‘চোখ ওঠা’ রোগ কীভাবে ছড়ায়? জেনে নিন লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অফিসের একজন সহকর্মীর ‘চোখ ওঠা’ রোগটি কেবল তার একার সমস্যা হয়ে থাকে না; বরং এটি পুরো অফিসের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে প্রায় সব কর্মীকেই দীর্ঘ সময় একই স্থানে বসে কাজ করতে হয় এবং ডেস্ক, কিবোর্ড, মাউস, টেলিফোন, প্রিন্টার, কনফারেন্স রুম বা প্যান্ট্রির মতো কমন জায়গাগুলো শেয়ার করতে হয়। সারাদিনে অসংখ্য হাত এসব জায়গায় স্পর্শ করার কারণে খুব সহজেই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে।
স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে না মানলে ‘চোখ ওঠা’ রোগটি এভাবেই অফিসে ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির সঙ্গে আলাপকালে ভারতের শারদাকেয়ার-হেলথসিটি হাসপাতালের অফথালমোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. পনিন্দর কুমার ডোগরা জানান, ভাইরাসবাহিত ও ব্যাকটেরিয়াবাহিত চোখ ওঠা অত্যন্ত ছোঁয়াচে। সাধারণত সংক্রামিত হাত, ব্যবহৃত জিনিসপত্র বা চোখের তরলের মাধ্যমে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি মৃদু মাত্রার হয় এবং সঠিক চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে, তবে একজন আক্রান্ত কর্মী না জেনেই স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক সহকর্মীকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন।
চোখ ওঠা বা কনজাংটিভাইটিস কী?
চোখের সাদা অংশ এবং চোখের পাতার ভেতরের দিকের পাতলা, স্বচ্ছ পর্দাকে ‘কনজাংটিভা’ বলা হয়। এই পর্দাটি প্রদাহগ্রস্ত হলে চোখ লাল বা গোলাপি বর্ণ ধারণ করে, যা সাধারণ ভাষায় ‘চোখ ওঠা’ নামে পরিচিত। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- ভাইরাসের সংক্রমণ
- ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
- অ্যালার্জি
- ধোঁয়া, ধুলাবালি বা রাসায়নিক পদার্থের মতো বাহ্যিক উপাদান
ডা. ডোগরা জানান, ‘এগুলোর মধ্যে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত চোখ ওঠাই মূলত ছোঁয়াচে, তবে অ্যালার্জিজনিত চোখ ওঠা অন্য কারো শরীরে ছড়ায় না।’
অফিসে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে এই রোগ
অফিসের বদ্ধ ও শেয়ার করা পরিবেশ জীবাণু ছড়ানোর জন্য আদর্শ স্থান। চিকিৎসকের মতে, এই সংক্রমণ মূলত আক্রান্ত চোখের তরল, সংক্রামিত হাত বা বস্তুর প্রত্যক্ষ স্পর্শে ছড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, চোখ ওঠায় আক্রান্ত একজন ব্যক্তি চোখে হাত দেওয়ার পর যদি কিবোর্ড, কম্পিউটার মাউস, টেলিফোন, লিফটের বোতাম বা দরজার হাতল স্পর্শ করেন এবং পরবর্তী সময়ে অন্য কেউ সেই স্থানে হাত দিয়ে নিজের চোখে হাত দেন, তবেই সংক্রমণ ঘটে। এ ছাড়া যেসব কারণে ছড়াতে পারে:
- তোয়ালে বা রুমাল শেয়ার করলে
- একই টিস্যু পেপার একাধিকজন ব্যবহার করলে
- চোখের মেকআপ শেয়ার করলে
- কন্ট্যাক্ট লেন্সের কেস বা আনুষঙ্গিক সামগ্রী ভাগাভাগি করলে
- ভাইরাসের তীব্রতার কারণে কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে নির্গত জলকণ থেকেও অফিসে এটি ছড়াতে পারে
যেসব লক্ষণ দেখে সতর্ক হবেন
লক্ষণগুলো সাধারণত এক বা উভয় চোখেই দেখা দিতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- চোখ লাল বা গোলাপি হওয়া
- অনবরত পানি পড়া
- চুলকানি ও চোখ জ্বালাপোড়া করা
- চোখে কিছু পড়ে আছে এমন অনুভূতি হওয়া
- চোখের পাতা ফুলে যাওয়া
- চোখ থেকে পিছুটি বা আঠালো তরল নির্গত হওয়া
বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়াজনিত চোখ ওঠায় চোখ থেকে ঘন হলুদ বা সবুজ রঙের পিছুটি বের হয়, যার ফলে ঘুমানোর পর চোখের পাতা একে অপরের সঙ্গে আটকে যায়। এমন লক্ষণ দেখা দিলে কোনো স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না নেওয়া পর্যন্ত অফিসে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
অফিসে সংক্রমণ এড়ানোর উপায়
সহজ কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে অফিসে এই রোগের বিস্তার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব:
১. ঘন ঘন হাত ধোয়া: হাত পরিষ্কার রাখাই সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে। সাবান না থাকলে অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা উচিত।
২. চোখে হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকা: অবচেতনভাবেই অনেকে মুখ বা চোখে হাত দিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে অফিসের শেয়ার করা জিনিসপত্র স্পর্শ করার পর চোখ ডলা বা স্পর্শ করা একদমই উচিত নয়।
৩. শেয়ার করা জিনিসপত্র জীবাণুমুক্ত করা: যেসব জিনিস নিয়মিত ব্যবহৃত হয়—যেমন কিবোর্ড, মাউস, ফোন, টেবিল, লিফটের বোতাম ও দরজার হাতল প্রতিদিন পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখা দরকার।
৪. ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার না করা: তোয়ালে, প্রসাধনসামগ্রী, আই ড্রপ, কন্ট্যাক্ট লেন্স ও টিস্যু পেপারের মতো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র কখনোই সহকর্মীদের সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।
৫. আক্রান্ত হলে ঘরে থাকা: ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত চোখ ওঠা শনাক্ত হলে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া এবং চিকিৎসকের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত ঘরে থাকা উচিত। এতে সহকর্মীরা সুরক্ষিত থাকেন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
সাধারণত সঠিক সেবা ও চিকিৎসায় চোখ ওঠা ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে:
- চোখে তীব্র ব্যথা হলে
- দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা বা কমে গেলে
- আলোর দিকে তাকাতে সমস্যা হলে (আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা)
- চোখের চারপাশ অতিরিক্ত ফুলে গেলে
- চিকিৎসা নেওয়ার পরও লক্ষণ আরও খারাপের দিকে গেলে বা স্থায়ী লালভাব না কমলে
ডা. ডোগরা বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায় শনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা এবং সাধারণ কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমেই অফিসে চোখ ওঠার প্রাদুর্ভাব থামানো এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।’
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন

