ঘুসের টাকা মসজিদ মাদ্রাসায় দান করা যাবে কি?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মসজিদ আল্লাহর ঘর, মাদ্রাসা দ্বীনি শিক্ষার পবিত্র প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, নির্মাণ ও পরিচালনায় দান করা নিঃসন্দেহে অনেক সওয়াবের কাজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পবিত্র কাজে যদি ঘুসের টাকা, অবৈধ উপার্জন কিংবা হারাম সম্পদ ব্যয় করা হয়, তাহলে কি তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে?
অনেকেই মনে করেন, হারাম উপার্জনের টাকা মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করলে হয়তো সেই সম্পদ পবিত্র হয়ে যাবে। কেউ কেউ আবার বলেন, নিজের কাছে যেহেতু টাকাটি হারাম, তাই তা ভালো কাজে ব্যয় করাই উত্তম।
কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি এতটা সরল নয়। এখানে রয়েছে সম্পদের মালিকানা, মানুষের অধিকার, হারাম উপার্জন এবং দানের কবুলিয়ত সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। তাই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি।
১. ঘুস ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম
ঘুস হলো অন্যায়ভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা আদায় করা, অবৈধ সুবিধা নেওয়া কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাউকে অর্থ বা উপহার দেওয়া। ইসলাম ঘুসকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কর না এবং মানুষের সম্পদের কোনো অংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পেশ কর না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুসদাতা ও ঘুসগ্রহীতাকে অভিশাপ দিয়েছেন।’ (তিরমিজি ১৩৩৭)
সুতরাং ঘুসের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ কোনোভাবেই বৈধ উপার্জন নয়।
২. হারাম সম্পদ দান করলে কি তা হালাল হয়ে যায়?
ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো, ভালো কাজের উদ্দেশ্য থাকলেই হারাম সম্পদ হালাল হয়ে যায় না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সম্পদ যেমন পবিত্র হতে হয়, উপার্জনের পথও তেমন পবিত্র হতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম ১০১৫)
অতএব, কেউ ঘুসের টাকা দিয়ে মসজিদ নির্মাণ করল, মাদ্রাসার উন্নয়ন করল কিংবা দ্বীনি কোনো কাজে অর্থ ব্যয় করলেই সেই ঘুসের টাকা হালাল হয়ে যাবে না। আবার এ কাজের মাধ্যমে ঘুসের গুনাহ থেকেও মুক্তি পাওয়া যাবে না।
৩. ঘুসের টাকা মসজিদ-মাদ্রাসায় দেওয়া যাবে কি?
এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় বুঝতে হবে।
প্রথমত: ঘুসের টাকা কারও নির্দিষ্ট অধিকার নষ্ট করে নেওয়া হলে
যদি ঘুসের অর্থের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অধিকার জড়িত থাকে, তাহলে সেই অর্থ প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করে মালিকের অধিকার আদায় করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত: প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করা সম্ভব না হলে
যদি অর্থের প্রকৃত মালিককে খুঁজে পাওয়া না যায় অথবা তাকে ফিরিয়ে দেওয়া বাস্তবে অসম্ভব হয়, তাহলে সেই হারাম সম্পদ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত: মসজিদ-মাদ্রাসায় দানের বিধান
এখানে ফিকহবিদদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে হারাম সম্পদের মালিক অজানা হলে তা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা যাবে কি না, এ বিষয়ে আলেমদের ভিন্ন মত রয়েছে।
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ ফতোয়া অনুযায়ী, নিশ্চিত হারাম উপার্জন মসজিদ-মাদ্রাসার নির্মাণ বা উন্নয়নে ব্যয় না করে গরিব-অসহায় মানুষকে দিয়ে দিতে হবে। তবে এটি সাধারণ সদকার মতো সওয়াবের নিয়তে দেওয়া যাবে না; বরং হারাম সম্পদ থেকে দায়মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে দিতে হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি ৫/৩৪৩, রদ্দুল মুহতার ১/৬৫৮)
অন্যদিকে, কিছু আলেমের মতে প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়া অসম্ভব হলে মসজিদ নির্মাণসহ মুসলমানদের সাধারণ কল্যাণমূলক কাজে তা ব্যয় করা যেতে পারে। তাই মতপার্থক্য এড়িয়ে চলতে এবং বিশেষ করে হানাফি ফিকহ অনুসরণ করতে চাইলে, নিশ্চিত ঘুষের টাকা মসজিদ-মাদ্রাসায় না দিয়ে দরিদ্র-অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করাই নিরাপদ।
৪. ঘুসের টাকা দিয়ে ইতিমধ্যে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করলে করণীয় কী?
কেউ যদি আগে ঘুসের টাকা দিয়ে মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ করে থাকেন, তাহলে হতাশ না হয়ে করণীয় হলো—
প্রথমে ঘুসের লেনদেন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
অতীতের গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে।
হানাফি ফতোয়া অনুযায়ী, সমপরিমাণ অর্থ গরিব-অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করতে হবে, সওয়াবের নিয়ত ছাড়া।
মনে রাখতে হবে, কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসায় হারাম অর্থ ব্যয় হয়ে গেলে প্রতিষ্ঠানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। এ বিষয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী আলেমের পরামর্শ প্রয়োজন।
৫. ঘুস থেকে বেঁচে থাকার পাশাপাশি হালাল উপার্জনের চেষ্টা করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ
‘হে মুমিনগণ! আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি, তা থেকে আহার করো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৭২)
আমাদের মনে রাখতে হবে, অল্প হালাল উপার্জনও অনেক বরকতময়; অন্যদিকে প্রচুর হারাম সম্পদ মানুষের জীবনে অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে।
মসজিদ আল্লাহর ঘর, মাদ্রাসা দ্বীনি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। এসব পবিত্র প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও উন্নয়নে অবশ্যই হালাল ও পবিত্র সম্পদ ব্যয় করা উচিত। ঘুসের টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করলেই ঘুসের গুনাহ মাফ হয়ে যায় না, হারাম সম্পদও হালাল হয়ে যায় না।
তাই ঘুসের টাকা থেকে তওবা করুন, মানুষের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দিন। আর প্রকৃত মালিককে খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হলে শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী সেই সম্পদ থেকে দায়মুক্ত হোন।
আসুন, আমরা শুধু মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নের চিন্তা না করে নিজেদের উপার্জনকেও পবিত্র রাখার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকার এবং হালাল রিজিকের ওপর সন্তুষ্ট থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।

