Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

ধ্রুব রাঠী: ইউটিউব থেকে যেভাবে নেমে এলেন রাজপথে

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

ধ্রুব রাঠী: ইউটিউব থেকে যেভাবে নেমে এলেন রাজপথে

ধ্রুব রাঠী। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

একসময় নরেন্দ্র মোদির উত্থানে আশাবাদী ছিলেন ধ্রুব রাঠী। দুর্নীতি ও কালো টাকার বিরুদ্ধে মোদির অবস্থান তাকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই অবস্থান পুরোপুরি বদলে যায়। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি ও মোদি সরকারের অন্যতম পরিচিত ডিজিটাল সমালোচকে পরিণত হন তিনি।

ইউটিউবের মাধ্যমে রাজনীতি, সরকারি নীতি, সামাজিক সমস্যা ও সমসাময়িক ঘটনাকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে বিপুল দর্শক তৈরি করেছেন রাঠী। তার ভিডিও যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগেও পড়েছেন তিনি। ২০২৬ সালের অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহ তাকে আবারও ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে- এবার ইউটিউবের পর্দায় নয়, সরাসরি রাজপথে।

গত ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেন রাঠী। সেখানে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। এর দুই দিন পর দিল্লির যন্তর মন্তরে একই সংগঠনের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আগেই গুরুগ্রামের বাসা থেকে তাকে আটক করে দিল্লি পুলিশ বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।


হরিয়ানা থেকে জার্মানি

দিন সানডে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ধ্রুব রাঠীর জন্ম ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর ভারতের হরিয়ানায়। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর তার বয়স ৩২ বছর পূর্ণ হয়। জার্মানিতে থাকার সময় জুলি এলবিআর রাঠীর সঙ্গে পরিচয় হয় ধ্রুব রাঠীর। ২০২১ সালে তাদের বিয়ে হয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় তাদের বিয়ের আয়োজন হয়েছিল। ২০২৪ সালে তাদের একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়।

রাঠী তার পারিবারিক জীবন সাধারণত ব্যক্তিগত রাখেন। তার বাবা-মায়ের পরিচয় ও পেশা নিয়ে অনলাইনে নানা তথ্য থাকলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে সেগুলোর সবকটি নিশ্চিত নয়।

তিনি ভারত থেকে কলেজ পাস করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি জার্মানিতে যান এবং কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। পরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশল বিষয়ে মাস্টার্স করেন। 

তবে প্রকৌশলী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েননি তিনি। ছোটবেলা থেকেই ভিডিও তৈরির প্রতি আগ্রহ ছিল তার। ২০০৩ সালে সাধারণ ওয়েবক্যাম দিয়ে ক্লেমেশন ভিডিও তৈরির কথাও তিনি বলেছেন। পরে জার্মানিতে গিয়ে আইফোনে ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও বানিয়ে ইউটিউব যাত্রা শুরু করেন। শুরুর দিকে তার কনটেন্ট ছিল ভ্রমণ, পরিবেশ ও তথ্যভিত্তিক বিষয় নিয়ে। পরে ধীরে ধীরে রাজনীতি ও সামাজিক ইস্যু তার ভিডিওর প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।

মোদির সমর্থক থেকে সমালোচক

২০১১ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সময় ভারতের রাজনীতির প্রতি রাঠীর আগ্রহ বাড়ে। ২০১৪ সালে মোদি যখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে, দুর্নীতি ও কালো টাকার বিরুদ্ধে তার বক্তব্য রাঠীকে আকৃষ্ট করেছিল। তখন তিনি মোদির সমর্থক ছিলেন।

কিন্তু ২০১৫ সালে দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকারের দুর্নীতিবিরোধী হেল্পলাইন নিয়ে কেন্দ্র ও দিল্লি সরকারের বিরোধ তাকে হতাশ করে বলে রাঠী জানিয়েছেন। তার ভাষায়, তখন তার মনে হয় মোদি দুর্নীতি দূর করার বিষয়ে যতটা আশাবাদ তৈরি করেছিলেন, বাস্তবে বিষয়টি ততটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।

এরপর মূলধারার বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের বিজেপি ও মোদির প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ নিয়েও তার অসন্তোষ বাড়ে।

২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি ইউটিউবে প্রথম রাজনৈতিক ভাষ্য প্রকাশ করেন। বিজেপির আইটি সেল কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, ভিডিও, ভুয়া উদ্ধৃতি ও বিভিন্ন প্রচারের মাধ্যমে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে- সেই বিষয় ছিল ভিডিওটির মূল আলোচ্য। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।


ইউটিউবে বিপুল প্রভাব

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছরে রাঠী তার প্রধান ইউটিউব চ্যানেলে শত শত ভিডিও প্রকাশ করেছেন। রাজনীতি ছাড়াও ইতিহাস, পরিবেশ, আন্তর্জাতিক ঘটনা ও সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে তিনি ভিডিও করেন।

তার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় সহজ ভাষায় জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাকে। উত্তর ভারতের বড় অংশে প্রচলিত সাধারণ হিন্দি ভাষায় তিনি কথা বলেন। একই সঙ্গে গ্রাফিকস, অ্যানিমেশন, তথ্য ও উদাহরণ ব্যবহার করেন।

তার রাজনৈতিক চ্যানেলের পাশাপাশি ‘ধ্রুব রাঠী ভ্লগস’ নামে আলাদা চ্যানেল রয়েছে, যেখানে স্ত্রী জুলির সঙ্গে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের ভিডিও প্রকাশ করেন।

২০২৩ সালে টাইম ম্যাগাজিনের ‘নেক্সট জেনারেশন লিডার্স’ তালিকায় তার নাম আসে। প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইউটিউবে তার অনুসারীর সংখ্যা ৩ কোটির বেশি।

সিএএ থেকে মোদি সরকারের সমালোচনা

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ নিয়ে ২০১৯ সালের বিতর্কের সময় রাঠী বড় ডিজিটাল কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত হন। সিএএ ও এনআরসি নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যামূলক ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি।

তবে তাকে সিএএবিরোধী আন্দোলনের নেতা বলা যায় না। তার ভূমিকা মূলত অনলাইন কনটেন্ট ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

মোদি সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে রাঠী একাধিকবার দাবি করেছেন, ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম ও বিরোধীদের ওপর চাপ বাড়ছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে একটি ভিডিওতে তিনি প্রশ্ন তোলেন- ভারত কি স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে?

তার এই বক্তব্য নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। সমর্থকেরা তাকে স্বাধীন রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে দেখেন। সমালোচকেরা বলেন, তিনি বাছাই করা তথ্য ব্যবহার করে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেন।

বিতর্কও কম নয়

রাঠীর রাজনৈতিক কনটেন্ট নিয়ে বহুবার বিতর্ক হয়েছে। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। আম আদমি পার্টির নেত্রী স্বাতী মালিওয়ালও একসময় অভিযোগ করেছিলেন, রাঠীর কনটেন্ট তার বিরুদ্ধে অনলাইন প্রচারণাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। রাঠী সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এ ছাড়া তার কিছু ভিডিও নিয়ে কপিরাইট ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগও উঠেছে। ২০২৬ সালে হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। দিল্লি পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে বলে আদালতকে জানানো হয়েছিল। তবে অভিযোগ বা তদন্তকে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য বলা যায় না।

বেঙ্গালুরুতে সিজেপির বিক্ষোভ

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে সিজেপির কর্মসূচিতে যোগ দেন রাঠী। তার সঙ্গে ছিলেন অভিনেতা-অ্যাক্টিভিস্ট প্রকাশ রাজ ও সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে।

এসআইআর নিয়ে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারীরা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ করেন এবং পুরো প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগও দাবি করা হয়।

রাঠী সেখানে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য স্বচ্ছতা ও শূন্য জবাবদিহি’র অভিযোগ করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে সরকার পরিবর্তনের জন্য আসিনি।’

দিল্লির কর্মসূচির আগেই আটক

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বেঙ্গালুরুর পর ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন রাঠী। ৯ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে তিনি জানান, তিনি ওই কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।

এর পরদিন সকালে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর বাসা থেকে তাকে আটক করা হয় বলে দিল্লি পুলিশ। প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য তার বাসায় গিয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। 

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগেই আটক হলেন ধ্রুব রাঠি

বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগেই আটক হলেন ধ্রুব রাঠি

আরও পড়ুন

পুলিশের হেফাজতে দীপকে, বাড়িতে মারা গেলেন দাদি

পুলিশের হেফাজতে দীপকে, বাড়িতে মারা গেলেন দাদি

পাকিস্তানে নিজ বাড়ি থেকে মন্ত্রীকে অপহরণ

পাকিস্তানে নিজ বাড়ি থেকে মন্ত্রীকে অপহরণ

৬ শব্দের পোস্ট থেকে ভারতের জনপ্রিয় মুখ, কে এই অভিজিৎ দীপকে

৬ শব্দের পোস্ট থেকে ভারতের জনপ্রিয় মুখ, কে এই অভিজিৎ দীপকে

দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড়, ‘তেলাপোকা’ ঠেকাতে মরিয়া বিজেপি

দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড়, ‘তেলাপোকা’ ঠেকাতে মরিয়া বিজেপি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম