের পাশে দাঁড়াননি।
স্বাভাবিকভাবেই, ইসরাইলপন্থি স্টেডিয়াম মালিকরা যখন সফর বা কনসার্ট বাতিলের হুমকি দেন, তখন শিরান নতি স্বীকার করেন এবং ম্যাকলমোরকে বাদ দেন। কিন্তু এরপর তিনি ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়েছেন, যা তাকে স্পষ্টতই হতবাক করেছে।
এ ছাড়া ব্রিটেনের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকরা বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও ডেভিড ল্যামি গাজা ইস্যুতে তাদের আচরণের জন্য প্রথমবারের মতো মূলধারার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
ঘৃণার জোয়ার
গাজায় সংঘটিত গণহত্যার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঘৃণার এই ক্রমবর্ধমান জোয়ার যে আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না, তা অবশেষে পশ্চিমা দেশগুলো বুঝতে পারছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকরা যেখানে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ককে সব সময়ই ‘অবিচ্ছেদ্য’ বলে বর্ণনা করে থাকেন, সেখানে পিউয়ের জুলাই মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ উত্তরদাতা নেতানিয়াহু সরকারের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
এদিকে গত মাসের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ আমেরিকান ইহুদি চান আসন্ন নির্বাচনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হোক।
ইসরাইলের হারেৎজ পত্রিকা বলেছে, ‘আমেরিকানদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি যে ধারাবাহিক ও উদ্বেগজনক হারে সমর্থন কমছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প ভালোভাবেই অবগত।’
ঠিক এ কারণেই তিনি এবং অন্য পশ্চিমা রাজনীতিকরা আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। গাজায় ইসরাইলি নৃশংসতার জন্য কেবল নেতানিয়াহুকে দায়ী করলেই তারা দায় এড়াতে পারবেন না; কারণ প্রতিটি পদক্ষেপে তারা স্পষ্টভাবেই তার সহযোগী ছিলেন।
এর পরিবর্তে পশ্চিমা নেতারা মনোযোগ পশ্চিম তীরের দিকে সরিয়ে নিতে চাইছেন। কারণ সেখানে তাদের ভূমিকা আড়াল করা সহজ এবং নেতানিয়াহুর আইন লঙ্ঘনের বিষয়টিও অত্যন্ত স্পষ্ট।
গাজায় ইসরাইলি নৃশংসতার জন্য কেবল নেতানিয়াহুকে দায়ী করলেই পশ্চিমা নেতারা দায় এড়াতে পারেন না; কারণ প্রতিটি পদক্ষেপে তারা স্পষ্টভাবেই তার সহযোগী ছিলেন।
জাতিগত নির্মূল
গত মাসে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডাসহ আরও ১১টি পশ্চিমা রাষ্ট্র পশ্চিম তীরের বসতিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ইচ্ছা প্রকাশ করে। কারণ তারা প্রথমবারের মতো ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে এমন ইঙ্গিত পেয়েছিল যে এমন পদক্ষেপ নিলে কোনো গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে হবে না।
অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নেতৃত্বাধীন ব্রিটেনের নতুন সরকার পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে ‘জাতিগত নির্মূল’ হিসেবে অভিহিত করার সাহসও দেখিয়েছে।
ইসরাইলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থি ও পক্ষপাতদুষ্ট রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির অধীনস্থ কর্মকর্তারা ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার জবাবে একটি কঠোর নিন্দাসূচক খসড়া প্রস্তুত করেছিলেন বলে জানা গেছে।
এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে এমন অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগের দিনগুলোতে গাজা থেকে একটি নজিরবিহীন আক্রমণ আসতে পারে—মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমন একাধিক সতর্কবার্তা নেতানিয়াহু উপেক্ষা করেছিলেন।
দৃষ্টি ঘোরানোর নাটক
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে বার্নহাম পশ্চিমা সরকারগুলোর সামনে থাকা এক উভয় সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা অত্যন্ত কম। আমরা যদি কেবল দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলে যাই কিন্তু কাজের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হই, তবে সেই আস্থা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। আর এর ফলে সৃষ্ট জনবিচ্ছিন্নতার সুযোগ নেবে আমাদের শত্রুরা।’
বার্নহাম সম্ভবত একটি বাস্তব বিষয় খেয়াল করছেন না—আস্থার এই ঘাটতির অন্যতম কারণ হলো একের পর এক ব্রিটিশ সরকার কেবল গাজায় সংঘটিত গণহত্যায় সায় দিয়েছে তা নয়, বরং যারা এই গণহত্যার সমালোচনা করেছে তাদেরও সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে গ্রেফতার করেছে।
তারা নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চান কোনো প্রকৃত পরিবর্তনের লক্ষ্যে নয়, বরং কেবল এ কারণেই যাতে গাজা গণহত্যার আগের সেই স্বাভাবিক বা প্রথাগত অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায়।
এর আগের দিনই সম্মেলনের ভেন্যুর বাইরে ডজনখানেক বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের অপরাধ ছিল তারা নীরবে এমন সব প্ল্যাকার্ড ধরে রেখেছিলেন যাতে লেখা ছিল, ‘আমি গণহত্যাবিরোধী। আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি।’
পশ্চিমা নেতারা এখানে আসলে দৃষ্টি ঘোরানোর এক চতুর ও কপট নাটকে লিপ্ত।
‘আপনারা সঠিক ছিলেন’ বা ‘আমরা আপনাদের বেদনা অনুভব করছি’, এমন ঘোষণা, নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিশ্রুতি এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জরুরি আহ্বান—এসবই আসলে কেবল লোক দেখানো নৈতিকতার ভান ছাড়া আর কিছুই নয়। ইসরাইলের নৃশংসতার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে পশ্চিমা সরকারগুলোর দায়বদ্ধতা বা অংশীদারত্ব থেকে সরিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণভাবে নেতানিয়াহুর দিকে ধাবিত করাই এসবের মূল উদ্দেশ্য।
নতুন বয়ানে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, পশ্চিম তীরের বসতিগুলোতে অবস্থানরত বন্দুকধারী ও ধর্মীয় উগ্রবাদীরা কেবল নেতানিয়াহুরই সৃষ্টি। তারা গত অর্ধশতাব্দী ধরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ইসরাইলি সরকারের ছত্রছায়ায় ক্রমশ সহিংস ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
স্বাভাবিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা
নিজেদের দায়মুক্ত করার প্রচেষ্টায় পশ্চিমা নেতারা তাদের জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য একটি নতুন মিথ্যা বয়ান তৈরি করছেন। এই বয়ান অনুযায়ী, তথাকথিত বসতি স্থাপনকারী সন্ত্রাসীরা আসলে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত মিলিশিয়া বা সশস্ত্র বাহিনী—যাদের অস্তিত্ব বা পতন নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী পদের ওপরই নির্ভরশীল।
এই নতুন বয়ানের অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, নেতানিয়াহুকে যদি ক্ষমতা থেকে সরানো যায়, তবে আরও সহানুভূতিশীল নেতৃত্বের উত্থান ঘটবে; আর পশ্চিমা শক্তিগুলো সেই নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করতে পারবে।
এসব সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবাস্তব কথা। ইসরাইলি জনগণের মতোই ইসরাইলের সংকীর্ণ জায়নবাদী ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনৈতিক বলয়ের নেতারাও সেই গণহত্যামূলক যুক্তি বা মানসিকতা ধারণ করেন, যা গত তিন বছর ধরে গাজাকে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়েছে।
এর বিরুদ্ধে কেউ দ্বিমত পোষণ করেননি। বরং সবাই গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার কাজে লিপ্ত ছিল।
ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাদের শান্তি স্থাপনের কোনো আশাই নেই। কারণ ইসরাইলি নেতারা নিজেদের ‘ফিলিস্তিনি নাগরিকদের’ আগামী মাসের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে রাজি নন।
পশ্চিম তীর নিয়ে ইসরাইলিদের মধ্যে মূলত দুটি পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে; ফিলিস্তিনিদের খাঁচায় বন্দি করে রাখা অথবা তাদের পুরোপুরি নির্মূল করা।
ইসরাইলের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ‘কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি’ ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী চারটি দলকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিষিদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
আগামী মাসের নির্বাচনে নেতানিয়াহু বা অন্য যেই জিতুক না কেন দেশটি সেই একই জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদী পথে চলতে থাকবে, যে পথে ইসরাইল দশকের পর দশক ধরে এগিয়ে চলেছে। ট্রাম্প, বার্নহ্যাম এবং অন্য পশ্চিমা নেতারা বিষয়টি ভালোভাবেই বোঝেন।
তারা নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দিতে চান কোনো প্রকৃত পরিবর্তনের লক্ষ্যে নয়, বরং গাজায় গণহত্যার আগের সেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য, যেখানে ফিলিস্তিনি জাতিকে নির্মূল করার প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে ও ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হতো।
তারা গাজার গণহত্যাকে একজন ব্যক্তির ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বা এমন এক মর্মান্তিক বিপর্যয় হিসেবে তুলে ধরতে চান—যা আর পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে ওই ব্যক্তিকে সরিয়ে দিলে যার প্রভাব কিছুটা কমানো বা প্রশমিত করা যেতে পারে। তারা চায় আমরা যেন দৃঢ়ভাবে সামনের দিকে তাকাই—আবাসন খাতের চুক্তি এবং সুদূর ভবিষ্যতের ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’র দিকে; পেছনের দিকে নয় অর্থাৎ, ২০ লাখের বেশি মানুষের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সক্রিয় ভূমিকার দিকে। আর এই ধ্বংসযজ্ঞে ব্যবহৃত হয়েছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা এমন সব বোমা, যার বিধ্বংসী ক্ষমতা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়েও আট গুণ বেশি ছিল।
ইসরাইলের নির্বাচনের ফলাফল জানার আগেই ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলের অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূর্ণ করার লক্ষ্যে বিপুল সংখ্যক ‘মেগা-বোমা’ পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে।
উল্লেখ্য, যে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নেতানিয়াহুকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল, সেই প্রশাসনই আবার ফিলিস্তিনিদের সম্ভাব্য নেতা মাহমুদ আব্বাসকে সেখানে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দিয়েছিল।
হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা
বর্তমান লড়াইটি কোনো গণহত্যাকারী ইসরাইলি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, কিংবা কোনো কাল্পনিক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যও নয়—নিরন্তর নিপীড়নের শিকার ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্ন তো অনেক দূরের কথা।
এর মূল লক্ষ্য হলো পরিস্থিতির এমন এক পরিবর্তন ঘটানো, যার মাধ্যমে পশ্চিমা শক্তিগুলো ইসরাইলের পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে পারে।
নেতানিয়াহু সরকারের উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ কথাবার্তা পশ্চিমা নেতাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এই সপ্তাহেই ইসরাইলি নেতা স্মোট্রিচ আহ্বান জানিয়েছেন, গাজায় ইসরাইল যে গণহত্যামূলক নীতি প্রয়োগ করেছে, তা যেন পশ্চিম তীরেও চালানো হয়। তিনি ইসরাইলি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘গাজায় আমরা যা করেছি, এখানেও আমাদের তাই করা উচিত।’
পশ্চিমা নেতারা আশঙ্কা করছেন, এমন পদক্ষেপ তাদের তলিয়ে যেতে থাকা বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর কী প্রভাব ফেলবে। তবে ইসরাইলের অভ্যন্তরে তাদের এমন মিত্র রয়েছে, যাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্মোট্রিচের মতো নয়। অন্তত এই মুহূর্তে তারা পশ্চিম তীরকে গাজার মতো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করার পক্ষে নয়। বরং তারা এমন এক পরিস্থিতির দিকেই এগিয়ে যেতে চায়, যেখানে পশ্চিম তীরের অবশিষ্ট ছোট ছোট ফিলিস্তিনি এলাকাগুলোকে ধীরে ধীরে এক একটি ক্ষুদ্র বন্দিশিবিরে পরিণত করা হবে; ধ্বংসযঞ্জের আগে গাজা যেমনটা ছিল।
পশ্চিম তীর নিয়ে ইসরাইলিদের মধ্যে মূলত এই দুটি বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই কাজ করছে—ফিলিস্তিনিদের একের পর এক খাঁচায় বন্দি করে রাখা অথবা তাদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলা।
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং বহুল আলোচিত ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ নীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য পশ্চিমা বিশ্ব যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তার মূল বিষয়বস্তু আসলে এটাই—এর বাইরে আর কিছুই নয়।
(লেখাটি মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন সিনিয়র সাব-এডিটর শেখ আব্দুল্লাহ আল নোমান)

-6abf6e538d2d3.jpg)
-6abf806ce51bd.jpg)



-6abe7eb0a5744.jpg)
