ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আধুনিক শহরের ইট-পাথরের খাঁচায় নিজের একটি ছাদ বা ফ্ল্যাট কার না ভালো লাগে? কিন্তু চড়া দামের কারণে বেশির ভাগ মানুষের পক্ষেই একবারে টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে ব্যাংক বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লোন কিংবা কিস্তির ওপর ভরসা করতে হয় অনেককে। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এই লেনদেন কতটুকু বৈধ বা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে মনে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট ইসলামি গবেষক ও ফকিহগণের বক্তব্য হলো—এই কাজটি মূলত দুই দিক থেকে শরিয়তের দৃষ্টিতে শুদ্ধ বা গ্রহণযোগ্য নয়—
১. সুদের সম্পৃক্ততা: ব্যাংক বা প্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লোন নিয়ে ফ্ল্যাট কেনা মানেই সুদের কারবারে জড়িয়ে পড়া। আর সুদের কারবারে নিজেকে সম্পৃক্ত করা সরাসরি হারাম ও কবিরা গুনাহ।
২. ঋণের বোঝা ও পরকালের জবাবদিহিতা: একান্ত এবং চরম প্রয়োজন ছাড়া ইসলাম কখনোই বিনা কারণে ঋণ করার অনুমোদন দেয় না। ঋণ একটি অত্যন্ত ভারী ও ক্ষতিকর মানসিক ও সামাজিক বোঝা। এর দায়বদ্ধতা এতটাই মারাত্মক যে, কিয়ামতের ময়দান পর্যন্ত এর জন্য জবাবদিহি করতে হয়।
ঋণ থেকে যত দূরে থাকা যায়, মানবজীবনের জন্য ততই কল্যাণকর। মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করার অজুহাতে বিশাল অংকের ঋণ মাথায় নিয়ে সারাজীবন অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটানো কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর চেয়ে সাধ্যের মধ্যে থেকে বাসা ভাড়া নিয়ে জীবনযাপন করা অনেক বেশি নিরাপদ ও শান্তির।
কিস্তিতে পণ্য কেনাবেচার ইসলামি বিধান
অবশ্য কোনো লোন বা সুদের কারবার ছাড়া, নির্ধারিত মেয়াদভিত্তিক কিস্তিতে পণ্যমূল্য পরিশোধ করা ইসলামে সম্পূর্ণ জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো—নগদ মূল্য এবং বাকির মূল্য একই হতে হবে। যদি একই পণ্যের ক্ষেত্রে নগদে এক দাম এবং বাকিতে অধিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়, তবে সেটি সুদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। পবিত্র হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত—
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ بَيْعَتَيْنِ فِي بَيْعَةٍ
রাসুলুল্লাহ (সা.) এক লেনদেনের মধ্যে দুটি লেনদেন করতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিজি ১২৩১, মুসনাদ আহমাদ ৩৭৮৩)
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন, বিক্রেতার এমন কথা বলা নিষেধ—‘বস্তুটি নগদে কিনলে এত টাকা, আর বাকিতে বা কিস্তিতে কিনলে এর দাম এত বেশি হবে।’ অর্থাৎ, দামের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বা অতিরিক্ত সুদ লুক্কায়িত থাকা শরিয়তে নিষিদ্ধ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ব্যবসা হালাল এবং সুদকে হারাম ঘোষণা করে স্পষ্ট ভাষায় এর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে—
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
‘আর আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৭৫)
আধুনিকতার মোহে অন্ধ হয়ে সুদের জালে জড়িয়ে পড়া বা পাহাড়সমান ঋণের বোঝা ঘাড়ে নেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পরকালের মুক্তিকে বিপন্ন করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। তাই সুদের অন্ধকার পথ পরিহার করে, শরিয়তের সঠিক নিয়ম মেনে এবং নিজের সামর্থ্যের ভেতর জীবন সাজানোই সর্বোত্তম। তড়িঘড়ি করে ঋণগ্রস্ত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করলে এবং হালাল উপার্জনের ওপর ভরসা রাখলে মহান আল্লাহ তাআলা নিশ্চয়ই বান্দার জন্য উত্তম ব্যবস্থার পথ খুলে দেবেন।

