ইসলাম কী বলে
পারিবারিকভাবে কি জন্মদিন পালন করা যাবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবনের প্রতিটি নতুন বছর আমাদের বয়স এক ধাপ বাড়িয়ে দেয় এবং নশ্বর জীবনের আয়ু থেকে ঝরিয়ে দেয় একটি করে উজ্জ্বল বছর। সন্তান বা পরিবারের কারো জন্মদিনে মনের অজান্তেই ভালোলাগা কাজ করে। অনেকেই ভেবে থাকেন— বড় কোনো আয়োজন না করে কেবল পরিবারের কাছের মানুষদের নিয়ে ঘরোয়াভাবে দিনটি উদযাপিত হলে হয়তো কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু ইসলামি জীবনব্যবস্থায় একজন মুমিনের প্রতিটি আনন্দের প্রকাশ এবং দিন উদযাপনের জন্য রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য ও শালীনতার রূপরেখা। আসুন, সুন্দর ও সহজভাবে জেনে নিই পরিবার নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে জন্মদিন পালনের বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের মতামত ও মূল বার্তা কী?
জন্মদিন পালন কি ইসলামি সংস্কৃতির অংশ?
জন্মদিন জাকজমকভাবে কিংবা ঘরোয়া পরিবেশে উদযাপনের যে প্রথা আজ আমাদের সমাজে প্রচলিত, তা ইসলামি সংস্কৃতির মূলধারার অংশ নয়। ঐতিহাসিকভাবে এটি মূলত অমুসলিম ও খ্রিস্টীয় সংস্কৃতি থেকে এসেছে। তাই তাদের রীতি অনুসরণে জন্মদিন উদযাপন করা নাজায়েজ।
ইসলামি শরিয়তের নীতি অনুযায়ী, ইবাদত বা উদযাপনের ক্ষেত্রে অমুসলিমদের ধর্মানুষ্ঠান কিংবা বিশেষ সামাজিক কালচার হুবহু অনুসরণ করা অনুচিত। তাই কেক কাটা, মোমবাতি নেভানো বা শুভকামনার নামে বিজাতীয় প্রথা মেনে ঘরোয়াভাবে হলেও জন্মদিন পালন করা থেকে বিরত থাকা উত্তম।
সৃষ্টির মহান রবের দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
জন্মদিন মানেই আনন্দ আর উদযাপনের প্রথা নয়; বরং এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতের কথা। একজন ইমানদারের জন্য জন্মের দিনে আল্লাহর মহান দরবারে শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ। তবে সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপায়টি হতে হবে সম্পূর্ণ ইসলামি ধাঁচে, বিধর্মীদের রীতিনীতি পরিহার করে।
মহানবী (সা.) নিজের জন্মদিনের আমল কীভাবে করতেন, তা নিচের হাদিস থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
১. জন্মদিনে নবিজি (সা.)-এর আমল: রোজা ও কৃতজ্ঞতা
রাসুলুল্লাহ (সা.-কে যখন তার জন্মদিনের বিশেষ আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি কীভাবে আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন, তা হাদিসে এসেছে এভাবে, হজরত আবু ক্বাতাদা আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত—
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الاِثْنَيْنِ، قالَ: "فِيهِ وُلِدْتُ، وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَيَّ القُرْآنُ
‘আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে সোমবারের রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর পবিত্র কুরআন নাজিল করা হয়েছে।’ (মুসলিম ২৮০৭, আবু দাউদ ২৪২৬, ইবনে খুজাইমা ২১১৭, মুসনাদে আহমাদ ২২৫৫০)
শিক্ষা: নিজের জন্মের দিনে গান-বাজনা বা কেক কাটার উৎসব না করে রোজা রাখা, দান-সদকা করা এবং নফল ইবাদতের মাধ্যমে রবের দরবারে শুকরিয়া আদায় করাই সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি।
২. বিজাতীয় প্রথা অনুকরণের ব্যাপারে সতর্কতা
অন্য জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি বা উদযাপনের রীতি অনুকরণ করার বিষয়ে নবীজি (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন—
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি যে জাতির বা সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য ও রীতি অনুসরণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ ৪০৩১)
৩. হাদিস বিশারদদের ব্যাখ্যা
বর্ণিত হাদিসের আলোকে বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ লিখেছেন—
هَذَا عَامٌّ فِي الْخَلْقِ وَالْخُلُقِ وَالشِّعَارِ
‘এই বিধান বা সতর্কতাটি মানুষের শারীরিক অবয়ব, পোশাক-আশাক, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা বা চিহ্নের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য।’ (মিরকাতুল মাফাতিহ কিতাবুল লিবাস ৪/৪৩)
প্রতিটি জন্মদিন এলে তা আনন্দের চেয়েও বেশি আত্মউপলব্ধির সময়। নতুন একটি বছরে পদার্পণ মানেই আমাদের জীবন থেকে একটি বছর ঝরে যাওয়া এবং পরকালের হিসাবের খাতাটি আরও এক ধাপ কাছে চলে আসা। তাই পরিবার নিয়ে মোমবাতি জ্বালানো বা কেক কাটার মতো প্রথা এড়িয়ে চলাই ইমানের দাবি। তার বদলে আমরা পারি পরিবারের সবাইকে নিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে, নফল নামাজ ও রোজা রেখে জীবনের অনাগত দিনগুলোর জন্য হেদায়াত চাইতে এবং অভাবগ্রস্তদের মাঝে খাবার বিলিয়ে শুকরিয়া আদায় করতে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর আনুগত্যে কাটানোর মাঝেই রয়েছে সত্যিকারের সার্থকতা ও আত্মিক প্রশান্তি।

