দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ
২৫ বছরের শাসনে ভারতকে কতটা বদলাতে পারলেন মোদি?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম
নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ২০০১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে নির্বাহী সরকার প্রধান হিসেবে আড়াই দশক পূর্ণ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত এক চতুর্থাংশ শতাব্দী ধরে ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাকে তিনি যেভাবে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করেছেন, তা নিয়ে দেশি-বিদেশি মহলে রয়েছে নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নসহ সার্বিক পর্যালোচনায় তার এই দীর্ঘ শাসনামলের অর্জন, ব্যর্থতা ও পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
নরেন্দ্র মোদির বিরোধীরা শুরু থেকেই তার কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করে আসলেও, তার সমর্থকদের কাছে তিনি বরাবরই উন্নয়নের প্রতীক। এর মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয় তার ‘গুজরাট মডেল’-কে। এই মডেলে ব্যাপক শিল্পায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে এবং দেশের একটা বড় অংশে চরম দারিদ্র্য অনেকটাই কমেছে। এছাড়া সরাসরি কল্যাণমূলক সাহায্য প্রদান, ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসার এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি হ্রাসের মতো কিছু দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ তাকে আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখেছে।
তবে এত সাফল্যের পরও মোদির এই দীর্ঘ শাসনকাল পুরোপুরি ত্রুটিহীন বা একমুখী নয়। অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর নিয়ে বিশ্লেষকদের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। চীন বা অন্যান্য এশীয় দেশগুলো যেভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটিয়ে সাধারণ মানুষকে ঐতিহ্যবাহী কৃষি খাত থেকে বের করে আধুনিক শিল্পকারখানায় চাকরি দিয়েছে, ভারতের ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনটি অত্যন্ত ধীরগতির। গত ২৫ বছর ধরে দেশের জিডিপিতে উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে বড় কারখানা ও কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব এখনো ভারতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বিষয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্র নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। মোদির এই আড়াই দশকের শাসনামলে দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনীতিতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা যেভাবে জোরালো হয়েছে, তার জেরে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে নানাভাবে কোণঠাসা করার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন, বিদ্বেষমূলক আক্রমণ, মসজিদ লক্ষ্য করে হামলা এবং সরকারি বুলডোজার দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করার মতো ঘটনাগুলো দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এসব নীতি ও কর্মকাণ্ডের ফলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চরিত্র চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের কঠোর ও জোরালো শাসনপদ্ধতির কারণে সমাজের একটি অংশের মধ্যে একধরনের ক্লান্তি বা বিরক্তি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি, দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া আগের মতো অবাধ ও নিরপেক্ষ থাকছে কি না—তা নিয়ে সমালোচকদের উদ্বেগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
পরিশেষে বলা যায়, বিগত ২৫ বছরে নরেন্দ্র মোদি ভারতকে অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক অঙ্গনে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বটে, তবে দেশের ভেতরে কাঠামোগত সংস্কার, স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমাজে সবার জন্য আস্থার পরিবেশ ও ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পথ যাওয়া বাকি রয়েছে।

