Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

ঋণ পরিশোধে টালবাহানা: এটা কি জুলুম?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম

Advertisement

মানুষের জীবনে আর্থিক সংকট কখনো বলে-কয়ে আসে না। কখনো অসুস্থতার চিকিৎসা, কখনো সন্তানের পড়াশোনা, আবার কখনো ব্যবসা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়। এমন বিপদের মুহূর্তে কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে অনেক বড় সংকটও সহজে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। কিন্তু বিপদ কেটে যাওয়ার পর সেই ঋণ পরিশোধের সময় এলে কারও কারও আচরণ বদলে যায়। কেউ সময়ক্ষেপণ করেন, কেউ ফোন ধরেন না, আবার কেউ নানা অজুহাতে পাওনাদারকে এড়িয়ে চলেন। এভাবে সামর্থ্য থাকা পরও টাকা আটকে রাখা কি ইসলামে জুলুম?

অথচ ইসলাম ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। এখানে যেমন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে মহৎ ইবাদত হিসেবে উৎসাহিত করা হয়েছে, তেমনি ঋণ পরিশোধে অবহেলা ও টালবাহানাকে জুলুম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত অসচ্ছল ব্যক্তিকে সময় দেওয়া এবং প্রয়োজনে ঋণ মওকুফ করাকেও মহৎ কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাই ঋণের বিষয়টি শুধু আর্থিক লেনদেন নয়; বরং এটি সততা, আমানতদারি, মানবিকতা ও ইমানি দায়িত্বেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঋণ দেওয়া: বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মহৎ সুযোগ

ইসলাম মানুষের কল্যাণে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেছে। কেউ আর্থিক সংকটে পড়ে সহযোগিতা চাইলে সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে ঋণ দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কারণ, বিপদের সময় একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও একটি মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً ۚ وَاللَّهُ يَقْبِضُ وَيَبْسُطُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বাড়িয়ে দেবেন। আর আল্লাহই সংকুচিত করেন এবং প্রশস্ত করেন। তার কাছেই তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৪৫)

এ আয়াতে ‘উত্তম ঋণ’ বলতে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার বান্দাদের কল্যাণে সম্পদ ব্যয় করাকে বোঝানো হয়েছে। তাই ঋণ দেওয়ার উদ্দেশ্য হতে হবে বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করা। ঋণগ্রহীতার অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অন্যায় সুবিধা নেওয়া কিংবা ঋণের বিনিময়ে সুদের শর্ত আরোপ করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থি।

ঋণ নেওয়া মানেই বড় আমানত ও দায়িত্ব

টাকা ধার নেওয়া সহজ হলেও তা যথাসময়ে পরিশোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ঋণগ্রহীতাকে সব সময় মনে রাখতে হবে, ধার করা অর্থ অন্যের সম্পদ। সাময়িকভাবে ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া মানেই সেই অর্থের মালিক হয়ে যাওয়া নয়। বরং ঋণ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিশোধের দায়ও নিজের ওপর বর্তায়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।

مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِتْلَافَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ

অর্থ: ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ পরিশোধ করার নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নষ্ট করার নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ (বুখারি ২৩৮৭)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ঋণ গ্রহণের সময় মানুষের নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ নেওয়ার উদ্দেশ্য হতে হবে প্রয়োজন পূরণ করা এবং যথাসাধ্য তা পরিশোধ করা। কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফেরত না দেওয়ার মানসিকতা পোষণ করা কিংবা শুরু থেকেই পাওনাদারের অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা করা গুরুতর অন্যায়।

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা জুলুম

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, বিপদের সময় মানুষ পরিচিতজন, বন্ধু কিংবা আত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা ধার নেন। কিন্তু ফেরত দেওয়ার সময় এলে কারও কারও আচরণ বদলে যায়। কেউ ফোন ধরেন না, কেউ দেখা করতে চান না, আবার কেউ একের পর এক অজুহাত দেখিয়ে সময় পার করেন।

অথচ ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে তা বিলম্বিত করা ইসলামে স্পষ্ট জুলুম। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ

‘সচ্ছল ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা জুলুম।’ (বুখারি ২৪০০)

এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট। কারও কাছে ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পাওনাদারকে হয়রানি করেন, তাহলে তা অন্যায় ও জুলুমের শামিল। কারণ, পাওনাদারের সম্পদ আটকে রেখে তাকে আর্থিক ও মানসিক কষ্ট দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে বাস্তবেই যদি ঋণগ্রহীতা আর্থিক সংকট, ব্যবসায়িক লোকসান কিংবা অন্য কোনো অনিবার্য সমস্যায় পড়েন, তাহলে তাঁর উচিত বিষয়টি গোপন না করে পাওনাদারের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা। নিজের অসুবিধার কথা জানিয়ে যুক্তিসংগত সময় চাওয়া এবং পরিশোধের আন্তরিক চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

প্রকৃত অসচ্ছল ঋণগ্রহীতার প্রতি সহানুভূতি দেখানোর নির্দেশ

ইসলাম যেমন ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে, তেমনি প্রকৃত অসচ্ছল ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষাও দিয়েছে। কোনো ঋণগ্রহীতা যদি সত্যিই আর্থিক সংকটে পড়েন এবং নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম হন, তাহলে তাকে অযথা চাপ প্রয়োগ না করে সচ্ছলতা ফিরে আসা পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَىٰ مَيْسَرَةٍ ۚ وَأَنْ تَصَدَّقُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ

‘আর ঋণগ্রহীতা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি তোমরা সদকা হিসেবে ঋণ মাফ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৮০)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঋণদাতার দায়িত্ব শুধু নিজের পাওনা আদায় করা নয়; বরং ঋণগ্রহীতার বাস্তব অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া। কেউ সত্যিকার অর্থে অসচ্ছল হলে তাঁকে সময় দেওয়া ইসলামের নির্দেশনা। আর সামর্থ্য থাকলে ঋণের সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ মাফ করে দেওয়া আরও বেশি সওয়াবের কাজ।

এখানে ঋণগ্রহীতারও দায়িত্ব রয়েছে নিজের অসচ্ছলতার বিষয়টি সততার সঙ্গে তুলে ধরা। সামর্থ্য না থাকা আর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও টাকা পরিশোধ না করা এক বিষয় নয়। ইসলাম এই দুই অবস্থার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করেছে।

ঋণ লেনদেনে লিখিত হিসাব রাখার গুরুত্ব

অনেক সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আত্মীয় কিংবা পরিচিতজনের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মানুষ কোনো লিখিত প্রমাণ রাখেন না। তাঁদের ধারণা, পরিচিত মানুষের সঙ্গে আবার লিখিত চুক্তির কী প্রয়োজন! কিন্তু পরবর্তী সময়ে হিসাবের অমিল, স্মৃতির ভুল কিংবা ভুল-বোঝাবুঝির কারণে সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা তৈরি হয়।

অথচ পবিত্র কুরআনে ঋণ লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে লিখিত দলিল সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রে তা লিখে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنْتُمْ بِدَيْنٍ إِلَىٰ أَجَلٍ مُسَمًّى فَاكْتُبُوهُ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য একে অন্যের সঙ্গে ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৮২)

এ আয়াতে ঋণ লেনদেন লিখিতভাবে সংরক্ষণের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা আর্থিক স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিচিতজন বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও ঋণের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা এবং অন্যান্য শর্ত লিখিতভাবে রাখা উচিত। প্রয়োজনে সাক্ষীও রাখা যেতে পারে।

এতে একদিকে যেমন ঋণদাতার অধিকার সুরক্ষিত থাকে, অন্যদিকে ঋণগ্রহীতাও ভবিষ্যতের অনাকাঙ্ক্ষিত বিরোধ থেকে রক্ষা পান। সবচেয়ে বড় কথা, আর্থিক লেনদেনের কারণে যেন দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট না হয়, সে জন্য লিখিত হিসাব একটি কার্যকর ব্যবস্থা।

ঋণ মানুষের বিপদে সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু এই সহযোগিতার মর্যাদা তখনই অটুট থাকে, যখন ঋণগ্রহীতা আমানতদারির পরিচয় দেন এবং যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করেন। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পাওনাদারের অর্থ আটকে রাখা, মিথ্যা অজুহাত দেখানো কিংবা তাকে দিনের পর দিন হয়রানি করা শুধু সামাজিক অনৈতিকতা নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে জুলুমও।

অন্যদিকে প্রকৃত অসচ্ছল ব্যক্তিকে অবকাশ দেওয়া এবং সম্ভব হলে ঋণ মাফ করে দেওয়া মহান মানবিকতার পরিচয়। তাই ঋণগ্রহীতার উচিত ঋণকে বোঝা নয়, বরং নিজের ওপর অর্পিত একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করা। আর ঋণদাতার উচিত সহযোগিতার মানসিকতা বজায় রাখা।

মনে রাখতে হবে, অর্থের পরিমাণ ছোট হতে পারে, কিন্তু মানুষের হক কখনো ছোট নয়। সামান্য কিছু টাকার জন্য কারও বিশ্বাস, ভালোবাসা কিংবা দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আসুন, আমরা ঋণ গ্রহণে সচেতন হই, পরিশোধে আন্তরিক হই এবং আর্থিক লেনদেনে সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখি। কারণ, মানুষের হক আদায় করা এবং পারস্পরিক বিশ্বাস অটুট রাখা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ঋণ পরিশোধে টালবাহানা: এটা কি জুলুম?

ঋণ পরিশোধে টালবাহানা: এটা কি জুলুম?

মেহমান এলে যে ভুলে নষ্ট হচ্ছে আপনার আমল

মেহমান এলে যে ভুলে নষ্ট হচ্ছে আপনার আমল

মসজিদে মোবাইল ব্যবহার কি গুনাহ?

মসজিদে মোবাইল ব্যবহার কি গুনাহ?

ঢিলা ব্যবহারের সময় আজানের জবাব দেওয়া যাবে?

ঢিলা ব্যবহারের সময় আজানের জবাব দেওয়া যাবে?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম