প্রাণের উৎপত্তির রহস্যে নতুন মোড়, প্রশ্নের মুখে পুরোনো তত্ত্ব
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা নতুন গবেষণায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কোটি কোটি বছর আগে ধূমকেতুর মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান এসেছিল— বিজ্ঞানীদের বহুল প্রচলিত এই তত্ত্ব সঠিক নাও হতে পারে। নতুন কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেছে, পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার সময় ধূমকেতুর বহন করা গুরুত্বপূর্ণ জৈব অণুগুলোর অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, প্রাচীন পৃথিবীতে ধূমকেতুর আঘাত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ছিল খুবই কম।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক রিচার্ড অ্যানসলো। তার নেতৃত্বাধীন দল ধূমকেতুর সৃষ্টি ও বিবর্তনের আধুনিক মডেল ব্যবহার করে প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ ১ লাখ বার কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে পরীক্ষা করে।
গবেষণা অনুযায়ী, ৪০০ কোটিরও বেশি বছর আগে পৃথিবী একাধিক ধূমকেতুর আঘাতের মুখে পড়েছিল। এর মধ্যে ১০০ মিটারের বেশি ব্যাসের এক লাখেরও বেশি ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে থাকতে পারে। তবে এসব সংঘর্ষের অধিকাংশই প্রাণ সৃষ্টির উপযোগী জৈব অণু টিকে থাকার জন্য অতিরিক্ত শক্তিশালী ছিল।
অ্যানসলো বলেন, প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশ সম্পর্কে জানা তথ্য বিবেচনায় নিয়ে পরিচালিত সিমুলেশনে গড়ে কোনো সংঘর্ষকেই সফল হিসেবে পাওয়া যায়নি। ধূমকেতুগুলোর পৃথিবীতে আঘাতের গতি এত বেশি ছিল যে সেগুলোর বহন করা জৈব অণু অক্ষত অবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত কম।
সিমুলেশনের ৫৪ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো সংঘর্ষই ঘটেনি। বাকি ৪৬ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্তত একটি সংঘর্ষের ঘটনা দেখা গেছে। তবে খুব অল্পসংখ্যক সিমুলেশনে সর্বোচ্চ তিনটি সংঘর্ষের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
গবেষকেরা অবশ্য একেবারে সম্ভাবনা নাকচ করছেন না। তাদের মতে, বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে ধূমকেতুর একটি আঘাত সফল হতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে পৃথিবীর এমন কোনো স্থানে সংঘর্ষ ঘটতে হতো, যেখানে আগে থেকেই তরল পানি এবং প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান উপস্থিত ছিল।
প্রাণ সৃষ্টির উপাদান নিয়ে নতুন প্রশ্ন
গবেষণাটিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হাইড্রোজেন সায়ানাইড বা এইচসিএন নামের একটি রাসায়নিক যৌগকে। প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হ্যালি ও হেল-বপসহ কয়েক ডজন ধূমকেতুতে এই যৌগের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।
হাইড্রোজেন, কার্বন ও নাইট্রোজেন দিয়ে গঠিত এই যৌগ পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যামিনো অ্যাসিড হলো প্রোটিন তৈরির মৌলিক উপাদান।
তবে ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার সময় প্রচণ্ড তাপ ও চাপ সৃষ্টি হয়। এতে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এমনকি কোনো ধূমকেতু থেকে এই উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছালেও তা প্রাণ সৃষ্টির জন্য পর্যাপ্ত ঘনত্বে থাকার নিশ্চয়তা নেই। সমুদ্রে আঘাত করলে যৌগটি দ্রুত পানিতে মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
গবেষক অ্যানসলোর মতে, প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য ফসফরাস ও সালফারযুক্ত যৌগসহ আরও অনেক উপাদান প্রয়োজন। কিন্তু ধূমকেতুতে এসব উপাদান নিয়মিত পাওয়া যায় না। ফলে একটি ধূমকেতু প্রয়োজনীয় একটি উপাদান নিয়ে এলেও একই স্থানে অন্য উপাদানগুলো পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
গ্রহাণু ও প্রাচীন পৃথিবী নিয়ে বিকল্প ব্যাখ্যা
ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৃথিবীতে আসার তত্ত্ব দুর্বল হয়ে পড়লেও বিকল্প সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে একটি হলো, প্রাচীন পৃথিবীর পরিবেশেই প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয় অণুগুলো তৈরি হয়েছিল। এ ধারণাটি দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আলোচনায় রয়েছে।
আরেকটি সম্ভাব্য উৎস হলো গ্রহাণু। ধূমকেতুর তুলনায় গ্রহাণুগুলো সাধারণত কম গতিতে পৃথিবীতে আঘাত হানে এবং সংখ্যায়ও বেশি ছিল। ফলে সেগুলোর বহন করা জৈব উপাদান অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
গ্রহাণু বেন্নু ও রিউগু থেকে সংগ্রহ করা নমুনায় প্রোটিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এসব আবিষ্কার পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তিতে মহাকাশ থেকে আসা উপাদানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
মঙ্গলে প্রাণের উপাদান পৌঁছানোর সম্ভাবনা
নতুন গবেষণায় আরও একটি সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। পৃথিবীর তুলনায় প্রাচীন মঙ্গলে ধূমকেতুর মাধ্যমে প্রাণ সৃষ্টির উপাদান পৌঁছানোর পরিবেশ বেশি অনুকূল হতে পারে।
গবেষক অ্যানসলো বলেন, মঙ্গল পৃথিবীর তুলনায় অনেক ছোট এবং সূর্য থেকে দূরে অবস্থিত। ফলে সেখানে ধূমকেতুর আঘাতের গতি তুলনামূলক কম ছিল। পৃথিবীতে যে সংঘর্ষের কারণে হাইড্রোজেন সায়ানাইডের অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যেত, মঙ্গলে একই ঘটনা না-ও ঘটতে পারে।
এই ধারণা লাল গ্রহটিতে অতীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না, সেই দীর্ঘদিনের প্রশ্নের অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
ধূমকেতুর ভূমিকা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা
নতুন গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হলেও প্রাণের উৎপত্তিতে ধূমকেতুর ভূমিকা পুরোপুরি বাতিল করতে রাজি নন অন্য বিজ্ঞানীরা।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কুইনি চ্যান বলেন, ধূমকেতু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগেই হাইড্রোজেন সায়ানাইড বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। এর ফলে অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ তৈরি হতে পারে, যেগুলো তুলনামূলক বেশি স্থিতিশীল এবং সংঘর্ষের পরও টিকে থাকার সম্ভাবনা রাখে।
তার মতে, অক্ষত হাইড্রোজেন সায়ানাইড পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ধূমকেতুর অকার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও পৃথিবীতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ সরবরাহে তাদের ভূমিকা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের অ্যালবিয়ন কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিকোল জেলনারও গবেষণার ফলাফলে বিস্মিত নন। তবে তিনিও প্রাণের উৎপত্তিতে ধূমকেতুর সম্ভাব্য অবদান পুরোপুরি বাতিল করতে চান না।

-6ae6af103a5bc.jpg)