শ্রমিকের মর্যাদা অধিকার ও ইসলামের ন্যায়বোধ
Advertisement
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এই পৃথিবীর প্রতিটি অট্টালিকা, প্রতিটি সেতু, প্রতিটি নগরায়ণের পেছনে যে নীরব শক্তি নিরন্তর কাজ করে যায়, তার নাম শ্রমিক। তার ঘাম শুকায় না, তার ক্লান্তি প্রকাশ পায় না, তার আর্তনাদ শোনা যায় না তবুও তার হাতেই গড়ে ওঠে সভ্যতার দৃশ্যমান রূপ।
অথচ এই মানুষটিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, সবচেয়ে কম সম্মানিত, এবং সবচেয়ে সহজে বঞ্চিত। এ এক নির্মম বৈপরীত্য যে হাতে গড়ে ওঠে পৃথিবী, সেই হাতই অধিকারের প্রশ্নে শূন্য হয়ে থাকে।
ইসলাম এই বৈপরীত্যকে ভেঙে দিয়েছে এক গভীর ন্যায়বোধের দর্শনে। এখানে শ্রম কেবল উপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি মর্যাদার প্রতীক, এটি ইবাদতের অংশ, এটি মানুষের আত্মসম্মানের অবিচ্ছেদ্য প্রকাশ। পবিত্র কুরআনে মানুষের শ্রমকে তার প্রাপ্যতার মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে মানুষ তার চেষ্টা ছাড়া কিছুই পায় না।
এই ঘোষণা কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি এক দার্শনিক অবস্থান, যেখানে শ্রমিকের ঘামকে সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে বসানো হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সা. এর বাণীতে শ্রমিকের অধিকার এমন তীব্রভাবে উচ্চারিত হয়েছে, যা ইতিহাসে বিরল। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, শ্রমিকের মজুরি তার ঘাম শুকানোর আগেই পরিশোধ করতে হবে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৪৪৩)
এই নির্দেশনার মধ্যে শুধু সময়ের গুরুত্ব নয়, বরং শ্রমিকের সম্মান ও প্রাপ্যের তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি নিহিত। বিলম্ব এখানে কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, এটি এক প্রকার নৈতিক অবমাননা।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, ইসলাম শ্রমিককে কোনো নিম্নস্তরের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে না, বরং তাকে ‘ভাই’ হিসেবে অভিহিত করে। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদের ভাই, তোমরা যা খাও, তাদেরও তা খেতে দাও, তোমরা যা পরো, তাদেরও তা পরতে দাও। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩০)
এই ভাষা কেবল মানবিকতা নয়, এটি সামাজিক কাঠামোর এক বিপ্লবী পুনর্নির্মাণ, যেখানে প্রভু-ভৃত্যের বিভাজন ভেঙে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় মানবিক সমতার এক উচ্চতর আদর্শ।
ইসলামী ফিকহশাস্ত্রের প্রাজ্ঞ মনীষীরা এই নীতিকে সুসংহত কাঠামোয় রূপ দিয়েছেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. শ্রমচুক্তিকে একটি বাধ্যতামূলক নৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যেখানে শ্রমিকের প্রাপ্য নির্ধারণ ও তা যথাসময়ে প্রদান করা অপরিহার্য।
ইমাম মালিক রহ. শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া এবং তার সামর্থ্যের বাইরে কাজ আদায় করাকে স্পষ্টভাবে জুলুম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ইমাম শাফি রহ. চুক্তি লঙ্ঘনকে কেবল আইনি অপরাধ নয়, বরং নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে দেখেছেন, যা সমাজের আস্থা ভেঙে দেয়। আর ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল শ্রমিকের হক নষ্ট করাকে এমন এক দায় হিসেবে তুলে ধরেছেন, যার জবাবদিহি কেবল দুনিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়,আখিরাতেও তা ভয়াবহ পরিণতির কারণ হবে।
এই সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গি এক স্পষ্ট সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে শ্রমিক কোনো যন্ত্র নয়, কোনো সংখ্যা নয়; তিনি এক পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যার সম্মান, অধিকার ও মর্যাদা আল্লাহপ্রদত্ত। তার ঘামকে অবমূল্যায়ন করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং মানবতার ভিত্তিকেই অস্বীকার করা।
কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় এই আদর্শের প্রতিফলন প্রায়শই অনুপস্থিত। আধুনিক অর্থনীতির চাকা ঘোরে শ্রমিকের কাঁধে ভর করে, কিন্তু সেই কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হয় অবহেলা, বঞ্চনা ও বৈষম্যের ভার।
ন্যায্য মজুরি বিলম্বিত হয়, কর্মঘণ্টা অমানবিক হয়ে ওঠে, নিরাপত্তা উপেক্ষিত থাকে, আর মানবিক আচরণ অনেক ক্ষেত্রে বিলাসিতায় পরিণত হয়। উন্নয়নের উচ্চকিত ভাষণে শ্রমিকের অবদান স্বীকার করা হয়, কিন্তু তার অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেখা যায় এক ভয়াবহ শূন্যতা।
এই শূন্যতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক। এটি সেই সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে শ্রমিকের ঘাম দৃশ্যমান, কিন্তু তার মর্যাদা অদৃশ্য। যেখানে উন্নয়ন দৃশ্যমান, কিন্তু ন্যায়বিচার অনুপস্থিত।
ইসলাম এই অন্ধকারের ভেতর এক আলোকরেখা টেনে দেয় যেখানে শ্রমিকের প্রতি আচরণই মানুষের ঈমান ও নৈতিকতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ একজন মানুষ কেমন, তা বোঝা যায় সে দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষের সাথে কেমন আচরণ করে।
শ্রমিকের প্রতি অবহেলা কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি একটি নৈতিক ব্যর্থতা, একটি আত্মিক সংকট। আর যে সমাজ এই ব্যর্থতাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করে, তার উন্নয়ন যতই উজ্জ্বল হোক, ভেতরে তা ভঙ্গুরই থেকে যায়।
সভ্যতার প্রকৃত সৌন্দর্য অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, তা নিহিত থাকে সেই হাতগুলোর সম্মানে, যারা নীরবে সেই অট্টালিকা নির্মাণ করে।
শ্রমিকের ঘাম যদি মর্যাদা না পায়, তবে সেই সভ্যতা যতই দীপ্ত হোক, তার ভিত্তি থেকে যায় অনিরাপদ, অসম্পূর্ণ এবং ন্যায়হীন।
লেখক: শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর

