Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

অভিভাবকের অমতে পালিয়ে বিয়ে, ইসলামী শরিয়তে বৈধতার বিধান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

অভিভাবকের অমতে পালিয়ে বিয়ে, ইসলামী শরিয়তে বৈধতার বিধান

Advertisement

ভালোবাসার সম্পর্ক থেকে পিতা-মাতার অমতে পালিয়ে বিয়ের ঘটনা সমাজে নতুন নয়। তবে এ ধরনের বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়তের বিধান নিয়ে অনেক সময় বিভ্রান্তি দেখা যায়।

বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো মুসলিম নারী পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া বাড়ি থেকে চলে গিয়ে কোনো মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করলে সেই নিকাহের বৈধতা কী হবে এ বিষয়ে ইসলামী ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে।

বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে প্রথমেই ‘পিতা-মাতার অনুমতি’ এবং ‘ওলির অনুমতি’কে পৃথকভাবে দেখতে হবে। পিতা-মাতার সম্মতি পারিবারিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা ও অধিকার অত্যন্ত উচ্চ। তবে নিকাহের বৈধতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফিকহে মূল আলোচনা হয়েছে নারীর শরিয়তসম্মত ওলি এবং নিকাহের অন্যান্য শর্ত নিয়ে। তাই শুধু পিতা-মাতা রাজি ছিলেন না এই একটি তথ্যের ভিত্তিতে কোনো নিকাহকে সর্বক্ষেত্রে অবৈধ ঘোষণা করা ফিকহসম্মত নয়।

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘ওলি ছাড়া নিকাহ নেই।’ এ মর্মে জামে তিরমিজিতে হজরত আবু মুসা রা. থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে এসেছে, কোনো নারী তার ওলির অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে তার নিকাহ বাতিল—এ কথা তিনবার উল্লেখ করা হয়েছে।

একই বর্ণনায় বিরোধ দেখা দিলে শাসক বা কর্তৃপক্ষকে ওলি হিসেবে গণ্য করার কথাও বলা হয়েছে। এসব হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ ফকিহ নারীর নিকাহে ওলির ভূমিকা অপরিহার্য বলে মত দিয়েছেন।

ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মত অনুযায়ী, ওলির অনুমতি ছাড়া নারীর নিকাহ সহিহ হয় না। ফলে এসব মাযহাব অনুসারে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী পিতা বা বৈধ ওলির অনুমতি ছাড়া পালিয়ে গিয়ে নিজ উদ্যোগে নিকাহ করলে সেই নিকাহ বৈধ হবে না। এখানে পালিয়ে যাওয়াটাই মূল কারণ নয়, মূল বিষয় হলো নিকাহের জন্য প্রয়োজনীয় ওলির বিধান পূরণ হয়েছে কি না।

অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা রহ. মাযহাবে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ রয়েছে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বাধীন নারী নির্দিষ্ট শর্তে নিজের নিকাহ নিজে সম্পন্ন করতে পারেন। ফলে শুধু ওলির অনুমতি না থাকার কারণে এমন নারীর নিকাহকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলা হয় না। তবে এর অর্থ কখনোই এমন নয় যে হানাফি মাযহাব পিতা-মাতাকে অমান্য করে গোপনে বা পালিয়ে বিয়েকে উৎসাহিত করেছে।

হানাফি মাযহাবেও নিকাহের অন্যান্য শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি। ইজাব ও কবুল, সাক্ষী, মোহর এবং পাত্র-পাত্রীর শরিয়তসম্মত যোগ্যতা নিশ্চিত হতে হবে। পাত্র উপযুক্ত কি না, সে বিষয়টিও ফিকহের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নারী এমন কাউকে বিয়ে করলে যিনি শরিয়তের বিবেচনায় তার উপযুক্ত নন, তখন ওলি আপত্তি উত্থাপন করতে পারেন এবং এর ফিকহি প্রভাব রয়েছে।

সুতরাং ‘হানাফি মাযহাবে মেয়েরা ওলির অনুমতি ছাড়াই যেকোনোভাবে বিয়ে করতে পারে’ এ ধরনের সরল বক্তব্য সঠিক নয়।

পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও আলাদাভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাড়ি থেকে চলে যাওয়া, নিজেদের স্বামী-স্ত্রী ঘোষণা করা কিংবা কোথাও গিয়ে একসঙ্গে বসবাস শুরু করা—এসবের কোনোটিই নিজে নিকাহের শর্ত নয়। ইসলামী নিকাহ সম্পন্ন হওয়ার জন্য শরিয়ত নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। অতএব, শুধু পালিয়ে যাওয়ার কারণে কোনো নারী-পুরুষ ইসলামী দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রী হয়ে যান না।

একই সঙ্গে নারীর সম্মতির বিষয়টিও ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, পূর্বে বিবাহিত নারীকে তার মতামত ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কুমারী নারীর কাছ থেকেও তার অনুমতি নিতে হবে। জামে তিরমিজির বর্ণনায় এ নির্দেশ স্পষ্টভাবে এসেছে। আবার সুনানে আবু দাউদে এমন একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে এক নারী তার পিতা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়েছেন বলে রাসুলুল্লাহ সা. কাছে অভিযোগ করেন। নবী সা. তার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে সিদ্ধান্তের অধিকার দেন।

এ থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলামে ওলির দায়িত্ব মেয়ের ওপর সীমাহীন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়। একইভাবে নারীর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অর্থও পরিবার ও অভিভাবকের সব পরামর্শ অগ্রাহ্য করে নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। নিকাহের ক্ষেত্রে নারী, ওলি এবং পরিবারের প্রত্যেকের অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। শরিয়তের বিধান হলো এসব অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।

পিতা-মাতার আপত্তির কারণও তাই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো পাত্রের চরিত্র খারাপ, সে মাদকাসক্ত, প্রতারক, সহিংস, দায়িত্বহীন অথবা সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত—এ ধরনের বাস্তব কারণ থাকলে পরিবারের আপত্তিকে গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা জরুরি। অন্যদিকে শুধু অর্থনৈতিক অবস্থান, বংশ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত অহংকারের কারণে উপযুক্ত পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করাও ন্যায়সংগত নয়। এ ক্ষেত্রে পরিবারের দায়িত্ব হলো মেয়ের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কল্যাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

পিতা-মাতা যদি অন্যায়ভাবে উপযুক্ত পাত্রের সঙ্গে বিয়েতে বাধা দেন, তখনও পালিয়ে যাওয়া একমাত্র সমাধান নয়। বিষয়টি পরিবারের প্রবীণ, বিশ্বস্ত ব্যক্তি এবং যোগ্য আলেমের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে। বিরোধ গুরুতর হলে শরিয়তসম্মত কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করার সুযোগও রয়েছে।

হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদিসে বিরোধের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে ওলি হিসেবে গণ্য করার যে নির্দেশ এসেছে, তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাই পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া পালিয়ে বিয়ে করার বিষয়ে ইসলামী শরিয়তের অবস্থানকে এক বাক্যে প্রকাশ করলে বলা যায়, শুধু পিতা-মাতার অনুমতি না থাকার কারণে সব নিকাহ অবৈধ হয়ে যায় না, আবার পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলেই সব নিকাহ বৈধ হয়ে যায় না। হানাফি মাযহাবে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন নারীর নির্দিষ্ট শর্তে নিজে নিকাহ করার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. মাযহাবে ওলির অনুমতি নিকাহের বৈধতার জন্য অপরিহার্য।

এ কারণে কোনো বাস্তব ঘটনায় শুধু ‘পালিয়ে বিয়ে করেছে’ এই তথ্যের ভিত্তিতে নিকাহকে বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করা শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি নয়। দেখতে হবে নারী প্রাপ্তবয়স্ক কি না, নিকাহ কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সাক্ষী ছিল কি না, মোহর নির্ধারিত হয়েছে কি না, পাত্র শরিয়তসম্মতভাবে উপযুক্ত কি না এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ওলির বিধান কীভাবে প্রযোজ্য হয়েছে।

ইসলামে বিয়ে নিছক আবেগের সম্পর্ক নয়, এটি একটি গুরুতর অঙ্গীকার। কুরআনে বৈবাহিক বন্ধনকে ‘দৃঢ় অঙ্গীকার’ বলা হয়েছে। তাই বিয়ের সিদ্ধান্তে ভালোবাসার পাশাপাশি ধর্ম, চরিত্র, দায়িত্ববোধ, পারিবারিক সামঞ্জস্য ও ভবিষ্যৎ জীবনের নিরাপত্তা বিবেচনা করা জরুরি।

সুতরাং ইসলামী শরিয়তের আলোকে পিতা-মাতার অমতে পালিয়ে বিয়ের বিষয়টি বুঝতে হলে দুটি চরম অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একদিকে ‘পিতা-মাতা রাজি না থাকলে কোনো বিয়েই বৈধ নয়’ এ বক্তব্য চার মাযহাবের পূর্ণাঙ্গ মতামত তুলে ধরে না। অন্যদিকে ‘মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলেই পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়াই যেকোনোভাবে বিয়ে করতে পারবে’ এ বক্তব্যও হানাফি ফিকহের সঠিক উপস্থাপন নয়।

শরিয়তের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হলো, নিকাহের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে, নারীর সম্মতি থাকতে হবে, ওলির বিধান সংশ্লিষ্ট ফিকহি মত অনুযায়ী বিবেচনা করতে হবে এবং পারিবারিক বিরোধ হলে সম্ভব হলে আলোচনা ও শরিয়তসম্মত মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। পালিয়ে যাওয়া কোনো নিকাহের শর্ত নয়, নিকাহ বৈধ হওয়ার মূল বিষয় হলো শরিয়ত নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ হওয়া।

অতএব, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী পিতা-মাতার অমতে পালিয়ে গিয়ে একজন মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করলে হানাফি মাযহাবের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সেই নিকাহ সহিহ হবে। কিন্তু মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাব অনুসারে ওলি ছাড়া সেই নিকাহ সহিহ হবে না।

বাস্তব কোনো ঘটনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে নিকাহের সব বিবরণ যাচাই করে সংশ্লিষ্ট মাযহাবের যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পন্থা।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

মূল্যস্ফীতির অজুহাতে ঋণের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া কি জায়েজ?

মূল্যস্ফীতির অজুহাতে ঋণের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া কি জায়েজ?

ভালো দ্বীনদার পাত্র না পেলে আজীবন অবিবাহিত থাকা কি শরিয়তসম্মত?

ভালো দ্বীনদার পাত্র না পেলে আজীবন অবিবাহিত থাকা কি শরিয়তসম্মত?

জলবায়ু পরিবর্তন ও কিয়ামতের আলামত

জলবায়ু পরিবর্তন ও কিয়ামতের আলামত

পরকীয়ায় আসক্ত বিবাহিত-অবিবাহিতের শাস্তি কী?

পরকীয়ায় আসক্ত বিবাহিত-অবিবাহিতের শাস্তি কী?

ব্যাংকারকে বিয়ে করা যাবে কি? শরীয়তের বিধান

ব্যাংকারকে বিয়ে করা যাবে কি? শরীয়তের বিধান

কেউ একজন থাকুক, যে ভালোবাসার ছায়ায় জান্নাতের পথে এগিয়ে নেবে

কেউ একজন থাকুক, যে ভালোবাসার ছায়ায় জান্নাতের পথে এগিয়ে নেবে

আরও পড়ুন

বিয়ের আগেই ভবিষ্যৎ স্ত্রীর ওপর তালাকের শর্ত দিলে কী হবে?

বিয়ের আগেই ভবিষ্যৎ স্ত্রীর ওপর তালাকের শর্ত দিলে কী হবে?

অভিভাবকের অমতে পালিয়ে বিয়ে, ইসলামী শরিয়তে বৈধতার বিধান

অভিভাবকের অমতে পালিয়ে বিয়ে, ইসলামী শরিয়তে বৈধতার বিধান

মূল্যস্ফীতির অজুহাতে ঋণের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া কি জায়েজ?

মূল্যস্ফীতির অজুহাতে ঋণের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া কি জায়েজ?

ভালো দ্বীনদার পাত্র না পেলে আজীবন অবিবাহিত থাকা কি শরিয়তসম্মত?

ভালো দ্বীনদার পাত্র না পেলে আজীবন অবিবাহিত থাকা কি শরিয়তসম্মত?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম