কবরের প্রশ্ন ও আজাব থেকে কারা মুক্ত থাকবেন?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মৃত্যু মানেই জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং মৃত্যুর মধ্য দিয়েই শুরু হয় অনন্ত পরকালীন জীবনের নতুন অধ্যায়। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, আর আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। মৃত্যুর পর মানুষের জন্য অপেক্ষা করে বারজাখের জীবন, কবরের জিজ্ঞাসাবাদ এবং কিয়ামতের মহাবিচার। তাই একজন মুমিনের জীবনে কবরের জীবন ও তার প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মানুষকে তার রব, দ্বীন এবং নবী মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইমানদার ব্যক্তি আল্লাহর সাহায্যে সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে, যারা দুনিয়ায় সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে কিংবা কেবল মানুষের অনুকরণে জীবন কাটিয়েছে, তারা কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।
তবে কুরআন ও হাদিসে এমন কিছু বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সম্পর্কে সুসংবাদ এসেছে, যারা কবরের ফিতনা বা শাস্তি থেকে বিশেষ সুরক্ষা লাভ করবেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুদ্ধে শাহাদাতবরণকারী শহীদ, আল্লাহর পথে সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী এবং আরও কয়েক শ্রেণির মানুষ। কিছু বর্ণনায় শুক্রবারে মৃত্যুবরণকারী, পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী ও নিয়মিত সুরা মুলক পাঠকারীর জন্যও বিশেষ ফজিলতের কথা এসেছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি— কবরের প্রশ্ন থেকে অব্যাহতি, কবরের ফিতনা থেকে সুরক্ষা এবং কবরের আজাব থেকে মুক্তি— এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত হলেও সব ক্ষেত্রে একই অর্থ বহন করে না। তাই প্রতিটি বর্ণনা তার নিজস্ব বক্তব্য ও হাদিসের মান বিবেচনা করে বুঝতে হবে।
কবরের জিজ্ঞাসাবাদ: হাদিসে কী বলা হয়েছে?
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا وُضِعَ فِي قَبْرِهِ، وَتَوَلَّى عَنْهُ أَصْحَابُهُ، وَإِنَّهُ لَيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ، أَتَاهُ مَلَكَانِ فَيُقْعِدَانِهِ
‘বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তার সঙ্গীরা ফিরে যায়, তখন সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়। এরপর তার কাছে দুজন ফেরেশতা আসেন এবং তাকে বসান।’
এরপর তারা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে সে কী বিশ্বাস করত। মুমিন ব্যক্তি উত্তর দেয়, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। তখন তাকে জান্নাতে তার আবাস দেখানো হয়, যা জাহান্নামে তার সম্ভাব্য আবাসের পরিবর্তে নির্ধারিত হয়েছে। অন্যদিকে, কাফির ও মুনাফিক ব্যক্তি বলে, ‘আমি জানি না; মানুষ যা বলত, আমিও তা-ই বলতাম।’ এরপর তার জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।’ (বুখারি ১৩৩৮)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কবরের জিজ্ঞাসাবাদ শুধু মুখস্থ কিছু উত্তর দেওয়ার বিষয় নয়; বরং দুনিয়ায় মানুষের বিশ্বাস, উপলব্ধি ও ইমানের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কবরের ফিতনা বা শাস্তি থেকে বিশেষ সুরক্ষার কথা যাদের ক্ষেত্রে এসেছে
১. নবী-রাসুলগণ (আ.)
নবী-রাসুলগণ আল্লাহর মনোনীত বান্দা। তারা মানুষকে তাওহিদ, ইমান ও সত্যের পথে পরিচালিত করেছেন। তাদের মর্যাদা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে।
নবী-রাসুলদের কবরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না—এ বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে সরাসরি ও দ্ব্যর্থহীন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। তবে একদল আলেমের মতে, নবী-রাসুলগণ কবরের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে অব্যাহতি পাবেন। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর আর-রুহ গ্রন্থে এ বিষয়ে আলেমদের মতামত আলোচনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন—
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
‘আল্লাহ মুমিনদের দুনিয়ার জীবনে এবং আখিরাতে সুদৃঢ় বাণীর ওপর অবিচল রাখেন।’ (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ২৭)
আয়াতটি মুমিনদের দৃঢ় রাখার বিষয়ে। তবে এটিকে নবী-রাসুলদের কবরের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে অব্যাহতির সরাসরি প্রমাণ বলা যাবে না। তাদের ক্ষেত্রে অব্যাহতির বিষয়টি আলেমদের ব্যাখ্যা ও মতামতের আলোকে উল্লেখ করা উচিত।
২. আল্লাহর পথে শাহাদাতবরণকারী শহীদ
আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারীদের জন্য ইসলামে বিশেষ মর্যাদা ও অসংখ্য পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে। শহীদদের অন্যতম বিশেষ মর্যাদা হলো— কবরের ফিতনা থেকে সুরক্ষার সুসংবাদ।
এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, অন্য মুমিনদের কবরে পরীক্ষা করা হবে, কিন্তু শহীদকে কেন করা হবে না? জবাবে নবীজি (সা.) বলেন—
كَفَى بِبَارِقَةِ السُّيُوفِ عَلَى رَأْسِهِ فِتْنَةً
‘তার মাথার ওপর তরবারির ঝলকানিই (পরীক্ষা হিসেবে) যথেষ্ট।’ (নাসাঈ)
এখানে মূলত আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে গিয়ে শাহাদাতবরণকারী শহীদের বিশেষ মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন রোগ, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কারণে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিদেরও কিছু হাদিসে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে; তবে তাদের ক্ষেত্রে একইভাবে কবরের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে অব্যাহতি নিশ্চিত— এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
৩. ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী
ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর পথে দায়িত্ব পালন, মুসলিম জনপদ রক্ষা এবং সীমান্ত পাহারা দেওয়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণকারীদের জন্যও কবরের ফিতনা থেকে সুরক্ষার সুসংবাদ এসেছে। হজরত সালমান আল-খাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ رَابَطَ يَوْمًا وَلَيْلَةً فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَانَ لَهُ كَأَجْرِ صِيَامِ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ، وَمَنْ مَاتَ مُرَابِطًا أُجْرِيَ لَهُ مِثْلُ ذَلِكَ مِنَ الْأَجْرِ، وَأُجْرِيَ عَلَيْهِ الرِّزْقُ، وَأَمِنَ مِنَ الْفَتَّانِ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে এক দিন ও এক রাত সীমান্ত পাহারা দেয়, সে এক মাস রোজা রাখা ও রাত জেগে ইবাদত করার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার জন্যও অনুরূপ সওয়াব অব্যাহত থাকবে, তাকে রিজিক দেওয়া হবে এবং সে কবরের পরীক্ষাকারীদের থেকে নিরাপদ থাকবে।’ (নাসাঈ)
এই সুসংবাদ সেই ব্যক্তির জন্য, যিনি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পথে বৈধ সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শুধু কোনো নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকা বা সাধারণ দায়িত্ব পালনের সঙ্গে এ বিধানকে এক করে দেখা যাবে না।
৪. জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণকারী মুসলিম
জুমার দিন ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। এই দিনের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিসে আলোচনা এসেছে। জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণকারী মুসলিমের জন্যও কবরের ফিতনা থেকে সুরক্ষার একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَوْ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ إِلَّا وَقَاهُ اللَّهُ فِتْنَةَ الْقَبْرِ
‘যে মুসলিম জুমার দিন অথবা জুমার রাতে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাকে কবরের ফিতনা থেকে রক্ষা করেন।’ (তিরমিজি ১০৭৪)
৫. পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণকারী
ইসলামে অসুস্থতা ও বিপদে ধৈর্য ধারণের মর্যাদা রয়েছে। কিছু হাদিসে পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণকারীর জন্য কবরের শাস্তি থেকে মুক্তির সুসংবাদ এসেছে। হাদিসে পাকে এসেছে—
مَنْ يَقْتُلْهُ بَطْنُهُ، فَلَنْ يُعَذَّبَ فِي قَبْرِهِ
‘যাকে তার পেটের পীড়া মৃত্যুবরণ করায়, তাকে তার কবরে শাস্তি দেওয়া হবে না।’ (মুসনাদে আহমদ ১৮৩১০, তিরমিজি ১০৬৪, নাসাঈ ২০৫২)
৬. নিয়মিত সুরা মুলক পাঠকারী
পবিত্র কুরআনের ৬৭তম সুরা হলো সুরা মুলক। এ সুরায় আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা, জীবন-মৃত্যুর উদ্দেশ্য এবং সৃষ্টিজগতের নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। এ সুরার ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে বিশেষ বর্ণনা পাওয়া যায়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসের অংশে এসেছে, এক সাহাবি একটি কবরের ওপর তাঁবু স্থাপন করেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেননি যে সেটি কবর। সেখানে তিনি একজনকে সুরা মুলক তিলাওয়াত করতে শুনতে পান। পরে ঘটনাটি নবীজি (সা.)-কে জানালে তিনি বলেন—
هِيَ الْمَانِعَةُ، هِيَ الْمُنْجِيَةُ، تُنْجِيهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ
‘এটি প্রতিরোধকারী, এটি মুক্তিদানকারী; এটি তাকে কবরের আজাব থেকে মুক্তি দেয়।’ (তিরমিজি ২৮৯০)
কবরের পরীক্ষায় সফল হওয়ার প্রস্তুতি কী?
উপরের বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায়, কবরের জীবন সম্পর্কে ইসলামে যেমন সতর্কবার্তা রয়েছে, তেমনি আল্লাহর রহমত ও বিশেষ অনুগ্রহের আশাও রয়েছে। একজন মুমিনের উচিত শুধু বিশেষ কোনো দিন বা বিশেষ কোনো আমলের ওপর নির্ভর না করে নিজের ইমান ও জীবনকে সংশোধন করা। কবরের পরীক্ষায় সফল হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে আমাদের উচিত—
- বিশুদ্ধ ইমান প্রতিষ্ঠা করা: আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য করা।
- কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়া: কেবল মুখে ইমানের দাবি নয়, বরং আমল ও চরিত্রে তার প্রতিফলন ঘটানো।
- ফরজ ইবাদত আদায় করা: বিশেষ করে নামাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং আল্লাহর নির্দেশিত দায়িত্বগুলো যথাসাধ্য পালন করা।
- গুনাহ থেকে তওবা করা: অন্যের অধিকার নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া।
- সুরা মুলকসহ কুরআন তিলাওয়াত করা: নিয়মিত তিলাওয়াতের পাশাপাশি অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করা।
- মৃত্যু ও আখিরাতের কথা স্মরণ করা: দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে আচ্ছন্ন না হয়ে পরকালের প্রস্তুতি নেওয়া।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ইমানের ওপর অবিচল রাখুন, কবরের ফিতনা থেকে রক্ষা করুন এবং আখিরাতে সফলতা দান করুন। আমিন।

