ঘরে বসে থাইরয়েডের সমস্যা সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে বুঝবেন যেভাবে
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
থাইরয়েডের সমস্যা বর্তমানে অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, দীর্ঘসময় ক্লান্তি, চুল পড়া, মাসিকের অনিয়ম কিংবা অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে থাইরয়েডের কার্যকারিতা নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
গলার সামনের অংশে থাকা ছোট প্রজাপতির আকৃতির গ্রন্থিটিই থাইরয়েড। শরীরের শক্তি ব্যবহারের ধরন, তাপমাত্রা, ওজন, হৃদস্পন্দনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা রয়েছে। থাইরয়েড প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সক্রিয় হলে তাকে হাইপারথাইরয়েডিজম এবং কম সক্রিয় হলে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়।
তবে ঘরে বসে থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। আয়নার সামনে ঘাড় পরীক্ষা করে শুধু কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। রোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ।
আয়নার সামনে কীভাবে ঘাড় পরীক্ষা করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ঘরে বসে কয়েকটি সহজ ধাপে ঘাড়ের সামনের অংশ পর্যবেক্ষণ করা যায়।
প্রথমে ভালো আলোযুক্ত জায়গায় আয়নার সামনে দাঁড়ান। গলার নিচের অংশ স্পষ্টভাবে দেখা যায় এমন অবস্থায় থাইরয়েডের অবস্থানটি খেয়াল করুন। এটি চিবুকের নিচে এবং কলারবোনের ওপরের দিকে গলার সামনের অংশে অবস্থিত।
এরপর ঘাড় সামান্য পেছনের দিকে হেলিয়ে এক চুমুক পানি পান করুন। পানি গেলার সময় আয়নায় গলার ওই অংশটি লক্ষ্য করুন। সেখানে কোনো ফোলা, পিণ্ড, অস্বাভাবিক উঁচু অংশ বা অস্বাভাবিক নড়াচড়া চোখে পড়ছে কি না, তা দেখুন। কয়েকবার পানি পান করে একইভাবে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে নিজে থেকে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে। এ সময় দেখা দিতে পারে—
- সবসময় ক্লান্ত বা দুর্বল লাগা
- অস্বাভাবিকভাবে ওজন বেড়ে যাওয়া
- ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- চুল পাতলা হওয়া বা অতিরিক্ত চুল পড়া
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- মন খারাপ বা বিষণ্নতা
- স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঠান্ডা অনুভূত হওয়া
- মাসিকের অনিয়ম
- শরীরে শক্তি কমে যাওয়া
থাইরয়েড অতিরিক্ত সক্রিয় হলে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম দ্রুতগতির হয়ে যেতে পারে। তখন লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে—
- কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
- হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া
- অতিরিক্ত ঘাম
- হাত-পা বা শরীর কাঁপা
- অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা
- ঘুমের সমস্যা
- গরম সহ্য করতে না পারা
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা ঠিক নয়?
ঘাড়ে চোখে পড়ার মতো ফোলা বা পিণ্ড দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে পিণ্ড দ্রুত বড় হলে, খাবার বা পানি গিলতে সমস্যা হলে, গলায় চাপ বা ভারী অনুভূতি হলে, কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত বা বসে গেলে কিংবা শ্বাস নিতে সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
তবে ঘাড়ে পিণ্ড দেখা গেলেই সেটি ক্যানসার—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। থাইরয়েডের অনেক পিণ্ডই ক্ষতিকর নয়। পিণ্ডের প্রকৃতি বোঝার জন্য চিকিৎসকের পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাম কিংবা কোষ পরীক্ষা করা হয়।
কারা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে?
থাইরয়েডের সমস্যা যেকোনো বয়সি মানুষের হতে পারে। তবে নারীদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এছাড়া ৬০ বছরের বেশি বয়সি ব্যক্তি, পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস রয়েছে এমন মানুষ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পরের সময়ে নারীদের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। শরীরে আয়োডিনের ঘাটতিও থাইরয়েডের কিছু সমস্যার কারণ হতে পারে।
কোন পরীক্ষায় থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিত হয়?
শুধু উপসর্গ কিংবা ঘাড়ের পরিবর্তন দেখে থাইরয়েডের রোগ নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েক ধরনের রক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে।
থাইরয়েড উদ্দীপক হরমোন পরীক্ষা: থাইরয়েড গ্রন্থি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে কি না, তা বোঝার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
মুক্ত থাইরক্সিন পরীক্ষা: রক্তে সক্রিয় থাইরক্সিনের মাত্রা জানতে এই পরীক্ষা করা হয়।
মুক্ত ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন পরীক্ষা: বিশেষ করে থাইরয়েড অতিরিক্ত সক্রিয় কি না, তা মূল্যায়নে এই পরীক্ষা করা হতে পারে।
থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাইরয়েড গ্রন্থিকে আক্রমণ করছে কি না, তা বোঝার জন্য এ পরীক্ষা করা হয়।
কোন পরীক্ষা প্রয়োজন এবং পরীক্ষার ফলাফল কী বোঝাচ্ছে, তা চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।
ঘরে বসে পরীক্ষা করাই কেন যথেষ্ট নয়
থাইরয়েডে কোনো দৃশ্যমান ফোলা বা পিণ্ড না থাকলেও এর কার্যকারিতায় সমস্যা থাকতে পারে। আবার ঘাড়ে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেলেই সেটি থাইরয়েডের রোগ—এমনটাও নয়।
তাই ঘরে বসে ঘাড় পরীক্ষা করা মূলত প্রাথমিকভাবে সতর্ক হওয়ার একটি উপায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন, মাসিকের অনিয়ম, অতিরিক্ত চুল পড়া, হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস থাকলেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা না করে সময়মতো পরীক্ষা করানো ভালো। দ্রুত শনাক্ত করা গেলে থাইরয়েডের সমস্যা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব।



