নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কেমন অপরাধ?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পৃথিবীতে মানুষের জীবনের চেয়ে দামী সম্পদ আর কিছুই হতে পারে না। এই অমূল্য জীবন আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র আমানত। ইসলাম শান্তি, সহানুভূতি ও সুবিচারের বার্তা নিয়ে এসেছে, যার মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের জীবন, ধন-সম্পদ ও সম্মানের সার্বিক সুরক্ষা দেওয়া। কোনো নিরপরাধ প্রাণ কেড়ে নেওয়া কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি গোটা মানবতার বিরুদ্ধে এক চরম অন্যায় ও ঘৃণ্য অপরাধ। অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যার ভয়াবহতা ও এর আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর হুশিয়ারি প্রদান করেছে।
নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য অপরাধ
ইসলামের দৃষ্টিতে একজনের জীবন রক্ষা করা যেমন পুরো মানবজাতিকে বাঁচানোর শামিল, তেমনি একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে ধ্বংস করার নামান্তর। আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলসহ সকল যুগের মানুষের জন্য এই বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় অবতীর্ণ করেছেন। কুরআন মাজিদে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন—
مِنْ أَجْلِ ذٰلِكَ كَتَبْنَا عَلٰى بَنِي إِسْرَآءِيْلَ أَنَّهٗ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيْعًا ؕ وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيْعًا
‘এই কারণেই আমি বনি ইসরাইলের ওপর এই বিধান কার্যকর করেছিলাম যে, যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল—মানুষ হত্যার বদলা কিংবা পৃথিবীতে ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া—সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারও প্রাণ বাঁচাল, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই বাঁচাল।’ (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ৩২)
হত্যা ও মহাপাপের কঠোর পরিণতি
আল্লাহ তাআলা তার খাঁটি বান্দাদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তারা কখনোই আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না এবং অন্যায়ভাবে কোনো প্রাণ হরণ করে না। যারা এই অপরাধে লিপ্ত হবে, আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক ও দ্বিগুণ শাস্তি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَالَّذِيْنَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللّٰهِ إِلٰهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُوْنَ النَّفْسَ الَّتِيْ حَرَّمَ اللّٰهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُوْنَ ۚ وَمَنْ يَّفْعَلْ ذٰلِكَ يَلْقَ أَثَامًا - يُّضٰعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ وَيَخْلُدْ فِيْهٖ مُهَانًا
‘এবং তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো মাবুদকে ডাকে না, আল্লাহ যা হারাম করেছেন কোনো সঙ্গত কারণ ছাড়া সেই প্রাণ হরণ করে না এবং ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না। আর যারা এসব করবে, তারা মহাশাস্তির মুখোমুখি হবে। কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে তারা চিরকাল লাঞ্ছিত অবস্থায় অবস্থান করবে।’ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ৬৮-৬৯)
হাদিসের আলোকে মানুষ হত্যার ভয়াবহতা
প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অন্যায়ভাবে প্রাণ হরণকে কবিরা গুনাহ এবং ধ্বংসাত্মক অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বিচার দিবসে বান্দার حقوق العباد বা মানুষের অধিকার সম্পর্কিত অপরাধগুলোর মধ্যে প্রথম বিচার হবে রক্তপাত বা অন্যায় হত্যার। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِي الدِّمَاءِ
‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে আগে যে বিষয়ে বিচার-ফয়সালা করা হবে, তা হলো রক্তপাত বা অন্যায় হত্যা।’ (বুখারি ৬৮৬৪, মুসলিম ১৬৭৮)
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) কবিরা গুনাহগুলোর তীব্রতা তুলে ধরে বলেন—
الْكَبَائِرُ: الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ، وَقَتْلُ النَّفْسِ، وَالْيَمِينُ الْغَمُوسُ
‘সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ হলো— আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম খাওয়া।’ (বুখারি ৬৬৭৫)
আমাদের দায়িত্ব ও সামাজিক সচেতনতা
ইসলামের এই অমূল্য শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন হরণ করা কেবল কোনো ব্যক্তিগত বা সাময়িক অপরাধ নয়; বরং এটি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে এক চরম ধ্বংস ডেকে আনে। একজন প্রকৃত মুমিন কখনোই অন্যায়, হিংসা ও রক্তপাতের সহযোগী হতে পারে না। সমাজ থেকে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও অন্যায্য হত্যাকাণ্ড দূর করতে হলে আমাদের কুরআন-হাদিসের এই চেতনা বুকে ধারণ করতে হবে।
শান্তিময় ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ার মূল ভিত্তি হলো প্রতিটি মানুষের জীবনের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দান করা। অন্যায় ও সহিংসতার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, ইসলাম তা স্পষ্ট ভাষায় আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। তাই সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সর্বপ্রকার সহিংসতা থেকে নিজেকে ও চারপাশকে দূরে রাখা প্রত্যেক দায়িত্বশীল নাগরিক ও সচেতন মুমিনের ইমানি দায়িত্ব। আসুন, আমরা ভালোবাসাও মানবপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে একটি সুন্দর, শান্তিময়, নিরাপদ ও সুসভ্য সমাজ গড়ে তুলি।

