Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

ইসরাইলে নেতানিয়াহুর দাপট কমল, ক্ষমতার চাবি ফিলিস্তিনিদের হাতে

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১১ এএম

ইসরাইলে নেতানিয়াহুর দাপট কমল, ক্ষমতার চাবি ফিলিস্তিনিদের হাতে

সংগৃহীত

Advertisement

ইসরাইলের নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট আসন হারিয়েছে। তবে তার রাজনৈতিক প্রভাব শেষ হয়ে যায়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বিরোধীদের জন্য সরকার গঠন সহজ হবে না।

নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারের মূল বার্তা ছিল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং জরুরি অবস্থা বজায় রাখা। তিনি ভোটারদের বলেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইল চালানো হামলার জন্য তিনি দায়ী নন। তার দাবি, ওই হামলার দায় সামরিক নেতৃত্বের।

নেতানিয়াহু আরও বলেছেন, সামরিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার পর তিনি পরিস্থিতি সামলেছেন। তার নেতৃত্বে ইসরায়েল আগের চেয়ে নিরাপদ হয়েছে।

তবে ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা ভোট হারিয়েছেন। তাদের জোটের আসন আট থেকে দশটি কমতে পারে। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হয়েছে।

বিরোধীরাও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে
নেতানিয়াহুর জোট দুর্বল হলেও বিরোধীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারেনি। তথাকথিত ‘পরিবর্তনপন্থী’ শিবিরও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

এই নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফিলিস্তিনি দলগুলোর অগ্রগতি। বিশেষ করে জয়েন্ট লিস্ট জোট এবং মানসুর আব্বাসের রাআম পার্টির ফল নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে।

নির্বাচনী পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই দুই পক্ষ একসঙ্গে ইসরাইলের ১২০ আসনের সংসদে ১৯টি পর্যন্ত আসন পেতে পারে।

ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। কিন্তু দেশটির সরকার ও রাজনীতিতে তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছেন। এবারের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ ও আসন বৃদ্ধি সেই পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ফিলিস্তিনি ভোট ছাড়া সরকার গঠন কঠিন
মানসুর আব্বাস জয়েন্ট লিস্ট থেকে আলাদা হয়ে ইহুদি ইসরায়েলি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার পথ বেছে নিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের জন্য বাস্তব সুবিধা আদায় করা। আগের নির্বাচনগুলোতে এই কৌশলে তিনি কিছু সাফল্যও পেয়েছেন।

তবে এবারের নির্বাচনে জয়েন্ট লিস্ট রাআমের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ভোট পেয়েছে বলে নির্বাচনী বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরাইলের বিরোধী দলগুলো জাতীয়তাবাদী অবস্থান, অতি-ধর্মীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরোধিতা এবং সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি ভোটারদের সমর্থন ছাড়া তাদের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেতানিয়াহুর বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের সঙ্গে তিনি ঐক্য সরকার গঠন করলেও ফিলিস্তিনি দলগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব থেকে যাবে। এমন সরকারে ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের মতো কট্টর ডানপন্থী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন হতে পারে। তবে সরকার গঠনের চূড়ান্ত সমীকরণ এখনো স্পষ্ট নয়।

ফিলিস্তিনি ভোটারদের বড় অংশের অংশগ্রহণের পেছনে এই দুই নেতাকে ক্ষমতার বাইরে রাখার আকাঙ্ক্ষাও কাজ করে থাকতে পারে।

ইহুদি উদারপন্থীদের সামনে দুটি পথ
নির্বাচনের ফল ইসরাইলের ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী ইহুদি রাজনীতির সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ইহুদি ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থীদের সামনে দুটি পথ রয়েছে। হয় তাদের চিরকাল নেতানিয়াহু বা তার মতো কারও অধীনে থাকতে হবে। নয়তো আরব দল ও ভোটারদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে।

ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সমর্থন ছাড়া বিরোধী শিবিরের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সংকুচিত হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে এই পরিবর্তনের ফলে ইসরাইলের উদারপন্থীরা ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে তাদের পুরোনো অবস্থান পুরোপুরি বদলে ফেলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

রাজনৈতিক আদর্শের পরিবর্তনের বদলে বাস্তব প্রয়োজন তাদের ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে উৎসাহিত করতে পারে। রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় দলগুলোর পুরোনো অবস্থান বদলাতে ভূমিকা রাখে।

তবে বিপরীত সম্ভাবনাও রয়েছে। ডানপন্থী দলগুলো আরব ভোটারদের রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করতে পারে। স্মোট্রিচ, বেন-গভির এবং নেতানিয়াহুও এমন পথ খুঁজতে পারেন।

ফিলিস্তিনি ভোটারদের সামনে পরিচয় ও অধিকারের প্রশ্ন
ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যেও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

মানসুর আব্বাসের রাআম পার্টি মনে করে, ইসরায়েলি রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে কাজ করে নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্য বাস্তব সুবিধা আদায় করা জরুরি।

এই কৌশলে শিক্ষা, উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর অর্থ হলো, গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং বিশ্বের অন্য অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ থেকে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার কিছুটা আলাদা হয়ে যেতে পারে।

আব্বাসের রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী, অন্য অঞ্চলের ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করার ক্ষমতা তাদের সীমিত। ইসরায়েলি রাষ্ট্র অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই নিজেদের অধিকার ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া দরকার।

অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্ট দখলদারত্বের মধ্যে থাকা এবং দেশের বাইরে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা ছেড়ে দেয়নি।

মঙ্গলবারের ভোটে ফিলিস্তিনি ভোটাররা প্রায় দুই-এক অনুপাতে জয়েন্ট লিস্টের পরিচয় ও অগ্রাধিকারের ধারণাকে সমর্থন করেছেন বলে নির্বাচনী বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

তাদের দাবি শুধু ভালো নাগরিক সেবা নয়। তারা বৈষম্য কমাতে চান। উন্নত আবাসন চান। নিরাপদ সমাজ চান। ফিলিস্তিনি এলাকায় সংগঠিত অপরাধ ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

তবে এসব দাবি পূরণের জন্য তারা নিজেদের ফিলিস্তিনি পরিচয় ছেড়ে দিতে চান না।

নেতানিয়াহুবিরোধী সরকারকে সমর্থনে চার শর্ত
জয়েন্ট লিস্টের চেয়ারম্যান ইউসুফ জাবারিন নির্বাচনী প্রচারের সময় নেতানিয়াহুকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠনে সমর্থনের জন্য চারটি শর্ত তুলে ধরেছিলেন।

প্রথমত, অপরাধ দমন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিনি জনপদের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করতে হবে। তৃতীয়ত, আরব নাগরিকদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি স্পষ্ট প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

এই শর্তগুলো দেখায়, ফিলিস্তিনি দলগুলোর কাছে সরকার গঠনের আলোচনা শুধু ক্ষমতার ভাগাভাগি নয়। তাদের পরিচয়, অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিও এর সঙ্গে যুক্ত।

জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম যদি আইজেনকট কিংবা নাফতালি বেনেটের সঙ্গে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করে, তাহলে ফিলিস্তিনি পরিচয় এবং অধিকৃত অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের প্রশ্ন আলোচনার টেবিলে আসতে পারে।

নতুন রাজনৈতিক শক্তি কীভাবে ব্যবহার করবেন ফিলিস্তিনিরা?
ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ পেতে পারেন।

তবে এই সুযোগ কাজে লাগানো সহজ হবে না। তাদের এমন দাবি তুলতে হবে, যা ইহুদি রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। একই সঙ্গে নিজেদের পরিচয়, মৌলিক অধিকার, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দাবি এবং দখলদারত্বের অবসানের প্রশ্নেও অবস্থান ধরে রাখতে হবে।

এই নির্বাচনের ফলে ফিলিস্তিনি দলগুলোর দর-কষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে। তবে সেই ক্ষমতা কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।

ইসরাইলের ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যপন্থী দল এবং ফিলিস্তিনি নাগরিক—দুই পক্ষের জন্যই সামনে কঠিন আলোচনা অপেক্ষা করছে।

সূত্র-মিডল ইস্ট আই

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?

ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?

আরবদের বাদ দিয়ে নতুন সরকার গঠনের দাবি ইসরাইলি ডানপন্থি নেত্রীর

আরবদের বাদ দিয়ে নতুন সরকার গঠনের দাবি ইসরাইলি ডানপন্থি নেত্রীর

সাত বছরে ইসরাইলে কেন ছয় নির্বাচন?

সাত বছরে ইসরাইলে কেন ছয় নির্বাচন?

ইসরাইলের নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিল ফ্রান্স

ইসরাইলের নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিল ফ্রান্স

নির্বাচনের অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগুনে জ্বলছে ইসরাইল

নির্বাচনের অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগুনে জ্বলছে ইসরাইল

ইসরাইলে ৮৫.৬ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন, কোন জোট এগিয়ে?

ইসরাইলে ৮৫.৬ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন, কোন জোট এগিয়ে?

আরও পড়ুন

ইসরাইলে নেতানিয়াহুর দাপট কমল, ক্ষমতার চাবি ফিলিস্তিনিদের হাতে

ইসরাইলে নেতানিয়াহুর দাপট কমল, ক্ষমতার চাবি ফিলিস্তিনিদের হাতে

কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ ইরানের, নতুন হামলার শঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্য

কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ ইরানের, নতুন হামলার শঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্য

ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?

ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?

‘টাকা নেই, ভবিষ্যৎ নেই, আশাও নেই’, যুদ্ধের চাপে বিপর্যস্ত ইরানিরা

‘টাকা নেই, ভবিষ্যৎ নেই, আশাও নেই’, যুদ্ধের চাপে বিপর্যস্ত ইরানিরা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম