সিএনএনের প্রতিবেদন
ইসরাইলে নির্বাচন শেষে অচলাবস্থা, সরকার গঠনে সামনে ৪ পথ
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী লিকুদ পার্টি এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি।
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত অনিশ্চয়তা চলতে পারে।
রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজন গভীর হওয়ায় জোট গঠনের সহজ কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না। তবে বিশ্লেষকদের বিবেচনায় সরকার গঠনের কয়েকটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্বল্পস্থায়ী জোট সরকার গঠিত হলেও তা এক বছরের বেশি টিকবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দলগুলোর নেতারা আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে আবারও নির্বাচনের মুখোমুখি হতে পারে ইসরাইল।
বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ক্ষেত্রে বিরোধী জোটের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পথ হলো ইহুদি ও আরব দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা। তবে এটিই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা।
বিরোধী জোটের ডানপন্থী দুই নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান, পার্লামেন্টের দুই আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের সমর্থনে কোনো সরকার গঠনের বিরোধী। জোট সরকারের অংশ হিসেবে কিংবা সংখ্যালঘু সরকারের বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের আপত্তি রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর থেকে এ বিষয়ে তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
ইসরাইলের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সরকারে আরব দল পূর্ণাঙ্গভাবে অংশ নিয়েছিল। ২০২১ সালে রা’আমসহ আটটি দলের জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সেই সরকার এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়ে।
সরকার গঠন করতে না পারলেও বিরোধী দলগুলো পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে নেসেটের স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে পরিবর্তন আনতে পারে। এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নেতানিয়াহুর ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করতে পারে তারা। তবে তাকে সরিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের মতো জোট গঠন এখনো বেশ জটিল ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর।
জাতীয় ঐক্যের সরকার
সরকার গঠনের আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটের ভাঙন এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন। এ ধরনের সরকারে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির পাশাপাশি তার বর্তমান জোটের কয়েকটি দল এবং বিরোধী জোটের অন্তত একটি দলকে যুক্ত হতে হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, নেতানিয়াহু জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভিরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে রাজি হতে পারেন। তবে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এবং উগ্র অর্থোডক্স দলগুলোকে বাদ দিতে তিনি রাজি হবেন না।
অন্যদিকে, আইজেনকোট আগেই নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে না থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আগ্রহী অনেক ইসরাইলির কাছে অবস্থান পরিবর্তন করে তার সঙ্গে সরকার গঠন বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিরোধী দলের সদস্য ভাঙিয়ে সরকার গঠন
আরেকটি সম্ভাবনা হলো বিরোধী জোটের দল বা ব্যক্তিগত আইনপ্রণেতাদের নেতানিয়াহুর পক্ষে টেনে আনা। এভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন তিনি।
তবে বিরোধী জোটের চার নেতা—গাদি আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট, আভিগদর লিবারম্যান ও ইয়ার গোলান—নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকারে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জোট প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আটটি আসন পিছিয়ে রয়েছে। ফলে আটজন আইনপ্রণেতাকে দলত্যাগে রাজি করানো সহজ হবে না।
আবারও নির্বাচন
সরকার গঠনের সম্ভাব্য পথগুলো নিয়ে আলোচনা চললেও ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ পার্লামেন্টে নির্বাচিত দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করবেন। তাদের মতামত নেওয়ার পর তিনি একজন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন।
আরব দলগুলো আইজেনকোটের প্রতি সমর্থন জানাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ইয়াশার পার্টির এই নেতা প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন।
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর সরকার গঠনের জন্য একজন নেতা ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো হতে পারে। প্রথম ব্যক্তি ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় একজন নেতাকে দায়িত্ব দেবেন। তার জন্যও সময় থাকবে ২৮ দিন।
দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা প্রেসিডেন্টকে তৃতীয় একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারবেন। তৃতীয় প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় পাবেন।
এই তিন প্রচেষ্টার কোনোটিতেই সমঝোতা না হলে আবারও নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন নেতানিয়াহু। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তার হাতে অপেক্ষা করার সুযোগ রয়েছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকোট প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়ে ব্যর্থ হলে সেই দায়িত্ব নেতানিয়াহুর কাছে যেতে পারে। তিনিও ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি করবে। তত দিন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারবেন নেতানিয়াহু।
আগামী বসন্তের আগে নতুন নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে বর্তমান ফলাফল ইসরাইলকে আবারও রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে আট বছরে দেশটিতে সপ্তম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সূত্র: সিএনএন
