নবীজি (সা.)-এর যেমন বন্ধু ছিলেন আবু বকর (রা.)
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৪ পিএম
হজরত আবু বকর (রা.)। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বন্ধুতা সাধারণত সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে না। স্বার্থ, ভয় কিংবা কষ্টের মুহূর্তে অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায়; কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু বন্ধুত্ব আছে, যা সময় নয়—ইমান দিয়ে গড়া। নবীজি মুহাম্মদ (সা.) ও আবু বকর সিদ্দীক (রা.)–এর বন্ধুত্ব তেমনই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত ভালোবাসার নয়; এটি ছিল বিশ্বাস, আত্মত্যাগ, নিঃশর্ত সমর্থন ও আল্লাহর পথে একসঙ্গে চলার বন্ধন। নবুয়ত প্রকাশের আগের দিনগুলো থেকে শুরু করে হিজরতের গুহা—প্রতিটি মুহূর্তে আবু বকর (রা.) ছিলেন নবীজির ছায়াসঙ্গী, নির্ভরতার নাম।
আবু বকর ছিদ্দিক (রা.) যার ঈমান ছিল, সমগ্র উম্মতের পাল্লার চেয়েও ভারি!
মদিনার মসজিদে নববিতে ফজরের নামাজ শেষ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের দিকে ফিরে বসলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—
مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ صَائِمًا؟» قَالَ أَبُو بكر: أَنا قَالَ: «فن تَبِعَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ جِنَازَةً؟» قَالَ أَبُو بَكْرٍ: أَنَا. قَالَ: «فَمَنْ أَطْعَمَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مِسْكِينًا؟» قَالَ أَبُو بَكْرٍ: أَنَا. قَالَ: «فَمَنْ عَادَ مِنْكُمُ الْيَوْمَ مَرِيضًا؟» . قَالَ أَبُو بَكْرٍ: أَنَا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا اجْتَمَعْنَ فِي امْرِئٍ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ
‘তোমাদের কে আজ রোজা রেখেছ? আবু বকর (রা.) উত্তর দিলেন, আমি। তিনি বললেন, আজ কে জানাজার সঙ্গে গিয়েছ? আবু বকর (রা.) বললেন, আমি। তিনি বললেন, তোমাদের কে আজ মিসকিনকে খাবার দিয়েছ? আবু বকর (রা.) জবাবে বললেন, আমি। তিনি বললেন, আজ তোমাদের কে অসুস্থকে দেখতে গিয়েছ? আবু বকর (রা.) বললেন, আমি। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন— (শুনে রাখো) যে ব্যক্তির মধ্যে এতো গুণের সমাহার, সে জান্নাতে প্রবেশ করবেই।’ (মুসলিম ১০২৮, বায়হাকি ৭৮৩০, মিশকাতুল মাসাবিহ ১৮৯১)
ইসলামের ঘোষণা ও রাসুলের প্রতি ভালোবাসা
আলহামদুলিল্লাহ! ইসলামের শুরুর দিনগুলোতে যখন মুসলিমদের সংখ্যা মাত্র ৩৮ জন তখন হজরত আবু বকর (রা.) চাইলেন প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেবেন। কাবা চত্বরে দাঁড়িয়ে তিনি যখন তাওহিদের ডাক দিলেন, মুশরিকরা পঙ্গপালের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। উত্তপ্ত বালু আর পাথরের আঘাতে তার পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হলো। অচেতন অবস্থায় তাঁকে বাড়িতে নেওয়া হলো। দীর্ঘ সময় পর যখন তার জ্ঞান ফিরল, জ্ঞান ফেরার পর তার প্রথম কথা ছিল— মা নালা মিন রাসূলিল্লাহ? অর্থাৎ ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কেমন আছেন?’ মা খাবার নিয়ে সামনে এলেন। কিন্তু সিদ্দিকের মনে তখন নিজের কষ্টের চেয়ে প্রিয় বন্ধুর চিন্তাই বড়। তিনি বললেন— ‘আল্লাহর কসম! নবিজী (সা.)-এর মুখ না দেখা পর্যন্ত আমি কিছুই মুখে দেব না।’ রাতের আঁধারে যখন তাকে দারুল আরকামে নিয়ে যাওয়া হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদলেন।’ (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইফা, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা নং ৩০-৩২)
কুরআনের বর্ণনায় হজরত আবু বকর (রা.)
আল্লাহ তাআলা হজরত আবু বকর (রা.)-এর মতো মুমিনদের গুণের কথা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন এভাবে—
وَ الَّذِیۡ جَآءَ بِالصِّدۡقِ وَ صَدَّقَ بِهٖۤ اُولٰٓئِكَ هُمُ الۡمُتَّقُوۡنَ
‘আর যে ব্যক্তি সত্য নিয়ে এসেছে এবং যে তা সত্য বলে গ্রহণ করেছে, তারাই তো মুত্তাকী।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৩৩)
কাবা চত্বরে সাহসিকতার নজির
قَالَ سَأَلْتُ عَبْدَ اللهِ بْنَ عَمْرٍو عَنْ أَشَدِّ مَا صَنَعَ الْمُشْرِكُوْنَ بِرَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ رَأَيْتُ عُقْبَةَ بْنَ أَبِيْ مُعَيْطٍ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يُصَلِّيْ فَوَضَعَ رِدَاءَهُ فِيْ عُنُقِهِ فَخَنَقَهُ بِهِ خَنْقًا شَدِيْدًا فَجَاءَ أَبُوْ بَكْرٍ حَتَّى دَفَعَهُ عَنْهُ فَقَالَأَتَقْتُلُوْنَ رَجُلًا أَنْ يَّقُوْلَ رَبِّـيَ اللهُ وَقَدْ جَآءَكُمْ بِالْبَيِّنٰتِ مِنْ رَّبِّكُمْ
আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, মক্কার মুশরিকরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সবচেয়ে কঠিন আচরণ কী করেছিল? তিনি বললেন, আমি ‘উক্বাহ ইবনু আবূ মুআইতকে দেখেছি; সে নবী (সা.)-এর কাছে এলো; যখন তিনি নামাজ আদায় করছিলেন। সে নিজের চাদর দিয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর গলায় জড়িয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। আবু বকর (রা.) এসে উকবাহকে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন— ‘তোমরা কি এমন লোককে মেরে ফেলতে চাও, যিনি বলেন, একমাত্র আল্লাহ্ই আমার রব। যিনি তার দাবির স্বপক্ষে তোমাদের রবের কাছ হতে স্পষ্ট প্রমাণ সঙ্গে নিয়ে এসেছেন? (বুখারি ৩৬৭৮)
আমৃত্যু জীবন্ত প্রহরী
ইসলাম গ্রহণ থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু বকর (রা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব বয়ান করতে গিয়ে বলেছেন—
إِنَّ اللهَ بَعَثَنِيْ إِلَيْكُمْ فَقُلْتُمْ كَذَبْتَ وَقَالَ أَبُوْ بَكْرٍ صَدَقَ وَوَاسَانِيْ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ
‘আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, তখন তোমরা বলেছিলে ‘তুমি মিথ্যা বলছো’। আর আবু বকর বলেছিল ‘আপনি সত্য বলেছেন’। সে তার জান ও মাল দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছে।(বুখারি ৩৬৬১)
তার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন— ‘আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ইবনে আবি কুহাফা ছাড়া প্রত্যেকের মাঝেই কিছুটা দ্বিধা, জড়তা ও সংশয় লক্ষ্য করেছি। কিন্তু আবু বকরের কাছে যখনই আমি ইসলামের কথা পেশ করেছি, সে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি এবং মুহূর্তকাল দেরি না করেই ইসলাম কবুল করেছে।’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫২-২৫৩)
বিখ্যাত মুফাসসির ও ঐতিহাসিক হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.) তার কালজয়ী ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’-তে উল্লেখ করেছেন যে, আবু বকর (রা.)-এর ঈমান ছিল অত্যন্ত দৃঢ় এবং তিনি আগে থেকেই আরবের অন্ধকার যুগ থেকে মুক্ত ছিলেন, যার ফলে সত্য চিনতে তার দেরি হয়নি। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৯)
নবীজি (সা.)-এর প্রিয় মানুষ
হজরত আবু বকর (রা.) ছিলেন পুরুষদের মধ্যে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। একবার আমর ইবনুল আস (রা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন—
أَيُّ النَّاسِ أَحَبُّ إِلَيْكَ قَالَ عَائِشَةُ فَقُلْتُ مِنْ الرِّجَالِ فَقَالَ أَبُوْهَا قُلْتُ ثُمَّ مَنْ قَالَ ثُمَّ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ فَعَدَّ رِجَالًا
‘হে আল্লাহর রাসুল! মানুষের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আয়েশা’। পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পুরুষদের মধ্যে কে?’ তিনি বললেন, ‘তার পিতা (আবু বকর)। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, অতঃপর কোন লোকটি? তিনি বললেন, ওমর ইবনু খাত্তাব অতঃপর আরও কয়েকজনের নাম করলেন।’ (বুখারি ৩৬৬২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যদি আমি আমার উম্মতের মধ্য থেকে কাউকে ‘খলিল’ (অন্তরঙ্গ বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকেই গ্রহণ করতাম। তবে তার সঙ্গে আমার ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক রয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ ৯৩)
‘খলিল’ শব্দের তাৎপর্য
আরবি ভাষায় ‘খলিল’ এমন বন্ধুকে বলা হয় যার ভালোবাসা হৃদয়ের প্রতিটি কোণে মিশে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বুঝিয়েছেন যে, তার হৃদয়ের সেই সর্বোচ্চ স্থানটি একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। আর মানুষের মধ্যে দ্বীনি ভ্রাতৃত্বের দিক থেকে আবু বকর (রা.)-এর স্থান সবার উপরে।
আবু বকর (রা.)-এর বৈশিষ্ট্য
হজরত আবু বকর (রা.)-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল তার ‘সিদ্দিকিয়াত’ বা সত্যকে চিনে নেওয়ার প্রখর ক্ষমতা। তৎকালীন মক্কায় যেখানে বড় বড় নেতারা সত্য মেনে নিতে বংশীয় অহংকার বা সামাজিক চাপের কারণে দ্বিধায় ভুগতেন, সেখানে আবু বকর (রা.) কোনো যুক্তিতর্ক ছাড়াই প্রথম সুযোগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণেই তাকে ‘সিদ্দিক’ বা মহাসত্যবাদী উপাধি দেওয়া হয়েছে।
হজরত আবু বকর (রা.) আমাদের শিখিয়েছেন ভালোবাসা মানে কেবল মৌখিক দাবি নয়, বরং ভালোবাসা মানে হলো নিজের জান-মাল দিয়ে প্রিয়তম আদর্শকে রক্ষা করা।
পরিশেষে, হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কেবল একজন সাহাবি বা প্রথম খলিফাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ভালোবাসা ও আনুগত্যের এক জীবন্ত উপমা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি তার এই নিছক আবেগহীন ও দ্বিধাহীন সমর্পণই তাঁকে ‘সিদ্দিক’ বা মহাসত্যবাদীর মর্যাদায় আসীন করেছে।
আজ যখন আমরা ব্যক্তিজীবনে আদর্শ খুঁজি, তখন হজরত আবু বকর (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়— বিপদের দিনে অটল থাকা, সত্যের পথে সব বিলিয়ে দেওয়া এবং নিঃস্বার্থভাবে দ্বীনের খেদমত করাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
আসুন, আমরা আমাদের হৃদয়ে সেই সিদ্দিকি চেতনা ধারণ করি। নিজেদের আমল ও আচরণের মাধ্যমে প্রমাণ করি যে, আমরাও সেই মহান নবীর উম্মত, যাকে আবু বকর (রা.) নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। আসুন আমরাও আমাদের জীবনে আবু বকর (রা.)-এর মতো রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ভালোবাসার শপথ নিই। আল্লাহ আমাদের এই মহান সাহাবির পদাঙ্ক অনুসরণ করে আল্লাহ ও তার রাসুলের সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।
