নির্বাচনে বিপর্যয়: ইরানের সঙ্গে কি নতুন করে যুদ্ধে জড়াবেন ট্রাম্প?
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি দলটি এমন সব আসনেও হেরেছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিপরীতে, বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি।
এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়। ট্রাম্পের শুল্কনীতি সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই সংঘাতের কারণে দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্বীকার করেছেন, ‘যুদ্ধের কারণেই আমরা হেরেছি।’
ট্রাম্পও তার এই বক্তব্যকে অনেকাংশে সত্য বলে মেনে নিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনে এমন বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প কি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করবেন, নাকি সমঝোতার পথ বেছে নেবেন?
এ বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেই। নির্বাচনের পরপরই তিনি নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ দেখাননি। বরং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সব লক্ষ্য অর্জন করেছে। প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও আপাতত তার দরকার নাও হতে পারে।
কিন্তু বৃহস্পতিবারের বক্তব্যে আবারও সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা উসকে দিয়েছেন তিনি।
বলেছেন, সম্ভব হলে ইরানের বাকি অংশ ধ্বংস করতে চান না। তবে পরিস্থিতির কারণে হয়তো তাকে সে পথেই যেতে হতে পারে।
অন্যদিকে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে ভ্যান্স সম্ভবত ট্রাম্পের নীতি থেকে নিজের অবস্থান কিছুটা আলাদা করে দেখাতে চাইছেন। তার মতে, ভোটারদের আস্থা ফেরাতে হলে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিতে হবে এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে ফিরতে হবে। একই সঙ্গে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরনও বদলাতে হবে।
জানুয়ারির শুরুতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হবে। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একদিকে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা, অন্যদিকে সমঝোতার সম্ভাবনা। কোন পথে এগোবেন ট্রাম্প?
যুদ্ধের ঝুঁকি কতটা?
আগেও বলা হয়েছে, বছরের শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক তৎপরতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী করা। অর্থাৎ, সামরিক চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে সমঝোতায় বাধ্য করতে চেয়েছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম এশিয়ায় চলা এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের জন্য উল্টো চাপ তৈরি করেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল তারই প্রমাণ। বর্তমানে ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন নেমে এসেছে ৩৮ শতাংশে।
ইরান প্রশ্নে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থান নিয়েও ওয়াশিংটনের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। ভ্যান্স ব্যক্তিগত আলোচনায় নেতানিয়াহুর ইরাননীতির সমালোচনা করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ইরান বিষয়ে নেতানিয়াহুর অবস্থানকে তিনি প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভুল বলে মনে করেন বলে জানা গেছে।
এতে বোঝা যায়, ইরানকে সামরিক শক্তি দিয়ে দমনের যে কৌশল নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন করে আসছেন, তার কার্যকারিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ইরানের অবস্থানকেও শক্তিশালী করেছে। তেহরানের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প হয়তো নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পথ বেছে নিতে পারেন। এতে সাময়িকভাবে শক্ত অবস্থান দেখানো সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত তার লক্ষ্য যে সমঝোতায় পৌঁছানো, সেটিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ইরানের সঙ্গে সংঘাত কখন শেষ হবে, সেই সিদ্ধান্ত এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র নিতে পারবে না। ইরানেরও এখানে সমান ভূমিকা রয়েছে।
তেহরান বারবার জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত বা দীর্ঘমেয়াদি—যেকোনো ধরনের সামরিক অভিযান চালালেই পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আরও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হবে এবং হামলার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা মানা হবে না।
ইরানের এই অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সীমিত পরিসরে হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। ওয়াশিংটন হয়তো ইরানের পাল্টা হামলার ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে পারে, কিন্তু সংঘাত কতটা ছড়িয়ে পড়বে, তা নিয়ন্ত্রণ করা তার পক্ষে সহজ হবে না।
আঞ্চলিক দেশগুলোও নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চায় না। আগের সংঘাতে ইরানের পাল্টা হামলার ধাক্কা যেসব আরব দেশকে সামলাতে হয়েছে, তারা জানে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তাদের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। এ কারণে কাতার, তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতায় পৌঁছাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেও যুক্তরাষ্ট্র কোনো কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। এখন আবার যুদ্ধ শুরু করলে আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটনের অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে।
সমঝোতার সুযোগ কি তৈরি হচ্ছে?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সুস্পষ্ট কোনো লক্ষ্য না থাকা। একই কারণে ইসরাইলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপেও ওয়াশিংটন সমর্থন দেয়নি।
অন্যদিকে, ইরান চাইছে যুক্তরাষ্ট্র জুন মাসে ভেঙে যাওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতার মূল শর্তগুলো মেনে আলোচনায় ফিরুক।
এ জন্য তেহরান সাত দফা দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংঘাত বন্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড় এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান।
জুন মাসে দুই পক্ষের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারকের কাঠামো তৈরি হয়েছিল, ইরান সেটির ভিত্তিতেই এগোতে চায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাত দফা দাবি মেনে নিতে হবে। এরপর ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে।
তবে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার নিজেদের হাতে রাখতে চায় তেহরান। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।
অর্থাৎ, নতুন করে সংঘাত এড়ানোর চেয়ে এখন সমঝোতায় পৌঁছানোই ইরানের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও প্রকাশ্যে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্পের সামনে কঠিন হিসাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর ট্রাম্পের সামনে ইরান প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে না। নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে। আবার সমঝোতায় যেতে হলে ইরানের কিছু দাবি মেনে নেওয়ার পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে চাপে রাখার কৌশল যে খুব একটা কাজে আসেনি, তা এখন স্পষ্ট। অন্যদিকে, ইরানও বুঝতে পারছে যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার জন্য আলোচনায় বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে।
তাই আপাতত নতুন করে যুদ্ধের চেয়ে সমঝোতার সম্ভাবনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা বোধ করলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে তিনি কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

