ফিতরা আদায় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম
ফিতরা আদায়। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে পবিত্র ঈদুল ফিতর সমাগত। আর কয়েকদিন পেরুলেই আমরা ঈদের আনন্দ উদযাপন করব— ইনশাল্লাহ। মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ফিলিস্তিন যুদ্ধের কারণে এবারের ঈদ হয়তো আগের মতো জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা সম্ভব নাও হতে পারে। তবুও আল্লাহ তাআলা যেভাবে চান, সেভাবেই আমরা ঈদ উদযাপন করব। তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদতে মনোনিবেশ করব এবং ঈদের আগেই যথাযথভাবে ফিতরা আদায় করব।
ঈদুল ফিতরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা। ঈদের আনন্দ উদযাপনের আগে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য এটি আদায় করা আবশ্যক। আমরা যদি সময়মতো ফিতরা আদায় করি, তাহলে তা ঈদের আগেই যথাযথভাবে গরিবদের মধ্যে বণ্টন করা সহজ হবে এবং দরিদ্র মানুষও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারবে।
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর ফিতরা ওয়াজিব। এমনকি ঈদের দিন সূর্যোদয়ের আগে যে শিশুর জন্ম হয়, তার পক্ষ থেকেও ফিতরা দিতে হয়। ফিতরা আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো ঈদের নামাজের আগে। এতে দরিদ্র রোজাদাররা ফিতরার অর্থ দিয়ে ঈদের দিন প্রয়োজন মেটাতে পারে এবং আনন্দে অংশ নিতে পারে।
ফিতরা দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং এটি ইবাদতেরই একটি অংশ। এমনকি যাকে ফিতরা দেওয়া হয়, তার পক্ষ থেকেও ফিতরা আদায় করা কর্তব্য। এভাবে সবাই অংশগ্রহণ করলে সাদকাতুল ফিতরের অর্থ একটি সাধারণ তহবিলে পরিণত হয়, যার মাধ্যমে সাহায্যপ্রাপ্তদের মনে হীনমন্যতার অনুভূতি জন্ম নেয় না। সাদকাতুল ফিতর সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, হজরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন—
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ، عَلَى الْعَبْدِ وَالْحُرِّ، وَالذَّكَرِ وَالْأُنْثَى، وَالصَّغِيرِ وَالْكَبِيرِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন— এক সা খেজুর অথবা এক সা যব। এটি দাস-স্বাধীন, পুরুষ-নারী, ছোট-বড়— সকল মুসলমানের ওপর আবশ্যক।’ (বুখারি ১৫০৩)
আরেক হাদিসে হজরত ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন—
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ، فَمَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلَاةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ، وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلَاةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন— যাতে রোজাদার অনর্থক ও অশালীন কথা থেকে পবিত্র হয় এবং গরিবদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা হয়। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে তা আদায় করবে, তা গ্রহণযোগ্য ফিতরা হবে। আর যে ব্যক্তি নামাজের পরে আদায় করবে, তা সাধারণ সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ ১৬০৯)
ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের গরিব ভাই-বোনদের দুঃখ-কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারি এবং তাদেরও ঈদের আনন্দে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে পারি। আল্লাহ তাআলা যাদের ধন-সম্পদ দিয়েছেন, তারা যদি তার রাস্তায় দান করেন এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, তবে এতে সম্পদের কোনো ঘাটতি হয় না; বরং আল্লাহ তা বৃদ্ধি করে দেন।
ইসলামে দান-খয়রাত এবং গরিব-অসহায় মানুষের সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর পথে ব্যয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বহু নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘যারা স্বচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় আল্লাহর পথে ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে— আর আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শুধু সচ্ছল অবস্থায়ই নয়; বরং সুখ-দুঃখ, স্বচ্ছলতা-অভাব— সব অবস্থাতেই আল্লাহর পথে ব্যয় করতে হবে। যে ব্যক্তি সব অবস্থায় আল্লাহর পথে খরচ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে ভালোবাসেন।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, আমরা অনেক সময় দুনিয়ার অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ ব্যয় করতে দ্বিধা করি না; অথচ আল্লাহর পথে খরচ করার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করি। এর পেছনে মূলত শয়তানের কুমন্ত্রণা কাজ করে। সে মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়— যদি দান করো, তাহলে সম্পদ কমে যাবে এবং তুমি দরিদ্র হয়ে পড়বে। অথচ হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ
‘দান করলে সম্পদ কমে না।’ (মুসলিম ২৫৮৮)
সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, আল্লাহর পথে ব্যয় করলে কেউ দরিদ্র হয় না; বরং আল্লাহ তাআলা তার সম্পদকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন।
অতএব, আমরা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করতে চাই এবং তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পেতে চাই, তবে আমাদের উচিত আল্লাহর পথে ব্যয় করা এবং গরিব-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
বিশেষ করে বর্তমান করোনা মহামারির সময়ে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষদের অনেকেই কষ্টে দিন পার করছেন। তাই আমাদের সবার দায়িত্ব— তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
