জুমার দিনের বিশেষ ফজিলত
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৪ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জুমার দিন এই উম্মতের প্রতি বিশেষ দান। আল্লাহ তাআলা পূর্বের জাতিবর্গকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমরা সপ্তাহের শ্রেষ্ঠতম দিনে আমার জন্য বিশেষ একটি ইবাদত কর। কিন্তু তারা সেই শ্রেষ্ঠতর দিনটি নির্ণয় করতে ভুল করেছে। চিন্তা-ভাবনা করে ইহুদিরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য শনিবারকে নির্বাচন করেছে আর নাসারারা নির্ধারণ করেছে রোববারকে। অথচ সবচেয়ে সম্মানিত দিন হল জুমাবার। এ দিনের অনেক ফজিলত, অনেক বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা মেহেরবানী করে সে দিনটি উম্মতে মুহাম্মদীকে দান করেছেন।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘আমরা পরে আগমনকারীরাই কিয়ামতের দিন অগ্রগামী হব। তবে অন্যদেরকে আসমানি কিতাব দেওয়া হয়েছে আমাদের পূর্বে। এই দিন (অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতম একটি দিনে সকলে একত্র হয়ে বিশেষ ইবাদত করা) তাদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা এতে মতবিরোধ করেছে। আর আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক দিনটির পথ দেখিয়েছেন। সুতরাং এক্ষেত্রে মানুষ আমাদের অনুগামী। ইহুদীদের শ্রেষ্ঠ দিন জুমার পরের দিন শনিবার আর খ্রিস্টানদের শ্রেষ্ঠ দিন এর পরের দিন রোববার বার।’ (বুখারি ৮৭৬, মুসলিম ৮৫৫)
জুমার দিনের পাঁচটি বিশেষ ফজিলত
জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার অন্যতম একটি বিষয় হল, এ দিন কালক্রমে সংঘটিত এমন কিছু মহাঘটনার নীরব সাক্ষী, যা পৃথিবীর মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল বা পৃথিবীকে নবজীবন দান করেছিল। এমনিভাবে এ দিনই সংঘটিত হবে সেই মহাপ্রলয়, যা এই নশ্বর পৃথিবীর সমাপ্তি ঘটিয়ে এক অবিনশ্বর জগতের সূচনা করবে। বদরি সাহাবি হজরত আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনযির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ سَيِّدُ الْأَيّامِ وَأَعْظَمُهَا عِنْدَ اللهِ مِنْ يَوْمِ الْأَضْحَى وَيَوْمِ الْفِطْرِ، فِيهِ خَمْسُ خِلَالٍ: خَلَقَ اللهُ فِيهِ آدَمَ، وَأَهْبَطَ اللهُ فِيهِ آدَمَ، وَفِيهِ تَوَفّى اللهُ آدَمَ، وَفِيهِ سَاعَةٌ لَا يَسْأَلُ اللهَ الْعَبْدُ فِيهَا شَيْئًا إِلّا أَعْطَاهُ إِيّاهُ، مَا لَمْ يَسْأَلْ حَرَامًا، وَفِيهِ تَقُومُ السّاعَةُ، مَا مِنْ مَلَكٍ مُقَرّبٍ، وَلَا أَرْضٍ وَلَا سَمَاءٍ، وَلَا رِيَاحٍ وَلَا جِبَالٍ وَلَا بَحْرٍ، إِلّا وَهُنّ مُشْفِقُونَ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ
‘নিশ্চয় জুমার দিন হল সমস্ত দিনের সর্দার। জুমার দিন আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে মহান দিবস। এমনকি এই দিন আল্লাহ তাআলার কাছে ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর তথা ইসলামের দুই ঈদের দিন থেকেও মহান। জুমার দিনের বিশেষ পাঁচটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে—
১. এ দিন আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)কে সৃষ্টি করেছেন।
২. এ দিন তাকে জান্নাত থেকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।
৩. এ দিনেই আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেছেন।
৪. জুমার দিন একটা সময় আছে, যাতে বান্দা আল্লাহর কাছে যা চাইবে আল্লাহ তাআলা তাকে তা-ই দান করবেন, যদি না সে হারাম কোনো বিষয়ের প্রার্থনা করে।
৫. এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা পর্যন্ত জুমার দিন (কিয়ামতের আশঙ্কায়) ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে। পৃথিবী, আকাশ, বাতাস, পাহাড়, পর্বত, সাগর সবকিছু জুমার দিন (কিয়ামতের আশঙ্কায়) উদ্বিগ্ন থাকে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা ৫৫৫৯, মুসনাদে আহমাদ ১৫৫৪৮, ইবনে মাজাহ ১০৮৪১)
জুমার দিনে সকল সৃষ্টিজীব ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে উপরের হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে, জুমার দিন সমস্ত প্রাণী এ ভয়ে আতঙ্কিত থাকে যে, না জানি আজই কিয়ামত কায়েম হয়ে যায়।
অন্য হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন—
لَا تَطْلُعُ الشّمْسُ وَلَا تَغْرُبُ عَلَى يَوْمٍ أَفْضَلَ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ، وَمَا مِنْ دَابّةٍ إِلّا يَفْزَعُ لِيَوْمِ الْجُمُعَةِ إِلّا هَذَيْنِ الثّقَلَيْنِ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ
‘সূর্যের উদয় ও অস্ত যাওয়া দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন নেই। মানুষ ও জিন ব্যতীত এমন কোনো প্রাণী নেই, যা জুমার দিন (কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কায়) ভীতসন্ত্রস্ত থাকে না।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক ৫৫৬৩, মুসনাদে আহমাদ ৭৬৮৭, মুসনাদে আবু ইয়ালা ৬৪৬৮)
জুমার রাতে বান্দার আমল পেশ করা হয়
জুমার দিনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, জুমা বা বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আল্লাহ তাআলার কাছে বান্দাদের আমল পেশ করা হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলে কারীম (সা.) বলেছেন—
إِنَّ أَعْمَالَ بَنِي آدَمَ تُعْرَضُ كُلّ خَمِيسٍ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ، فَلَا يُقْبَلُ عَمَلُ قَاطِعِ رَحِمٍ
‘বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে অর্থাৎ জুমার রাতে আদম সন্তানের আমল (আল্লাহর সামনে) পেশ করা হয়। তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের আমল কবুল করা হয় না।’ (মুসনাদে আহমাদ ১০২৭২, আদাবুল মুফরাদ ৬১২)
জান্নাতের ‘ইয়াউমুল মাযীদ’ (অনন্য প্রাপ্তিদিবস)
জুমার দিনের একটি বিশেষ ফজিলত হল, জান্নাতবাসীদের জন্য এ দিনটি মহা আনন্দ ও বিশেষ প্রাপ্তির দিন। জান্নাতে প্রতি জুমার দিন বিপুল আনন্দ ও প্রাপ্তির সমাহার ঘটবে। আল্লাহ তাআলার বিশেষ ব্যবস্থাপনায় নবী-রাসূল ও নেককার বান্দাগণের মিলন-উৎসব হবে। সর্বোপরি জান্নাতিরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দীদার লাভে ধন্য হবে, যা হল জান্নাতের সর্বোচ্চ নিয়ামত।
তাই ফেরেশতারা জুমার দিনকে স্মরণ করেন ‘ইয়াউমুল মাযীদ’ নামে। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَتَانِي جِبْرِيلُ بِمِثْلِ المِرْآةِ البَيْضَاءِ، فِيهَا نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، قُلْتُ: يَا جِبْرِيلُ! مَا هَذِهِ؟ قَالَ: هَذِهِ الجُمُعَةُ، جَعَلَهَا اللهُ عِيدًا لَكَ وَلأُمّتِكَ، فَأَنْتُمْ قَبْلَ اليَهُودِ وَالنّصَارَى، فِيهَا سَاعَةٌ لاَ يُوَافِقُهَا عَبدٌ يَسْأَلُ اللهَ فِيهَا خَيْرًا إِلاّ أَعْطَاهُ إِيّاهُ
জিবরিল (আ.) আমার কাছে এসেছেন শুভ্র আয়নার মতো একটা জিনিস নিয়ে। আয়নাটিতে একটি কালো দাগ। আমি বললাম, এটা কী? জিবরিল (আ.) বললেন, এটি হলো জুমার দিন। এ দিনকে আল্লাহ তাআলা আপনার এবং আপনার উম্মতের জন্য ঈদের দিন বানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আপনারা ইহুদী ও নাসারা থেকে অগ্রগামী। এই দিন একটা সময় আছে, যে সময় বান্দা আল্লাহর কাছে যে কল্যাণই প্রার্থনা করে আল্লাহ তাকে তা-ই দান করেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, জুমার দিনকে কালো দাগ দিয়ে চিহ্নিত করা হলো কেন? জিবরিল (আ.) জবাব দিলেন, ‘এই যে কিয়ামত দিবস, তা এ দিনেই সংঘটিত হবে। আখেরাতে জুমার দিনকে আমরা ‘ইয়াউমুল মাযীদ’ নামে স্মরণ করব।’
নবীজি (সা.) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, ‘ইয়াউমুল মাযীদ’ কী? জিবরিল (আ.) উত্তর দিলেন, ‘জান্নাতে আল্লাহ তাআলা প্রশস্ত ও সুগন্ধময় একটা উপত্যকা বানিয়েছেন এবং এতে তিনি শুভ্র মেশকের একাধিক টিলা স্থাপন করেছেন। জুমার দিন এলে আল্লাহ তাআলা এ উপত্যকায় অবতরণ করবেন। তখন সেখানে নবীগণের জন্য স্বর্ণের মিম্বরসমূহ রাখা হবে, শহীদগণের জন্য মুক্তার অনেক চেয়ার পাতা হবে এবং জান্নাতি হুরেরা আপন আপন কক্ষ থেকে অবতরণ করবে। এরপর সকলে মিলে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও মাহাত্ম্যের স্তুতি গাইতে থাকবে। এরপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করবেন, (হে ফেরেশতারা!) আমার বান্দাদের (বিশেষ পোশাক) পরিধান করাও। সে অনুযায়ী তাদের সজ্জিত করা হবে। তখন আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেবেন, আমার বান্দাদের জন্য (বিশেষ) খাদ্য পরিবেশন কর। আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তাদের জন্যই বিশেষ ভোজনের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমার বান্দাদের সামনে (বিশেষ) পানীয় উপস্থিত কর। সে হিসাবে তাদের সামনে পানীয় পরিবেশন করা হবে। এরপর আল্লাহ তাআলার আদেশ, আমার বান্দাদের আতর-খোশবু লাগিয়ে দাও। তখন তাদেরকে সুরভিত করা হবে। এবার আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করবেন, (হে আমার বান্দারা!) তোমরা আমার কাছে কী চাও? তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমরা কেবল আপনার রিযা ও সন্তুষ্টি কামনা করি। আল্লাহ তাআলা উত্তর দেবেন, আমি তোমাদের প্রতি রাজি হয়ে গেছি। (তবারানীর বর্ণনায় আছে, অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য এমন এমন নিআমতের দ্বার উন্মুক্ত করবেন, যা কখনো কোনো চোখ দেখেনি এবং কোনো হৃদয় কল্পনা করেনি।) তারপর সবাইকে নিজ নিজ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ করবেন। সকলে আপন আপন জান্নাতে চলে যাবে এবং হুরেরা ঐসব কক্ষে আরোহণ করবে, যার প্রত্যেকটিই সবুজ মূল্যবান রত্ন পান্না বা লাল ইয়াকুতের তৈরি।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা ৪২২৮, তবারানি ২১০৫৪)

