টিস্যু ছাড়াই শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করলে পবিত্রতা অর্জন হবে কি?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি বিষয়ে ইসলাম পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে প্রস্রাব-পায়খানার পর পবিত্রতা অর্জন করা ইবাদতের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ক্ষেত্রে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— টিস্যু, ঢিলা বা অন্য কোনো শুকনো বস্তু ব্যবহার না করে শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করলে কি শরীর পবিত্র হবে? নাকি আগে টিস্যু ব্যবহার করে পরে পানি ব্যবহার করা জরুরি?
হ্যাঁ, টিস্যু বা অন্য কোনো শুকনো বস্তু ব্যবহার না করেও শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করলে পবিত্রতা অর্জিত হয়। শর্ত হলো, নাপাকি যথাযথভাবে দূর করতে হবে এবং পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান মেনে চলতে হবে। পানি দিয়ে নাপাকি দূর করা ইস্তিঞ্জার স্বীকৃত পদ্ধতি। তবে শুকনো বস্তু দিয়ে মুছে নেওয়ার পর পানি ব্যবহার করাও উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত।
ইস্তিঞ্জা করার মূল উদ্দেশ্য হলো— প্রস্রাব-পায়খানার পর সংশ্লিষ্ট স্থান থেকে নাপাকি দূর করা। এ জন্য শরিয়তে পানি ব্যবহারের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্তে ঢিলা, পাথর বা এ ধরনের উপযোগী শুকনো বস্তু দিয়ে পরিষ্কার করার অনুমতিও রয়েছে।
পবিত্রতা অর্জনে পানি ব্যবহারের বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনা
পবিত্রতা অর্জনে পানির গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُم مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُم بِهِ
‘আর তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, যাতে তা দিয়ে তোমাদের পবিত্র করেন।’ (সুরা আল-আনফাল: আয়াত ১১)
এ আয়াত থেকে পবিত্রতা অর্জনে পানির গুরুত্ব বোঝা যায়। ইস্তিঞ্জার ক্ষেত্রেও পানি দিয়ে নাপাকি দূর করা শরিয়তসম্মত একটি পদ্ধতি।
হাদিসে শুকনো বস্তু দিয়ে ইস্তিঞ্জার নির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইস্তিঞ্জার জন্য পাথর বা অনুরূপ উপযোগী শুকনো বস্তু ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে—
إِذَا ذَهَبَ أَحَدُكُمْ إِلَى الْغَائِطِ فَلْيَذْهَبْ مَعَهُ بِثَلَاثَةِ أَحْجَارٍ يَسْتَطِيبُ بِهِنَّ فَإِنَّهَا تُجْزِئُ عَنْهُ
‘তোমাদের কেউ পায়খানায় গেলে সে যেন সঙ্গে তিনটি পাথর নিয়ে যায় এবং সেগুলো দিয়ে পরিষ্কার হয়। এগুলো তার জন্য যথেষ্ট হবে।’ (আবু দাউদ ৪০)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শরিয়তে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পানি ছাড়াও উপযোগী শুকনো বস্তু দিয়ে ইস্তিঞ্জা করার বিধান রয়েছে। তাই টিস্যু ব্যবহার না করাকে পবিত্রতা অর্জনের বাধ্যতামূলক শর্ত মনে করা ঠিক নয়।
যেসব বস্তু দিয়ে ইস্তিঞ্জা করা নিষিদ্ধ
ইস্তিঞ্জার ক্ষেত্রে সব ধরনের শুকনো বস্তু ব্যবহার করা যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) গোবর ও হাড় দিয়ে ইস্তিঞ্জা করতে নিষেধ করেছেন। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে—
لَا تَسْتَنْجُوا بِالرَّوْثِ وَلَا بِالْعِظَامِ
‘তোমরা গোবর ও হাড় দিয়ে ইস্তিঞ্জা করবে না।’ (ইবনে মাজাহ ৩১৪)
অতএব, শুকনো বস্তু দিয়ে ইস্তিঞ্জা করার অনুমতি থাকলেও তা উপযুক্ত ও শরিয়তসম্মত বস্তু হতে হবে। টিস্যু বা এ ধরনের পরিষ্কার উপযোগী বস্তু ব্যবহার করা যেতে পারে।
পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জনকারীদের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা
পবিত্রতা অর্জনের ব্যাপারে কুবাবাসী আনসারদের বিশেষ অভ্যাসের প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُوا ۚ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
‘সেখানে এমন লোক রয়েছে, যারা পবিত্রতা অর্জন করতে ভালোবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আত-তওবা: আয়াত ১০৮)
কুবাবাসীরা পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করতেন। এ আয়াত পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার প্রতি তাঁদের আগ্রহের প্রশংসা করে। আয়াতটি আমাদের শেখায়, শারীরিক পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জন একজন মুমিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জার বিষয়ে ফিকহবিদদের মতামত
ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করলেও পবিত্রতা অর্জিত হয়। মূল বিবেচ্য বিষয় হলো, নাপাকি দূর হয়েছে কি না। নাপাকি দূর হয়ে গেলে শুধু পানি ব্যবহারের কারণে পবিত্রতা অসম্পূর্ণ থেকে যায় না।
তবে প্রস্রাবের পর কারও কারও ক্ষেত্রে কিছুক্ষণ পর ফোঁটা বের হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে প্রস্রাব বন্ধ হয়েছে। এরপর পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। অযথা অতিরিক্ত সন্দেহ বা বারবার পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
ঢিলা বা টিস্যু দিয়ে প্রথমে মুছে নিয়ে পরে পানি ব্যবহার করলে নাপাকি দূর করা সহজ হতে পারে। তাই এ পদ্ধতি উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ পরিচ্ছন্নতার একটি প্রচলিত উপায়। তবে টিস্যু ব্যবহার না করে সরাসরি পানি দিয়ে পরিষ্কার করলেও পবিত্রতা অর্জিত হবে।
দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া
দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ‘হ্যাঁ! কেবল পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করা শরীয়তসম্মতভাবে জায়েজ। তবে উত্তম হলো আগে কিছুক্ষণ বসে ইস্তিবরা করে নেওয়া, যাতে ফোঁটা না থাকে। তারপর পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা। আর যদি আগে ঢিলা বা টিস্যু ব্যবহার করে পরে পানি দিয়ে ধোয়া হয়, তবে সেটিই সর্বোত্তম ও পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি।’
- ইস্তিঞ্জা করার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
- শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করা জায়েজ; টিস্যু ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক নয়।
- পানি দিয়ে সংশ্লিষ্ট স্থান ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে, যাতে নাপাকি দূর হয়।
- প্রস্রাবের পর ফোঁটা পড়ার আশঙ্কা থাকলে স্বাভাবিকভাবে নিশ্চিত হয়ে তারপর পরিষ্কার হতে হবে।
- টিস্যু বা উপযোগী শুকনো বস্তু দিয়ে মুছে নিয়ে পরে পানি ব্যবহার করাও উত্তম পদ্ধতি।
- পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে অযথা সন্দেহ, অতিরিক্ত পরীক্ষা কিংবা কষ্টসাধ্য আচরণ থেকে বিরত থাকা উচিত।
ইসলামে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো নাপাকি দূর করা। তাই টিস্যু, ঢিলা বা অন্য কোনো শুকনো বস্তু ব্যবহার না করেও শুধু পানি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করলে পবিত্রতা অর্জিত হয়। এ ক্ষেত্রে টিস্যু ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রথমে উপযোগী শুকনো বস্তু দিয়ে মুছে নিয়ে পরে পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া পরিচ্ছন্নতার একটি উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি।
সুতরাং, কেউ যদি শুধু পানি দিয়ে যথাযথভাবে ইস্তিঞ্জা করেন এবং নাপাকি দূর হয়ে যায়, তাহলে তার পবিত্রতা নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। ইসলামের শিক্ষা হলো— সহজতা বজায় রেখে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জন করা এবং শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।

