শুধু সম্পদ বৃদ্ধির নামই কি বরকত?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমরা সাধারণত মনে করি, বেশি অর্থ-সম্পদ, বড় বাড়ি, বিলাসবহুল জীবন কিংবা সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তিই সুখ ও সফলতার পরিচয়। অথচ বাস্তবতা হলো, অনেকের কাছে প্রচুর সম্পদ থাকলেও শান্তি নেই; আবার কেউ অল্প আয়ে, সীমিত সামর্থ্যে থেকেও পরিপূর্ণ তৃপ্তি ও স্বস্তির জীবন যাপন করেন। ইসলামের ভাষায় এই অদৃশ্য কল্যাণ, স্থায়ী মঙ্গল ও প্রশান্তির নামই হলো বরকত।
বরকত এমন এক মহান নিয়ামত, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জীবনে দান করেন। এটি শুধু সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি নয়; বরং সম্পদ, সময়, স্বাস্থ্য, সম্পর্ক ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কল্যাণ ও উপকারিতা বৃদ্ধি পাওয়ার নাম। যে জীবনে বরকত থাকে, সেখানে অল্পও অনেক হয়ে যায়; আর বরকতহীন জীবনে অনেকও অপ্রতুল মনে হয়।
১. সুস্থতা ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য—বরকতের এক উজ্জ্বল নিদর্শন
বরকত হলো এমন স্বাস্থ্য, যার কারণে বছরের পর বছর ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। সুস্থ শরীর আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি। অনেক মানুষ বিপুল অর্থ ব্যয় করেও সুস্থতা ফিরে পান না, আবার অনেকেই সাধারণ জীবনযাপন করেও আল্লাহর রহমতে সুস্থ থাকেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ
‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত হয়— সুস্থতা এবং অবসর সময়।’ (বুখারি ৬৪১২)
যে ব্যক্তি সুস্থতার কদর করে এবং আল্লাহর আনুগত্যে তা ব্যবহার করে, তার জীবনে স্বাস্থ্যও বরকতের উৎস হয়ে ওঠে।
২. অল্প আয়ে অধিক প্রয়োজন পূরণ হওয়া— বরকতের বাস্তব রূপ
অনেক পরিবার আছে, যাদের আয় সীমিত কিন্তু সংসারের প্রয়োজন মিটে যায় সুন্দরভাবে। আবার কারও আয় অনেক বেশি, তবুও মাস শেষ হওয়ার আগেই অভাব দেখা দেয়। পার্থক্যটি প্রায়ই বরকতের। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
‘যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সুরা আল-আ’রাফ: আয়াত ৯৬)
অর্থের পরিমাণ নয়, বরং অর্থের মধ্যে আল্লাহর বরকত থাকাই প্রকৃত সমৃদ্ধির পরিচয়।
৩. জিনিসপত্রের দীর্ঘস্থায়িত্ব— বরকতের নীরব প্রকাশ
একটি ঘরের আসবাবপত্র, প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহার্য বস্তু বছরের পর বছর টিকে থাকা বরকতেরই অংশ। বরকত থাকলে অল্প সম্পদও দীর্ঘদিন উপকার দেয়। আজকের ভোগবাদী সমাজে মানুষ প্রায়ই নতুন জিনিস কেনার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। কিন্তু প্রকৃত কল্যাণ নতুন জিনিসের আধিক্যে নয়; বরং বিদ্যমান সম্পদের যথাযথ উপকারিতা ও স্থায়িত্বে।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য উপার্জিত ও ব্যবহৃত সম্পদে বরকত নেমে আসে, ফলে তা মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়ে ওঠে।
৪. ছোট ঘর, সীমিত সম্পদ; তবুও হৃদয়জুড়ে শান্তি
বরকতের অন্যতম বড় নিদর্শন হলো পারিবারিক প্রশান্তি। অনেক বড় বাড়িতে অশান্তি বিরাজ করে, আবার ছোট্ট ঘরেও থাকে সুখ, ভালোবাসা ও মানসিক স্বস্তি। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রা’দ: আয়াত ২৮)
বাস্তবিক অর্থে, শান্তি অর্থ দিয়ে কেনা যায় না; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত বরকত।
৫. কম মানুষ, কিন্তু সত্যিকারের মানুষ— এটিও বরকত
জীবনে অনেক পরিচিত মানুষ থাকা জরুরি নয়; বরং কয়েকজন বিশ্বস্ত, আন্তরিক ও কল্যাণকামী মানুষের উপস্থিতিই বড় সম্পদ। সুসময়ে সবাই পাশে থাকে, কিন্তু দুঃসময়ে যারা হাত ধরে রাখে, তারাই প্রকৃত বন্ধু। এমন সম্পর্কও আল্লাহর বিশেষ বরকত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকের উচিত, সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে তা লক্ষ্য করা।’ (আবু দাউদ ৪৮৩৩, তিরমিজি ২৩৭৮)
সৎ ও বিশ্বস্ত মানুষের সান্নিধ্য জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বরকত।
৬. বরকত মানে তৃপ্তি, সহজতা ও অন্তরের প্রাচুর্য
বরকত শুধু সম্পদের বৃদ্ধি নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কল্যাণের বিস্তার। বরকত থাকলে —
- অল্প সম্পদেও তৃপ্তি আসে।
- কঠিন কাজ সহজ হয়ে যায়।
- সময়ের সদ্ব্যবহার সম্ভব হয়।
- পরিবারে ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
- জীবনে মানসিক প্রশান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ وَلَكِنَّ الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ
‘প্রকৃত ধন-সম্পদ বেশি সম্পত্তির নাম নয়; বরং প্রকৃত সম্পদ হলো অন্তরের প্রাচুর্য।’ (বুখারি ৬৪৪৬, মুসলিম ১০৫১)
বরকত এমন এক অমূল্য নিয়ামত, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু জীবনের প্রতিটি স্তরে অনুভব করা যায়। সুস্থতা, তৃপ্তি, পারিবারিক শান্তি, বিশ্বস্ত সম্পর্ক, সময়ের সদ্ব্যবহার এবং অল্প সম্পদে অধিক কল্যাণ— এসবই বরকতের বহিঃপ্রকাশ।
তাই আমাদের লক্ষ্য শুধু সম্পদ বৃদ্ধি নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে জীবনে বরকত লাভ করা। কারণ বরকত থাকলে অল্পও যথেষ্ট হয়ে যায়, আর বরকত না থাকলে অনেক কিছু থাকলেও হৃদয় শূন্য থেকে যায়।
হে আল্লাহ! আমাদের রিজিক, সময়, পরিবার, স্বাস্থ্য এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বরকত দান করুন। আমিন।

