সুদি কারবারির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া কি জায়েজ?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২১ পিএম
ছবি: সংগৃহীতহ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মেয়ের বিয়ে প্রতিটি মা-বাবার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। প্রত্যেক অভিভাবক চান, তার মেয়ের স্বামী যেন দ্বীনদার, সৎ, দায়িত্বশীল ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী হন। কারণ বিয়ে শুধু দুটি মানুষের সম্পর্ক নয়; বরং এটি একটি নতুন পরিবার, নতুন জীবন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের সঙ্গে জড়িত।
কিন্তু যখন কোনো পাত্রের উপার্জনের সঙ্গে সুদ বা হারাম লেনদেন জড়িত থাকে, তখন অভিভাবকদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এমন ব্যক্তির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া কি শরিয়তসম্মত হবে? তার উপার্জন হারাম হলে সংসারজীবনে কী প্রভাব পড়বে? আর পাত্র ভালো চরিত্রের হলেও যদি সে সুদি কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে করণীয় কী?
ইসলামের আলোকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কুরআন ও হাদিসের আলোকে জেনে নেওয়া যাক এর বিধান।
১. সুদ ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম
ইসলাম সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সুদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীকে অভিশাপ দিয়েছেন। আর বলেছেন, তারা সবাই (গুনাহের ক্ষেত্রে) সমান।’ (মুসলিম ১৫৯৮)
অতএব, সুদি কারবারকে সাধারণ কোনো ব্যবসা বা পেশা মনে করার সুযোগ নেই। এটি ইসলামে গুরুতর কবিরা গুনাহ।
২. সুদি কারবারির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া যাবে কি?
এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি বিষয় বুঝতে হবে— কোনো ব্যক্তির সুদি কারবারে জড়িত থাকা এবং তার সঙ্গে বিয়ের বৈধতা এক বিষয় নয়।
শরিয়তের দৃষ্টিতে শুধু সুদের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে তার সঙ্গে বিবাহবন্ধন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায় না। তবে সে যদি জেনেশুনে সুদের কাজে লিপ্ত থাকে এবং তওবা না করে, তাহলে তার দ্বীনদারি ও চরিত্র নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।
এমন পাত্রের ব্যাপারে অভিভাবকদের সতর্ক থাকা উচিত। বিশেষ করে সে যদি সুদকে হারাম মনে করেও তা থেকে বিরত না হয়, তাহলে তাকে পাত্র হিসেবে গ্রহণ না করাই উত্তম।
শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর কাছে এমন একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল— একজন পাত্র সুদভিত্তিক ব্যাংকে চাকরি করেন। তাকে চাকরি ছাড়তে বলার পরও তিনি বিকল্প চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকতে চান। এমন পাত্রের কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যাবে কি?
জবাবে তিনি বলেন, পাত্রের অবস্থা যদি এমনই হয়, তাহলে সে ওই চাকরিতে থাকা অবস্থায় তার কাছে মেয়েকে বিয়ে না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সুতরাং অভিভাবকদের উচিত পাত্রের সুদি কারবারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং তাকে হালাল উপার্জনের পথে আসতে উৎসাহিত করা।
৩. বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রের দ্বীনদারি ও চরিত্রকে প্রাধান্য দিন
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ
‘তোমাদের কাছে এমন কেউ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তার সঙ্গে বিয়ে দাও।’ (তিরমিজি ১০৮৪)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বীনদারি ও উত্তম চরিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শুধু অর্থ-সম্পদ, চাকরি, বাড়ি-গাড়ি কিংবা সামাজিক মর্যাদা দেখে মেয়ের বিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং পাত্রের নামাজ, ধর্মীয় অনুশীলন, সততা, দায়িত্ববোধ, হালাল-হারামের প্রতি সচেতনতা এবং পারিবারিক আচরণ যাচাই করা জরুরি।
৪. পাত্রের উপার্জন হারাম হলে সংসারে কী প্রভাব পড়বে?
হারাম উপার্জন মানুষের জীবনে বরকতহীনতা ও আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। তাই একজন মুসলিমের উচিত নিজের উপার্জনকে হালাল রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম ১০১৫)
তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, স্বামীর উপার্জনে হারাম অংশ থাকলেই স্ত্রীর প্রতিটি খাবার বা সংসারের প্রতিটি সম্পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয়ে যায়—এমন সাধারণ সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। উপার্জনের ধরন, অর্থের উৎস এবং স্ত্রীর জানা-অজানা ও ভূমিকার ওপর বিধান নির্ভর করতে পারে। তাই বিয়ের আগেই পাত্রকে হালাল উপার্জনের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে বলা উচিত।
৫. পাত্র সুদি কারবার ছেড়ে তওবা করলে কী করবেন?
কোনো ব্যক্তি আগে সুদের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরে যদি আন্তরিকভাবে তাওবা করে, সুদি কারবার ছেড়ে দেয় এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা শুরু করে, তাহলে তার অতীতের কারণে তাকে চিরদিনের জন্য অযোগ্য মনে করা উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
‘বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৫৩)
সুতরাং পাত্রের মধ্যে তওবার আন্তরিকতা, হালাল উপার্জনের চেষ্টা এবং দ্বীনের প্রতি দায়িত্ববোধ দেখা গেলে তার বিয়ের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে।
৬. মেয়ের সম্মতি নেওয়াও জরুরি
বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের মতামত ও সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অভিভাবকদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মেয়েকে বিয়েতে বাধ্য করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ
‘বিধবা বা পূর্বে বিবাহিত নারীকে তার পরামর্শ ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কুমারী মেয়েকেও তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।’ (বুখারি ৫১৩৬, মুসলিম ১৪১৯)
তাই পাত্রের দ্বীনদারি ও চরিত্র যাচাই করার পাশাপাশি মেয়ের মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মেয়ের বিয়ে শুধু একজন উপার্জনক্ষম পুরুষের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয় নয়; বরং এমন একজন জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার বিষয়, যার সঙ্গে আপনার মেয়ে দ্বীনের পথে চলতে পারবে এবং নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সংসার গড়ে তুলতে পারবে।
সুদি কারবারে জড়িত ব্যক্তির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ নয়। তবে সুদ যে মারাত্মক হারাম, তা জানা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি সুদি কারবারে লিপ্ত থাকে এবং তাওবা করতে আগ্রহী নয়, তাকে পাত্র হিসেবে গ্রহণ না করাই বিচক্ষণতা।
অন্যদিকে, কেউ যদি সুদ থেকে আন্তরিকভাবে তওবা করে, হালাল উপার্জনের পথে ফিরে আসে এবং তার দ্বীনদারি ও চরিত্র সন্তোষজনক হয়, তাহলে তাকে বিয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতে পারে।
মনে রাখবেন, মেয়ের জন্য ধনসম্পদশালী স্বামীর চেয়ে দ্বীনদার, সৎ, দায়িত্বশীল ও হালাল উপার্জনে আগ্রহী স্বামী নির্বাচন করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের জন্য নেককার জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার তৌফিক দান করুন এবং সব ধরনের হারাম উপার্জন ও সুদি লেনদেন থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।


