Logo
Logo
×
   

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

গ্যাস পানি ও বিদ্যুৎ বিল ফাঁকি দিলে কি গুনাহ হবে?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম

গ্যাস পানি ও বিদ্যুৎ বিল ফাঁকি দিলে কি গুনাহ হবে?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা ওয়াসার পানি— এসবই রাষ্ট্রীয় ও জনকল্যাণমূলক সম্পদ। অনেক সময় অসচেতনতা বা সাময়িক লাভের আশায় অনেকেই এগুলো ব্যবহারে অসাধু উপায় অবলম্বন করেন বা প্রকৃত বিল প্রদান থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রতিটি নাগরিকের ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় পাওনা বা বিল পরিশোধ করা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি ইমানি ও নৈতিক কর্তব্য।

আসুন, অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় জেনে নিই রাষ্ট্রীয় পরিষেবার বিল ফাঁকি দেওয়া এবং এই কাজে অসাধু উপায় বা ঘুষ অবলম্বনের বিষয়ে ইসলামের স্পষ্ট বার্তা।

বিল না দেওয়া বা কম দেওয়া: আত্মসাতের শামিল

বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা ওয়াসার পানি যথাযথ কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমতি নিয়ে নিয়মমাফিক ব্যবহার করা যেমন আবশ্যক, তেমনি ব্যবহার শেষে নির্ধারিত পূর্ণ বিল পরিশোধ করাও শরিয়ত অনুযায়ী ওয়াজিব বা অবশ্যকর্তব্য।

সরকারি পরিষেবা গ্রহণের পর যে বিল গ্রাহকের ওপর ধার্য করা হয়, তা কোনো অজুহাতে না দেওয়া, বিলের কাগজ পরিবর্তন করা কিংবা প্রকৃত বিলের চেয়ে কম টাকা দিয়ে ফাঁকি দেওয়া— কঠোর অপরাধ। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, এটি অন্য মানুষের হক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবৈধভাবে আত্মসাতের শামিল, যা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি জঘন্য ‘কবিরা গুনাহ’ (মহাপাপ)। সাধারণ কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি চুরি বা আত্মসাৎ করা যেমন অন্যায়, রাষ্ট্রের বিপুল সাধারণ জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করা তার চেয়েও মারাত্মক ও ভয়ংকর অপরাধ।

বিল কমাতে অসদুপায় ও ঘুষের ভয়াবহতা

বিলের কাগজ নিয়ে আসা অসাধু কর্মীকে কিছু টাকা দিয়ে ১০০০ টাকার বিল ২০০ টাকা করে নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও শরিয়তবিরুদ্ধ। বাহ্যিকভাবে এটিকে ‘কৌশল’ মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে এটি একটি ঘুষ লেনদেন এবং জালিয়াতি।

ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া দুটিই স্বতন্ত্র কবিরা গুনাহ। অসাধু উপায়ে বিল কম দেখিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎ করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি একই সাথে দুটি গুরুতর পাপে লিপ্ত হন—

১. রাষ্ট্র তথা পুরো দেশের মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ।

২. ঘুষ দেওয়া ও জালিয়াতির পাপ।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে অপরাধের পরিণতি

ইসলামে অপরের হক মারা এবং দায়িত্ব পালনে অসাধুতা অবলম্বনের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

১. রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের শাস্তি

কোনো সরকারি দায়িত্ব বা সরকারি সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুতা বা সুচের মতো সামান্য বস্তুও যদি আত্মসাৎ বা গোপন করা হয়, তবে কিয়ামতের দিন তা কঠিন বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আদি ইবনে উমাইরা আল-কিন্দি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি—

مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ مِنْكُمْ عَلَى عَمَلٍ، فَكَتَمَنَا مَخِيطًا فَمَا فَوْقَهُ، كَانَ غُلُولًا يَأْتِي بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

অর্থ: ‘আমি তোমাদের যাকে কোনো সরকারি কাজে নিযুক্ত করলাম, অতঃপর সে যদি একটি সুচ কিংবা তার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো বস্তু আত্মসাৎ করে বা গোপন করে, তবে তা হবে খেয়ানত বা আত্মসাৎ; যা সে কিয়ামতের দিন বহন করে নিয়ে আসবে।’ (মুসলিম ১৮৩, আবু দাউদ, বুখারি ৩১১৮)

২. ঘুষ দেওয়া ও নেওয়ার পরিণাম

ঘুষের লেনদেন সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করে এবং মানুষের হৃদয়ে পাপের অন্ধকার ছড়িয়ে দেয়। নবীজি (সা.) ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ওপর অভিসম্পাত করেছেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ

‘আল্লাহর রাসুল (সা.) ঘুষদাতা (যে ঘুষ দেয়) এবং ঘুষগ্রহীতা (যে ঘুষ নেয়)— উভয়ের ওপর অভিসম্পাত (লানত) করেছেন।’ (আবু দাউদ ৩৫৮০, তিরমিজি ১৩৩৭)

৩. ফিকহ ও শরিয়তের কিতাবের সিদ্ধান্ত

বিখ্যাত ইসলামি ফিকহগ্রন্থ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থে এসেছে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা জনগণের মালিকানাধীন সম্পদ কোনো অসদুপায়ে আত্মসাৎ করা সাধারণ চুরির চেয়েও অধিক ক্ষতিকর, কারণ এতে গোটা দেশের মানুষের হক জড়িত থাকে। (কিতাবুল আমওয়াল (আবু উবায়েদ) ৬৬৫; ফাতহুল বারি (ইবনে হাজার আসকালানি), খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৫৩; আদ্দুররুল মুখতার, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৮৩)

ভুল সংশোধনের উপায় ও মুক্তির পথ

অতীতে না বুঝে বা শরিয়তের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে যদি এমন অন্যায় হয়ে থাকে, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ইসলাম অনুশোচনার পথ খোলা রেখেছে—

১. তওবা করা

কৃতকর্মের জন্য মন থেকে অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে অঝোরে তওবা ও ইস্তেগফার করতে হবে।

২. পাওনা বকেয়া পরিশোধ করা

অসাধু উপায়ে যেসব বিল কম দেওয়া হয়েছে বা ফাঁকি দেওয়া হয়েছে, সেই আনুমানিক বকেয়া টাকা ওয়াসা, বিদ্যুৎ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তহবিলে (অফিসিয়াল চালানের মাধ্যমে বা সরকারি পাওনা হিসেবে) জমা করে পরিশোধ করে দিতে হবে।

৩. ভবিষ্যতের অঙ্গীকার

ভবিষ্যতে আর কখনোই ঘুষ দেওয়া বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ফাঁকি দেওয়ার মতো কাজে জড়িত না হওয়ার সুদৃঢ় সংকল্প করতে হবে।

খাঁটি ঈমানের পরিচয়

হালাল রিজিক এবং সততার মাধ্যমে অর্জিত জীবনই একজন মুমিনের আসল সৌন্দর্য। সাময়িক কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। আসুন, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পরিষেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা শতভাগ সৎ ও দায়িত্বশীল হই। প্রতিটি পাই-পয়সার সঠিক বিল পরিশোধ করে নিজেদের রিজিককে সম্পূর্ণ পবিত্র রাখি এবং মহান আল্লাহর অসন্তোষ থেকে নিজেদের রক্ষা করি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম