হারাম খাদ্য ও অপব্যয় বর্জনই মুমিনের ইমান
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সম্পদ ও রিজিক মানবজীবনের এক বিশাল আমানত। এই নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার এবং হারাম বর্জনের ওপর মুমিনের ইহকাল ও পরকালের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে। অপব্যয় বর্জন এবং হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবন সাজানো কেবল সামাজিক শিষ্টাচারই নয়, বরং এটি সরাসরি ইমানের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
মধ্যমপন্থা: অপব্যয় ও কৃপণতার মাঝের সুষমা
ইসলামে অতিরিক্ত ব্যয় কিংবা কার্পণ্য—কোনোটিই কাম্য নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মধ্যমপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন—
وَلَا تَجۡعَلۡ يَدَكَ مَغۡلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا
‘আর তোমার হাত তোমার ঘাড়ের সাথে বেঁধে রেখো না এবং তা পুরোপুরি প্রসারিতও করো না, তাহলে তুমি তিরস্কৃত ও অনুতপ্ত হয়ে বসে পড়বে।’ (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ২৯)
অন্য আয়াতে আত্মীয়স্বজন ও অভাবগ্রস্তদের হক আদায় করার তাগিদ দিয়ে অপব্যয় করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا * إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ كَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
‘আর আত্মীয়স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও; আর অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীগণ শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ২৬-২৭)
আল্লাহর প্রকৃত ও সৎ বান্দাদের অন্যতম প্রধান ভূষণ হলো তারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবসময় ভারসাম্য বজায় রাখে। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে—
وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا
‘আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তারা এর মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।’ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ৬৭)
শুধু ধন-সম্পদ নয়, খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত বা অপচয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
‘তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় কর না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আল-আরাফ: আয়াত ৩১)
অপব্যয় বলতে আসলে কী বোঝায়?
অপব্যয় বলতে কেবল প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা-পয়সা খরচ করাকেই বোঝায় না; বরং খাবার, পোশাক, বাসস্থান, বাহন কিংবা জীবনযাত্রার অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের সীমা লঙ্ঘন করা এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন—খাবারের ক্ষেত্রে এমন মাত্রাতিরিক্ত পেটপূজা করা, যার ফলে শরীর ভারী হয়ে যায় এবং ইবাদত বা দৈনন্দিন কাজকর্ম করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে অতিরিক্ত বিলাসিতাও অপব্যয়ের শামিল।
তবে সব ধরনের অতিরিক্ত খরচ কিন্তু অপচয় নয়। যে ব্যয়ের মাধ্যমে স্থায়ী সম্পদ অর্জিত হয় কিংবা ভবিষ্যতে আয় ও সমৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত হয়, তা অপব্যয়ের সীমানায় পড়ে না। যেমন—চাষাবাদের জমি কেনা কিংবা উৎপাদন ও বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গবাদিপশু কেনা। এ ধরনের বিনিয়োগ পরবর্তী সময়ে জীবিকা বাড়াতে সাহায্য করে।
কেনাবেচার ক্ষেত্রেও পরিমিতিবোধ ও সততা জরুরি। পণ্যের প্রকৃত মূল্য না জেনে অযথা বেশি দামে কেনা বা কম দামে বিক্রি করাও একধরনের অসতর্কতা। পরিমিতিবোধ অর্থ হলো— প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো, পরিবার ও আত্মীয়দের হক দেওয়া এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছু সঞ্চয় করা।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখার পাশাপাশি সুদূরপ্রসারী চিন্তা করা দরকার। রিজিকের মালিক আল্লাহ হলেও তিনি নিজেই বান্দাকে পরিমিতিবোধ বজায় রাখতে বলেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
إِنَّ رَبَّكَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ ۚ إِنَّهُ كَانَ بِعبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا
‘নিশ্চয় তোমার রব যার জন্য ইচ্ছা রিজিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা তা সীমিত করেন। নিশ্চয় তিনি তার বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবহিত ও সমদর্শী।’ (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ৩০)
অভাবের ভয়ে কৃপণ হওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি ভবিষ্যতের কথা ভুলে সব সম্পদ উড়িয়ে দেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সুপরিকল্পিত সঞ্চয় জরুরি পরিস্থিতিতে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করার সময় দারুণ কাজে দেয়।
হারাম খাদ্য ও অবৈধ উপার্জন বর্জনের অপরিহার্যতা
অপব্যয় যেমন বর্জনীয়, তেমনি হারাম উপার্জন ও হারাম খাদ্য থেকেও দূরে থাকা ইমানের অন্যতম দাবি। সুদ, ঘুষ, ব্যবসায় প্রতারণা, ওজনে কম দেওয়া কিংবা ভালো পণ্যের সঙ্গে খারাপ পণ্য মিশিয়ে বিক্রি করার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সম্পূর্ণ হারাম। সামান্য কিছু লাভের আশায় অন্যের অধিকার বা হক নষ্ট করা একজন মুমিনের চরিত্র হতে পারে না।
অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ দিয়ে যতই জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন করা হোক না কেন, সেই উপার্জনের মারাত্মক দায় ও পাপ থেকে কস্মিনকালেও মুক্তি মেলে না। মুমিনের কাছে তার জীবন ও সম্পদ নিছক ভোগের কোনো উপকরণ নয়, বরং এটি মালিকের পক্ষ থেকে দেওয়া এক পবিত্র আমানত।
একজন প্রকৃত মুমিনের জীবন পরিচালিত হয় রবের সন্তুষ্টির মাপে। উপার্জন থেকে শুরু করে খাদ্য গ্রহণ ও সম্পদ ব্যয়— প্রতিটি পদক্ষেপে সততা, হালাল সুরক্ষার নিখুঁত বিধান এবং পরিমিতিবোধ বজায় রাখা জরুরি। জীবনের সর্বক্ষেত্রে অপব্যয় ও হারাম উপার্জনের পঙ্কিলতা পরিহার করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করলেই কেবল ইহকালের শান্তি এবং পরকালের মুক্তি নিশ্চিত হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনের তৌফিক দিন এবং সব ধরনের অপব্যয় ও হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


