অবৈধ সম্পর্ক কি রিজিকে বরকত কমিয়ে দেয়?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অনেক মানুষ প্রচুর অর্থ উপার্জন করেও মানসিক অশান্তিতে ভোগেন। আবার কেউ সীমিত আয়েও পরিবার, জীবন ও প্রাপ্ত নিয়ামত নিয়ে তৃপ্ত থাকেন। এর কারণ, রিজিকের বরকত মানে শুধু অর্থের পরিমাণ বেশি হওয়া নয়; বরং উপার্জন দিয়ে প্রয়োজন পূরণ, পরিবারে শান্তি, সুস্থতা, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং সম্পদ কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার সামর্থ্যও বরকতের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
এখন প্রশ্ন হলো— বিয়েবহির্ভূত প্রেমের সম্পর্ক বা হারাম রিলেশনে জড়িয়ে পড়লে কি আয়-রোজগারের বরকত কমে যায়? এ বিষয়ে কুরআন-হাদিসের শিক্ষা কী? ইসলামের দৃষ্টিতে পাপ, তাকওয়া, হালাল উপার্জন ও অন্তরের প্রশান্তির মধ্যে কী সম্পর্ক রয়েছে?
বিষয়টি বুঝতে হলে কুরআন-হাদিসের নির্দেশনা এবং পাপের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কারও আর্থিক সংকট দেখেই তাকে পাপী মনে করা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট পাপের কারণে তার আয় কমেছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
১. হারাম সম্পর্ক কেন নিষিদ্ধ?
ইসলামে ভালোবাসা নিষিদ্ধ নয়। স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, বিয়ের উদ্দেশ্যে কাউকে পছন্দ করা এবং বৈধ উপায়ে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার সুযোগ রয়েছে। তবে ভালোবাসার নামে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৩২)
এ আয়াতে শুধু ব্যভিচার থেকে নিষেধ করা হয়নি, বরং এর কাছাকাছি নিয়ে যায় এমন পথ থেকেও দূরে থাকতে বলা হয়েছে। তাই কোনো সম্পর্কের মধ্যে অবৈধ শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, অশ্লীল আচরণ কিংবা অন্য নিষিদ্ধ কাজ থাকলে তা থেকে বিরত থাকা জরুরি। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩০)
এর পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত রাখা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِهِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَهُنَّ
‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)
অতএব, বিয়ের ইচ্ছা থাকলেই সম্পর্কের সব আচরণ বৈধ হয়ে যায় না। সম্পর্কের ধরন, আচরণ ও সীমারেখা ইসলামের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
২. পাপ কি রিজিকের বরকত কমিয়ে দিতে পারে?
কুরআন-হাদিসে আল্লাহর আনুগত্য, তাকওয়া এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাপ মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন ও পরিণতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রতিটি পাপের পরই আয় কমে যাবে কিংবা আর্থিক সংকট দেখা দেবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
‘আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।’ (সুরা আল-আ'রাফ: আয়াত ৯৬)
এই আয়াতে ইমান ও তাকওয়ার সঙ্গে বরকতের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর বিধান মেনে চলা, পাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا
‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে সংকুচিত।’ (সুরা ত্ব-হা: আয়াত ১২৪)
এ আয়াত আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর নির্দেশনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে। অর্থসম্পদ থাকা সত্ত্বেও মানুষের জীবনে অতৃপ্তি, অস্থিরতা ও অশান্তি থাকতে পারে। তবে কারও আর্থিক সংকট কিংবা মানসিক কষ্টকে তার পাপের শাস্তি বলে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
৩. পাপের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়ে হাদিস
এ বিষয়ে হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ ইবনে মাজাহর একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়। হজরত সওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
‘একজন ব্যক্তি তার কৃত পাপের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হতে পারে।’ (ইবনে মাজাহ ৪০২২)
৪. হারাম সম্পর্ক জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?
কোনো সম্পর্ক যদি গোপনীয়তা, মিথ্যা, প্রতারণা, অতিরিক্ত আসক্তি কিংবা নিষিদ্ধ আচরণের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে তা ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন—
- মানসিক অস্থিরতা: সম্পর্ক নিয়ে দুশ্চিন্তা, অপরাধবোধ কিংবা অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
- সময় নষ্ট: অতিরিক্ত কথোপকথন, যোগাযোগ কিংবা সম্পর্ক নিয়ে ব্যস্ততার কারণে কাজ ও দায়িত্বে অবহেলা হতে পারে।
- কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া: ব্যক্তিগত অস্থিরতা পড়াশোনা, চাকরি বা ব্যবসায় মনোযোগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
- পারিবারিক দ্বন্দ্ব: মিথ্যা, গোপনীয়তা কিংবা প্রতারণার কারণে পরিবারে বিশ্বাসের সংকট তৈরি হতে পারে।
- আর্থিক সিদ্ধান্তে ভুল: আবেগের বশে অপ্রয়োজনীয় খরচ কিংবা দায়িত্বহীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে এগুলো সম্ভাব্য প্রভাব; প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটবেই, তা নয়। সম্পর্কের ধরন ও ব্যক্তির পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা আর-রা'দ: আয়াত ২৮)
অন্তরের প্রশান্তিও মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। তাই কোনো সম্পর্ক যদি আল্লাহর অবাধ্যতা, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা মানসিক অস্থিরতার কারণ হয়, তবে নিজের আচরণ ও সম্পর্কের ধরন নিয়ে আন্তরিকভাবে ভাবা প্রয়োজন।
৫. তওবা করলে কি আল্লাহর রহমত ও কল্যাণের আশা করা যায়?
কেউ হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লেও তার জন্য তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। ভুল বুঝতে পারলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা, গুনাহ পরিত্যাগ করা এবং পুনরায় সেই পাপে না ফেরার সংকল্প করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
‘বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৫৩)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, ভুল যত বড়ই হয়ে থাকুক, আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের আশা করা উচিত। আল্লাহ তাআলা নুহ (আ.)-এর উপদেশের কথা উল্লেখ করে বলেন—
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا
‘আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান সৃষ্টি করবেন ও নদ-নদী প্রবাহিত করবেন।’ (সুরা নুহ: আয়াত ১০–১২)
এ আয়াতগুলোতে ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর অনুগ্রহের কথা এসেছে। তাই ভুল বুঝতে পারলে আন্তরিক তাওবা করে জীবন সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। তবে তওবা করলেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আয় বেড়ে যাবে— এমন নিশ্চয়তা আয়াতগুলো দেয় না।
দুজনের মধ্যে বিয়ের বাস্তব সুযোগ থাকলে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর বিয়ে সম্ভব না হলে নিষিদ্ধ আচরণ থেকে সরে আসা এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমা মেনে চলা উচিত।
৬. আয়-রোজগারে বরকত চাইলে কী করবেন?
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জীবনে কল্যাণ কামনার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। তাহলো—
- হারাম থেকে বেঁচে থাকুন: সম্পর্কের ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা মেনে চলুন। দৃষ্টি সংযত রাখুন এবং নিষিদ্ধ আচরণ থেকে দূরে থাকুন।
- আন্তরিক তওবা করুন: ভুল হয়ে গেলে তা স্বীকার করুন, গুনাহ ছেড়ে দিন এবং পুনরায় সেই কাজে না ফেরার সংকল্প করুন।
- হালাল উপার্জন করুন: প্রতারণা, সুদ ও অন্যায় উপায়ে আয় করা থেকে বিরত থাকুন। ব্যবসা ও চাকরিতে সততা বজায় রাখুন এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করুন।
- নামাজ ও আল্লাহর স্মরণে যত্নবান হোন: নিয়মিত নামাজ আদায় করুন, কুরআন তিলাওয়াত করুন এবং আল্লাহর কাছে হেদায়েত ও কল্যাণ প্রার্থনা করুন।
- দান-সদকা করুন: সামর্থ্য অনুযায়ী দান করুন, অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং সম্পদের প্রাপ্য হক আদায় করুন।
- নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন: সময়, সুস্থতা, পরিবার ও সম্পদকে কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করুন। অল্প প্রাপ্তিতেও কৃতজ্ঞ থাকুন এবং বৈধ উপায়ে জীবিকা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।
হারাম রিলেশন বা নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া ইসলামের নির্দেশনার পরিপন্থি হলে তা থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। কুরআন-হাদিস আমাদের তাকওয়া অবলম্বন, হালাল উপার্জন, আল্লাহর স্মরণ এবং আন্তরিক তওবার শিক্ষা দেয়। পাপ মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, আর মানসিক অস্থিরতা ও দায়িত্বে অবহেলা বাস্তব জীবনেও নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, বেশি আয় মানেই বেশি বরকত নয়, আবার আর্থিক সংকট মানেই আল্লাহর অসন্তুষ্টির প্রমাণও নয়। মানুষের জীবনে সচ্ছলতা ও অভাব— উভয় অবস্থাই আসতে পারে। তাই অন্যের অবস্থা দেখে তার পাপ বা আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক সম্পর্কে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজের জীবন সংশোধনে মনোযোগী হওয়া উচিত।
আসুন, আমরা হালাল পথে উপার্জন করি, আল্লাহর নির্ধারিত সীমা মেনে চলি, ভুল হলে আন্তরিকভাবে তাওবা করি এবং জীবনের প্রতিটি নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকি। আল্লাহ আমাদের উপার্জনে হালাল ও বরকত দান করুন, অন্তরে প্রশান্তি দিন এবং সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।

