দুনিয়ার মোহ পেরিয়ে হৃদয়ের কাছে ফেরার গল্প ‘মোহমুক্ত হৃদয়’
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ানের নতুন বই ‘মোহমুক্ত হৃদয়’।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানুষ ছুটে চলে। কখনো প্রাপ্তির দিকে, কখনো সাফল্যের দিকে, কখনো একটু স্বাচ্ছন্দ্য, একটু নিরাপত্তা কিংবা আরও ভালো থাকার আশায়। প্রতিদিনের এই নিরন্তর ছুটে চলার ভেতর একসময় অজান্তেই আড়ালে পড়ে যায় কিছু মৌলিক প্রশ্ন—কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, কীসের জন্য এই এত আয়োজন?
পৃথিবীকে জয় করার ব্যস্ততায় মানুষ কখনো কখনো নিজের হৃদয়ের কাছ থেকেই দূরে সরে যায়। অথচ জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রাটি হয়তো বাইরের পৃথিবীর দিকে নয়, বরং নিজের ভেতরের দিকেই।
সেই অন্তর্মুখী যাত্রার কথাই মনে করিয়ে দিতে পাঠকের হাতে এসেছে তরুণ লেখক ও কলামিস্ট জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ানের নতুন বই ‘মোহমুক্ত হৃদয়’। অকীল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটিতে দুনিয়ার প্রতি মানুষের অতিরিক্ত আসক্তি, জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, পরকালীন জীবনের প্রস্তুতি এবং আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবনার পরিসর তৈরি করেছেন লেখক।
দুনিয়া মানুষের প্রয়োজন, কিন্তু হৃদয়ের চূড়ান্ত ঠিকানা নয়—এই উপলব্ধিই বইটির অন্তর্গত সুর। কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালেহিনের জীবনদর্শনের আলোকে লেখক দেখাতে চেয়েছেন, দুনিয়ার দায়িত্ব ও ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া নয়; বরং দুনিয়ার মাঝখানে থেকেও তার মোহ থেকে অন্তরকে মুক্ত রাখাই আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ।
মানুষের জীবনে প্রাপ্তির পাশাপাশি অপ্রাপ্তিও থাকে। থাকে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা, সাফল্য ও ব্যর্থতার দীর্ঘ ছায়া। এসবের মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলে জীবন। কিন্তু পার্থিব প্রাপ্তি যখন জীবনের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তখন অন্তরের গভীরে জন্ম নিতে পারে এক অদৃশ্য শূন্যতা।
‘মোহমুক্ত হৃদয়’ সেই শূন্যতার দিকে পাঠকের দৃষ্টি ফেরাতে চায়, যেখানে বাহ্যিক প্রাপ্তির হিসাব পেরিয়ে মানুষকে ভাবতে হয় নিজের অন্তরের অবস্থান নিয়ে।
বইটির পাতায় পাতায় পাঠক মুখোমুখি হন কিছু সহজ অথচ গভীর প্রশ্নের—আমরা আসলে কী নিয়ে ব্যস্ত? কোন প্রাপ্তিকে সাফল্য বলে মনে করি? আমাদের আকাঙ্ক্ষার শেষ কোথায়? যে জীবনের জন্য এত আয়োজন, সেই জীবনই যখন ক্ষণস্থায়ী, তখন অনন্ত জীবনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?
লেখক এসব প্রশ্নের উত্তর পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেননি, বরং তাঁকে নিজের ভেতরে ফিরে তাকানোর অবকাশ দিয়েছেন। এ কারণেই ‘মোহমুক্ত হৃদয়’ কেবল ধর্মীয় ভাবনার সংকলন হয়ে না থেকে আত্মজিজ্ঞাসার একটি পরিসর তৈরি করে। বইয়ের কোনো একটি পৃষ্ঠা হয়তো পাঠককে ফিরিয়ে নিতে পারে নিজের জীবনের কোনো বিস্মৃত মুহূর্তে—কোনো ব্যস্ততা, কোনো আকাঙ্ক্ষা কিংবা কোনো ভুলে যাওয়া সত্যের কাছে।
বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ আত্মশুদ্ধি। মানুষের বাহ্যিক জীবন যতটা দৃশ্যমান, অন্তরের জীবন ততটাই নীরব। অথচ মানুষের চিন্তা, আচরণ, সিদ্ধান্ত ও আকাঙ্ক্ষার গভীরে যে হৃদয় কাজ করে, তার পরিচর্যা ছাড়া বাহ্যিক সাফল্যও অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পার্থিব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাবের বাইরে গিয়ে নিজের অন্তরের দিকে ফিরে তাকানো লেখকের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে সেই প্রয়োজনই।
দুনিয়াকে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং দুনিয়াকে তার যথাযথ জায়গায় রাখা—বইটির ভাবনাকে এভাবেও দেখা যায়। অর্থ থাকবে, কাজ থাকবে, স্বপ্ন থাকবে, সম্পর্ক থাকবে, জীবনের নানা দায়িত্ব থাকবে; কিন্তু এসবের কোনো কিছুই যেন মানুষের হৃদয়ের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষাকে গ্রাস না করে। দুনিয়া থাকবে হাতে, কিন্তু হৃদয়ের সিংহাসনে নয়—এই উপলব্ধির কাছেই যেন ফিরে যেতে চায় ‘মোহমুক্ত হৃদয়’।
সহজ, প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় লেখা বইটিতে ধর্মীয় ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে জীবনকে দেখার একটি অন্তর্মুখী দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষের প্রতিদিনের ব্যস্ততা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার সঙ্গে পরকালীন জীবনের চেতনার একটি যোগসূত্র তৈরির চেষ্টা করেছেন লেখক। ফলে বইটির আলোচনায় ধর্মীয় অনুষঙ্গের পাশাপাশি উঠে এসেছে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনবোধের প্রশ্নও।
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান বর্তমানে মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত কলাম ও প্রবন্ধ লিখে আসছেন। এর আগে তার একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘নিশীতের নূর’। নতুন বই ‘মোহমুক্ত হৃদয়’-এর মধ্য দিয়ে তার চিন্তা, পাঠ-অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধের আরও একটি অধ্যায় পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
রাইয়ানের লেখালেখিতে ধর্মীয় ভাবনা ও জীবনঘনিষ্ঠ উপলব্ধির পাশাপাশি আত্মজিজ্ঞাসার একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ‘মোহমুক্ত হৃদয়’ সেই প্রবণতাকেই আরও বিস্তৃত করেছে। পাঠককে শুধু কিছু কথা জানানো নয়, বরং কিছুক্ষণ থামিয়ে নিজের জীবনকে একটু দূর থেকে দেখার সুযোগ করে দেওয়াই যেন বইটির অন্যতম অভিপ্রায়।
জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষটিরও কখনো না কখনো থামতে হয়। চারপাশের শব্দ থেকে নিজেকে সরিয়ে শুনতে হয় অন্তরের নীরবতা। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় যে প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যায়, কোনো এক নির্জন মুহূর্তে সেগুলোই আবার ফিরে আসে। ‘মোহমুক্ত হৃদয়’ সেই ফিরে আসার মুহূর্তটির কথাই মনে করিয়ে দেয়।
লেখকের কাছে একটি বইয়ের যাত্রা প্রকাশনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় না, পাঠকের হাতে পৌঁছানোর পরই শুরু হয় তার আরেকটি জীবন। তাই বইটি পাঠের পর পাঠকের মতামত, পরামর্শ ও গঠনমূলক প্রতিক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। পাঠকের অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ কিংবা সংশোধন-সংক্রান্ত পরামর্শ ভবিষ্যৎ লেখালেখিকে আরও সমৃদ্ধ ও পরিণত করতে সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশা তাঁর।
‘মোহমুক্ত হৃদয়’ পাওয়া যাচ্ছে ইসলামী বইমেলার ৬৩ নম্বর স্টলে। পাশাপাশি অনলাইনেও বইটি সংগ্রহ করা যাবে রকমারি ডটকম, ওয়াইফাই লাইফ, আমারবই ডটকম ও নফিউন ডটকম থেকে। কক্সবাজারে বইটি পাওয়া যাচ্ছে বিদ্যাসাগর লাইব্রেরি ও মক্কা লাইব্রেরিতে।
জীবন মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়—কখনো সাফল্যের আলোয়, কখনো ব্যর্থতার অন্ধকারে, কখনো মানুষের ভিড়ে, কখনো নিজের তৈরি ব্যস্ততার গোলকধাঁধায়। কিন্তু এত দূর যাওয়ার পরও একসময় মনে হতে পারে, নিজের কাছেই তো আর ফেরা হয়নি। তখন প্রয়োজন হয় ফিরে তাকানোর, হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ার।
‘মোহমুক্ত হৃদয়’ সেই ফিরে তাকানোরই একটি সাহিত্যিক প্রয়াস। দুনিয়ার কোলাহলের ভেতর দাঁড়িয়ে হৃদয়কে তার প্রকৃত গন্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এক নীরব আহ্বান। ক্ষণস্থায়ী জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও যে অনন্তের কথা মনে রাখা দরকার, বইটি পাঠককে সেই পুরোনো অথচ চিরনতুন সত্যের সামনে দাঁড় করাতে চায়।
