শান্তিতে নোবেলজয়ী কে এই নাভি পিল্লাই
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম
নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন তিনি। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ নজির প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নারী অধিকার রক্ষায়ও ভূমিকা রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনামলে ডারবানে এক তামিল পরিবারে জন্ম নেন নাভি পিল্লাই। শৈশবেই বর্ণবৈষম্যের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। পরবর্তী সময়ে আইনজীবী হিসেবে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকর্মীদের পক্ষে দাঁড়ান। তার কর্মজীবন পরে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসংঘে।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তার সর্বজনীন আইনি নীতির প্রতি অঙ্গীকার ও দৃঢ় নৈতিক অবস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় তার উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে রয়েছে গণহত্যার ঘটনায় ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা। তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাভি পিল্লাই।
কে এই নাভি পিল্লাই
নাভানেথেম পিল্লাইয়ের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন নাটাল প্রদেশের ডারবানের ক্লেয়ারউড এলাকায়। তার বাবা ছিলেন বাসচালক। বর্ণবাদী শাসনামলে আট ভাইবোনের পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। ওই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের কারণে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়ত।
নাভি পিল্লাই নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৫ সালে আইনের ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৭ সালে নাটালে নিজস্ব আইনচর্চা শুরু করা প্রথম নারী হন তিনি। এ সময় বর্ণবাদী সরকারের হাতে আটক রাজনৈতিক কর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াই চালান।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন পিল্লাই। ১৯৮২ সালে আইনে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮৮ সালে আইনবিষয়ক উচ্চতর গবেষণার ডিগ্রি অর্জন করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী কর্মীদের পক্ষে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তার কর্মজীবন পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন ও বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রুয়ান্ডার গণহত্যা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
১৯৯৫ সালে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব নেন নাভি পিল্লাই। ১৯৯৯ সালে তিনি এই ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হন।
রুয়ান্ডার গণহত্যার ঘটনায় জঁ-পল আকায়েসুর বিচার চলাকালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এই বিচারকে একটি উল্লেখযোগ্য নজির হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। এরপর ২০০৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
নারী অধিকার ও সাংবিধানিক সমতায় অবদান
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন নাভি পিল্লাই। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইকুয়ালিটি নাউ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন। সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার ও লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ-পরবর্তী সংবিধানে সমতার অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগেও অবদান রেখেছেন তিনি। তার কর্মজীবনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন শক্তিশালী করা।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছানো নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছে। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার সেই অবদানেরই স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
