Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

অভাব-অনটন থেকে মুক্তির দোয়া ও আমল

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৭ পিএম

অভাব-অনটন থেকে মুক্তির দোয়া ও আমল

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

অভাব-অনটন মানুষের জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। কখনো সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়, কখনো ঋণের বোঝা চেপে বসে, আবার কখনো শত চেষ্টা করেও রিজিকে বরকত পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, হতাশ হয়ে যান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটান।

কিন্তু একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা প্রাচুর্য দান করেন, আবার কাউকে অভাবের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। তাই অভাবের সময় ধৈর্য ধারণ, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা এবং তার কাছে বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা উচিত।

পবিত্র কুরআন ও হাদিসে অভাব-অনটন, দুশ্চিন্তা এবং রিজিকের বরকত লাভের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও আমলের কথা এসেছে। চলুন, সেগুলো জেনে নিই—

১. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আল্লাহ রিজিক বাড়িয়ে দেন

অভাবের মধ্যেও আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ কৃতজ্ঞ বান্দার প্রতি তার নেয়ামত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা করেছিলেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৭)

সুতরাং অভাবের সময়ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন। তার রহমতের আশা রাখুন এবং হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যান।

২. অভাব-অনটন ও অপমান থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) অভাব, স্বল্পতা, অপমান এবং জুলুম করা ও জুলুমের শিকার হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন এভাবে—

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ، وَالْقِلَّةِ، وَالذِّلَّةِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল ফাকরি, ওয়াল কিল্লাতি, ওয়াজ জিল্লাতি, ওয়া আউজুবিকা মিন আন আজলিমা আও উজলামা।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দারিদ্র্য, স্বল্পতা ও অপমান থেকে। আর আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই, কাউকে জুলুম করা থেকে এবং কারও দ্বারা অত্যাচারিত হওয়া থেকে।’ (আবু দাউদ ১৫৪৪)

এই দোয়াটি নিয়মিত পড়ার অভ্যাস করুন। আল্লাহর কাছে অভাব, অপমান ও অন্যায়-অত্যাচার থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করুন।

৩. রিজিকের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনার দোয়া

পবিত্র কুরআনে হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারীরা আল্লাহর কাছে আসমান থেকে খাবারপূর্ণ দস্তরখান অবতীর্ণ করার আবেদন করেছিলেন। সেই প্রার্থনায় রিজিকের জন্যও সুন্দর একটি বাক্য রয়েছে। দোয়াটি হলো—

اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِنْكَ ۖ وَارْزُقْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা রাব্বানা আনযিল আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামায়ি, তাকুনু লানা ঈদাল লি-আউয়ালিনা ওয়া আখিরিনা ওয়া আয়াতাম মিনকা। ওয়ারযুকনা ওয়া আনতা খাইরুর রাজিকিন।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণ একটি দস্তরখান অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্য আনন্দের উপলক্ষ হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আর আমাদের রিজিক দান করুন। আপনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।’ (সুরা আল-মায়িদা: আয়াত ১১৪)

এই আয়াতটি মূলত হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারীদের বিশেষ প্রার্থনা। এর মধ্যে আল্লাহর কাছে রিজিক চাওয়ার সুন্দর শিক্ষা রয়েছে।

৪. বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান

অভাব-অনটন ও সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ইস্তিগফার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। পবিত্র কুরআনে হজরত নূহ (আ.) তার জাতিকে বেশি বেশি ইস্তিগফার করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ۝ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا ۝ وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا

অর্থ: ‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন। আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন ও নদীনালা প্রবাহিত করবেন।’ (সুরা নূহ: আয়াত ১০–১২)

এ আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, ইস্তিগফার আল্লাহর রহমত, বরকত ও রিজিক লাভের অন্যতম মাধ্যম।

ইস্তিগফারের সহজ আমল

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণ: ‘আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।’

অর্থ: ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তার কাছেই তওবা করছি।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ

‘আমি প্রতিদিন একশবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছে তাওবা করি।’ (মুসলিম ২৭০২)

এ ছাড়া ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে—

مَنْ لَزِمَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا، وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ

‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ বের করে দেন, প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (আবু দাউদ ১৫১৮)

৫. রিজিক লাভে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন

আল্লাহ তাআলা তার ওপর ভরসাকারীদেরকে পাখির মতো রিজিক দান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ، لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ

‘তোমরা যদি যথাযথভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দান করতেন, যেভাবে পাখিদের রিজিক দান করেন।’ (তিরমিজি ২৩৪৪)

পাখিরা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাসা থেকে বের হয়, আর সন্ধ্যায় পরিতৃপ্ত অবস্থায় ফিরে আসে। এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি জীবিকা অর্জনের জন্য চেষ্টা-সাধনা করতে হবে। শুধু বসে থেকে রিজিকের অপেক্ষা করা তাওয়াক্কুল নয়।

অভাব-অনটন জীবনের একটি পরীক্ষা। তাই অভাবের কারণে কখনো হতাশ হওয়া যাবে না, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। বরং নিয়মিত নামাজ আদায় করতে হবে, বেশি বেশি ইস্তিগফার করতে হবে, আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে এবং হালাল উপায়ে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

মনে রাখবেন, শুধু সম্পদের প্রাচুর্যই রিজিক নয়। সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি, পরিবারের ভালোবাসা, অল্প সম্পদে তৃপ্তি এবং উপার্জনে বরকত—সবই আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত।

আসুন, আমরা প্রতিদিন আল্লাহর কাছে দোয়া করি—

اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে আমাকে মুক্ত রাখুন।’ (তিরমিজি ৩৫৬৩)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার অভাব-অনটন দূর করুন, ঋণমুক্ত জীবন দান করুন, হালাল রিজিকে বরকত দিন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

সুদি কারবারির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি জায়েজ?

সুদি কারবারির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি জায়েজ?

বারবার ভুল করার পর তওবা করলেই কি আল্লাহ ক্ষমা করেন?

বারবার ভুল করার পর তওবা করলেই কি আল্লাহ ক্ষমা করেন?

কেউ যদি বলে— ‘আমার জন্য একটু দোয়া করবেন!’ তখন করণীয় কী?

কেউ যদি বলে— ‘আমার জন্য একটু দোয়া করবেন!’ তখন করণীয় কী?

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

শেষ রাতের যে ৫ আমল বদলে দিতে পারে জীবন

শেষ রাতের যে ৫ আমল বদলে দিতে পারে জীবন

আরও পড়ুন

সুদি কারবারির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি জায়েজ?

সুদি কারবারির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি জায়েজ?

অভাব-অনটন থেকে মুক্তির দোয়া ও আমল

অভাব-অনটন থেকে মুক্তির দোয়া ও আমল

ঘুসের টাকা মসজিদ মাদ্রাসায় দান করা যাবে কি?

ঘুসের টাকা মসজিদ মাদ্রাসায় দান করা যাবে কি?

বারবার ভুল করার পর তওবা করলেই কি আল্লাহ ক্ষমা করেন?

বারবার ভুল করার পর তওবা করলেই কি আল্লাহ ক্ষমা করেন?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম